মুসলিম বিশ্বে তত্ত্ব ও বাস্তবের বিচ্ছেদ : স্বরূপ ও প্রতিকার

আধুনিক মুসলিম বিশ্বের বহু পুনর্জাগরণ আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে পরিচয়বোধ, ধর্মীয় সচেতনতা ও রাজনৈতিক আবেগ জাগিয়ে তুলতে সফল হয়েছে। তারা উম্মাহ, শরিয়াহ, খিলাফাহ, ইসলামী পুনর্জাগরণ ও সভ্যতার প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ ধারণাকে প্রতিষ্ঠানে, আবেগকে দক্ষতায় এবং স্লোগানকে নীতিতে রূপান্তরে সাফল্য পায়নি। শিক্ষা, গবেষণা, অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রযুক্তি, নগরব্যবস্থা কিংবা জ্ঞান উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের ধারা দুর্বল। ফলে আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সভ্যতাগত রূপান্তর সীমিত থেকেছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ইসলামী চিন্তার একটি সমন্বিত পুনর্গঠন

মুসলিম উম্মাহর একটি অত্যন্ত গভীর, জটিল ও বহুস্তরীয় সঙ্কট হলো নাজারিয়্যাহ (তত্ত্ব) ও আমাল বা বাস্তব প্রয়োগের বিচ্ছেদ। মুসলিম সমাজে বক্তৃতা, স্লোগান, ধারণা, তাত্ত্বিক বিতর্ক ও মতাদর্শের অভাব নেই। ন্যায়বিচার, খিলাফাহ, শরিয়াহ, উম্মাহ, ইহসান, শূরা, ইনসাফ, ইসলামী অর্থনীতি কিংবা ইসলামী সভ্যতা নিয়ে বিপুল আলোচনা বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তব সমাজ, সংগঠন, রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক সংস্কৃতি বা নৈতিক আচরণের ক্ষেত্রে সেসব তত্ত্বের প্রতিফলন বলতে গেলে নেই।

যেকোনো সভ্যতায় তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ। তত্ত্বকে ধারণ করার জন্য প্রয়োজন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক অভ্যাস, সাংস্কৃতিক অনুশীলন এবং প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত আখলাকি কাঠামো। একটি সমাজের প্রকৃত চরিত্র তার তত্ত্বের পাশাপাশি দৈনন্দিন আচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক রীতি এবং ক্ষমতা-বণ্টনের কাঠামোয় প্রকাশিত হয়। মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশে ইসলামী মূল্যবোধকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে ধারণ করা হলেও সেটিকে সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপায়ণের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা দুর্বল। ফলে দ্বীনি মজলিসে ন্যায়বিচারের আলোচনা শোনা যায়; কিন্তু আদালতে ন্যায়বিচারের সঙ্কট থাকে। ইসলামী অর্থনীতির সেমিনার হয়; কিন্তু অর্থনৈতিক কাঠামো সুদনির্ভরই থেকে যায়। উম্মাহর ঐক্যের কথা বলা হয়; কিন্তু বাস্তবে বিভাজন আরো গভীর হয়।

দার্শনিক বিচারে এ সঙ্কটের শিকড় গভীরে প্রোথিত। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে জ্ঞানকে কখনোই কেবল মানসিক বা তাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে দেখা হয়নি। জ্ঞান ছিল আমলের পূর্বশর্ত এবং আমল ছিল জ্ঞানের সত্যতার প্রমাণ। জ্ঞান ও কর্ম, বিশ্বাস ও চরিত্র, চিন্তা ও বাস্তবতাকে অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে মুসলিম বিশ্বসহ পুরো মানবসভ্যতায় জ্ঞানের একটি বিমূর্তিকরণ ঘটেছে। জ্ঞান ধীরে ধীরে একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ধারণা নিজেই উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তব পরিবর্তনের ওসিলা হিসেবে কাজ করছে না।

এই বিচ্ছেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো প্রতীকী সন্তুষ্টি। মানুষ প্রায়ই বাস্তব পরিবর্তনের বদলে পরিবর্তনের ভাষা ব্যবহার করেই তৃপ্তি পায়। কোনো আদর্শ নিয়ে আবেগপূর্ণ বক্তৃতা, সামাজিক মাধ্যমে তা প্রচার কিংবা মতাদর্শগত বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়া অনেক সময় বাস্তব কাজের বিকল্প তৃপ্তি সৃষ্টি করে। এতে ব্যক্তি মনে করে, সে একটি মহান কাজে সফল হয়ে গেছে। যদিও সে বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি শ্রম, সংগঠন, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের পথে এগোচ্ছে না। এ অবস্থায় কাজের জায়গা দখল করে কাজের আলাপ। ফলে স্লোগান বাস্তবতার জায়গায় দাঁড়াতে চায়, আবেগ হতে চায় কাঠামোগত কাজের বিকল্প এবং পরিচয় উৎপাদন হতে চায় দক্ষতা উৎপাদনের বিকল্প।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে তত্ত্ব ও বাস্তবতার সমন্বয় ছিল প্রতিষ্ঠিত। তাকওয়া, আখলাক ও তাওহিদের শিক্ষা রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিকশিত হয়েছিল; ন্যায়বিচারের ধারণা বিচারপ্রণালীতে প্রতিফলিত হয়েছিল; উম্মাহর ধারণা সামাজিক সংহতির কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী যুগে বিশেষ করে রাজনৈতিক পতন, উপনিবেশবাদ, জ্ঞানগত স্থবিরতা এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চাপে মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে উৎপাদক অবস্থান থেকে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে স্থবির হতে থাকে। তার বাস্তব জগৎকে রূপান্তর করার ক্ষমতা দুর্বল হতে থাকে, বিপরীতে মতাদর্শিক বাহাস বাড়তে থাকে। ফলে এক অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হয়, যেখানে বিতর্কের ভাষা শক্তিশালী; কিন্তু বাস্তবতার কাঠামো দুর্বল, স্মৃতির ভাণ্ডার সমৃদ্ধ; কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্মাণে অক্ষম।

এই সঙ্কটের আরেকটি মাত্রা হলো নৈতিকতা ও দক্ষতার বিচ্ছেদ। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজে নৈতিক ভাষা বিদ্যমান; কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা দুর্বল। অথচ সভ্যতার জন্য কেবল সৎ উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিকল্পনা, জবাবদিহি, ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। যখন নৈতিক আকাক্সক্ষা দক্ষতার সাথে যুক্ত হয় না, তখন আদর্শ বাস্তবে জাহির হয় না।

এ কারণেই বর্তমান সঙ্কটকে কেবল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক সঙ্কট হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। এটি বড় অর্থে ধারণা ও বাস্তবতার মধ্যকার সম্পর্কের সঙ্কট; চিন্তা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্কট; নৈতিক আকাক্সক্ষা ও কার্যকর সক্ষমতার সঙ্কট।

ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো- এখানে জ্ঞানকে কখনোই নিরপেক্ষ, নিষ্ক্রিয় বা কেবল বৌদ্ধিক সম্পদ হিসেবে কল্পনা করা হয়নি। ইলম এমন এক সত্তা, যা মানুষের চেতনা, চরিত্র, আচরণ, সমাজ ও ইতিহাসের গতিপথ নিয়ন্ত্রণের তাকত রাখে। ইলম নিছক তথ্যের সঞ্চয় নয়; বরং অস্তিত্বের পুনর্গঠন, নিছক চিন্তার সম্প্রসারণ নয়; বরং সত্তার পরিশুদ্ধিও। সে কেবল মানসিক আলোকপ্রাপ্তি নয়, বরং ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ন্যায়, ভারসাম্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার কার্যকর শক্তিও।

এ প্রেক্ষাপটেই মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে বহুল উদ্ধৃত উক্তি স্মরণ করা যায়। যার মূল কথা হলো, জ্ঞান আমলকে আহ্বান করে; যদি আমল তার আহ্বানে সাড়া দেয়, তবে জ্ঞান স্থিত হয়, আর যদি সাড়া না দেয়, তবে বিদায় নেয়। এই বাণীর ভেতরে ইসলামী জ্ঞানদর্শনের একটি মৌলিক তত্ত্ব নিহিত। এখানে জ্ঞান একটি জীবন্ত নৈতিক শক্তি। জ্ঞানের সত্যতা তার উপস্থিতিতেই নয়, তার ফলাফলেও। ব্যক্তি বহু তথ্য জানলেও তার চরিত্রে বা নৈতিক আচরণে তার প্রতিফলন না ঘটলে সেই জ্ঞান অসম্পূর্ণ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ফল।

ইসলামী চিন্তায় জ্ঞান ও কর্মের সম্পর্ক কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক নয়; বরং তারা একই সত্যের দু’টি অবিচ্ছেদ্য রূপ। জ্ঞান হলো অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি, আর কর্ম হলো সেই উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। জ্ঞান যদি হৃদয়ের আলো হয়, তবে কর্ম সেই আলোর দৃশ্যমান প্রতিফলন। তাই জ্ঞান ও কর্মকে পৃথক করা মানে সত্যকে দুই টুকরো করে ফেলা।

কুরআন কখনো কেবল ঈমানকে যথেষ্ট বলে উপস্থাপন করেনি। ঈমানকে আমলের সাথে এবং আমলকে ঈমানের সাথে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে যে, একটিকে অন্যটির বাইরে কল্পনা করা কঠিন। এর মাধ্যমে কুরআন একটি গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাগত নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। তা হলো, সত্যের মূল্য তার ধারণাগত গ্রহণেই নয়; বরং তার বাস্তবায়নেও। বিশ্বাস যদি বাস্তবতায় প্রবেশ না করে, তবে তা অপূর্ণ। আর কর্ম যদি নৈতিক বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে সে তার আধ্যাত্মিক ভিত্তি হারায়।

ইসলামী দৃষ্টিতে জ্ঞান মূলত আত্ম-রূপান্তরের প্রক্রিয়া। ইসলামী শাস্ত্রগুলো তাই প্রয়োগবিচ্ছিন্ন নয়। ফিকহ যখন ন্যায়বিচারের সামাজিক প্রকল্প থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা কেবল বিধিবিষয়ক সূক্ষ্মতার চর্চায় সীমিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ইসলামী সিয়াসাত যখন নৈতিক প্রশাসন ও জনকল্যাণের বাস্তব ক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যায়, তখন তা প্রতীকী রাজনৈতিক ভাষ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। তাযকিয়া যখন বাস্তব জীবন ও সমাজের দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা জীবন থেকে পলাতক রুহবানিয়্যাত বা বৈরাগ্যের পরিসরে আবদ্ধ হতে থাকে।

তত্ত্ব ও বাস্তবতার মধ্যকার বিচ্ছেদের অন্যতম মৌলিক কারণ হলো ফিকহুল ওয়াকে বা বাস্তবতার গভীর, পদ্ধতিগত ও সমন্বিত অনুধাবনের দুর্বলতা। ইসলামী ঐতিহ্যে ফিকহুন নস (পাঠের অনুধাবন) এবং ফিকহুল ওয়াকে (বাস্তবতার অনুধাবন) পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

ক্লাসিক্যাল মুসলিম আলেমদের দিকে তাকান। তারা ছিলেন সমাজের গভীর পর্যবেক্ষক, ইতিহাসের বিশ্লেষক এবং মানব-অভিজ্ঞতার পাঠক। তারা শুধু বিধান বয়ান করেননি; বরং সেই বিধান যে সমাজে কার্যকর হবে, সেই সমাজের প্রকৃতি, শক্তি, দুর্বলতা ও পরিবর্তনের গতিশীলতাও বোঝার চেষ্টা করেছেন।

ইমাম আবু ইউসুফ যখন কিতাবুল খারাজ রচনা করেন, তখন তিনি কেবল ফিকহি মাসআলা সংগ্রহ করেননি। তিনি করব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, রাজস্বনীতি, প্রশাসনিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেন। তিনি বাজার, উৎপাদন, রাজস্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতার পারস্পরিক সম্পর্ক গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তার কাছে ফিকহ মানে শুধু হালাল-হারামের তালিকা নয়; বরং তা অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের বাস্তব কাঠামোও।

আল-মাওয়ার্দি তার আহকামুস সুলতানিয়্যাহ গ্রন্থে কেবল রাজনৈতিক আদর্শ বর্ণনা করেননি; বরং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, সামরিক সংগঠন, গভর্নর নিয়োগ, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সীমা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখান যে, নৈতিক রাষ্ট্র কেবল আদর্শিক ঘোষণা দিয়ে গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ প্রশাসন এবং ক্ষমতার সুশৃঙ্খল বণ্টন; অর্থাৎ তার কাছে রাজনীতি ছিল নৈতিকতার বাস্তব রূপায়ণের বিজ্ঞান।

ইবনে খালদুন রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ক্ষমতা, শ্রম, নগরায়ন এবং সভ্যতার উত্থান-পতনের অন্তর্নিহিত নিয়ম উদ্ভাবন করেছেন। তার ‘আসাবিয়্যা’ তত্ত্ব, রাষ্ট্রের জীবনচক্র বিশ্লেষণ, অর্থনৈতিক উৎপাদনের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক শক্তির সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসতত্ত্বেরও পূর্বসূরি। তিনি বুঝেছিলেন, আদর্শ যতই মহৎ হোক, যদি সামাজিক শক্তির প্রকৃতি, ক্ষমতার গতিবিদ্যা এবং মানবসমাজের বাস্তব আচরণ বোঝা না যায়, তবে সেই আদর্শ স্থায়ী হতে পারে না। কিন্তু আধুনিক যুগে এই ঐক্য অনেকাংশে দুর্বল। মুসলিম জ্ঞানচর্চার একটি অংশের চোখে অতীতের পাঠকে পুনরুৎপাদন করাই যেন সব কিছু। ঐতিহ্য বোঝার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে ঐতিহ্যের ভাষিক পুনরাবৃত্তিই জ্ঞানের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আরেকটি প্রবণতা হলো বাস্তবতাবিমুখ আদর্শবাদ। এখানে ইসলামী ধারণাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন বাস্তব সমাজের জটিলতা, প্রতিষ্ঠানগত সীমাবদ্ধতা, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য কিংবা মানব-আচরণের বাস্তব প্রকৃতি বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন নেই। ফলে আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ সঙ্কটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক দিক রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আগেকার রাষ্ট্র থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। আজকের রাষ্ট্র আমলাতন্ত্র, প্রযুক্তি, বৈশ্বিক আইন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহের জটিল নেটওয়ার্কের মধ্যে কাজ করে। কিন্তু ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তা যদি এই নতুন বাস্তবতার বিশ্লেষণ না করে, তবে তা ইতিহাসের স্মৃতি হিসেবে হয়তো টিকে থাকবে, কার্যকর রাষ্ট্রদর্শনে পরিণত হবে না। একইভাবে ইসলামী অর্থনীতি যদি বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, করপোরেট পুঁজিবাদ এবং সম্পদের কেন্দ্রীভবনের নতুন রূপগুলো বিশ্লেষণ না করে, তবে তার ভাষ্য আকর্ষণীয় হলেও নীতিগতভাবে অপূর্ণ থেকে যাবে।

আধুনিক মিডিয়া, অ্যালগরিদম, ভোক্তাবাদ ও ডিজিটাল সংস্কৃতি মানুষের মনোজগৎকে নতুনভাবে গঠন করছে। মানুষের মনোযোগ, আকাক্সক্ষা, পরিচয়বোধ এবং সামাজিক সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। কিন্তু মুসলিম চিন্তার একটি অংশ এখনো এমন ভাষায় কথা বলে, যা এই নতুন মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। ফলে ইসলামী নৈতিকতার অনেক বক্তব্য সত্য হলেও তা মানুষের বর্তমান অভিজ্ঞতার সাথে কার্যকর সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়।

আবহাওয়া পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, পানিসম্পদের সঙ্কট এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচার আজ মানবসভ্যতার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। অথচ ইসলামের ধারণাগুলোকে পরিবেশ-দর্শনের ভাষায় হাজির করার কাজ এখনো পর্যাপ্ত নয়।

তত্ত্ব ও বাস্তবতার বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এটি সমাজে একধরনের দ্বৈত চেতনা সৃষ্টি করে। মানুষ এক জগতে আদর্শের কথা বলে, আরেক জগতে আদর্শবিহীন বাস্তবতার সাথে বসবাস করে। ফলে ন্যায়বিচারকে সত্য বলে মানা হয়; কিন্তু অন্যায়কেও অনিবার্য মনে করা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এ অবস্থা আদর্শের প্রতি বিশ্বাস দুর্বল করে এবং সমাজে নৈতিক সংশয় সৃষ্টি করে। তখন মানুষ ইসলামের নীতিগুলো ভুল মনে না করলেও সেগুলোকে কার্যকর করার সম্ভাবনা সম্পর্কে আস্থা হারাতে শুরু করে। এভাবেই তত্ত্ব ও বাস্তবতার বিচ্ছেদ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কট নয়; এটি গভীর সভ্যতাগত সঙ্কটও।

আধুনিক মুসলিম বিশ্বের বহু পুনর্জাগরণ আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে পরিচয়বোধ, ধর্মীয় সচেতনতা ও রাজনৈতিক আবেগ জাগিয়ে তুলতে সফল হয়েছে। তারা উম্মাহ, শরিয়াহ, খিলাফাহ, ইসলামী পুনর্জাগরণ ও সভ্যতার প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশ ধারণাকে প্রতিষ্ঠানে, আবেগকে দক্ষতায় এবং স্লোগানকে নীতিতে রূপান্তরে সাফল্য পায়নি। শিক্ষা, গবেষণা, অর্থনীতি, প্রশাসন, প্রযুক্তি, নগরব্যবস্থা কিংবা জ্ঞান উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের ধারা দুর্বল। ফলে আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সভ্যতাগত রূপান্তর সীমিত থেকেছে।

এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ইসলামী চিন্তার একটি সমন্বিত পুনর্গঠন। এর ভিত্তি হতে পারে চারটি পরস্পর-সংযুক্ত স্তম্ভের ঐক্যের নবায়ন। সেগুলো হচ্ছে ফিকহুন নস (ওহি ও পাঠের গভীর অনুধাবন), ফিকহুল ওয়াকে (সমসাময়িক বাস্তবতার বিশ্লেষণ), ফিকহুল মাকাসিদ (শরিয়তের উদ্দেশ্য ও কল্যাণবোধের উপলব্ধি) এবং ফিকহুল মাআলাত (সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে দূরদৃষ্টি)। মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ নির্ভর করে এমন এক জ্ঞানচর্চার ওপর, যা একই সাথে ওহির প্রতি বিশ্বস্ত, বাস্তবতার প্রতি সচেতন, মানবকল্যাণে দায়বদ্ধ এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন।

লেখক : কবি, গবেষক

[email protected]