আমেরিকায় এক ডলার দিয়ে এক কাপ কফি খাওয়া যায় না। সাধারণ ব্ল্যাক কফি খেতে তাদের খরচ করতে হয় আড়াই থেকে সাড়ে চার ডলার। বাংলাদেশী টাকায় ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকা। আর বাংলাদেশে এক শ টাকা দিয়ে একবেলা ভালো খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যায়। কিন্তু আমরা সাধারণ কফি খাই কত করে? ৩০ থেকে শুরু করে ৬০ টাকার মধ্যেই তো? তাহলে কফির দাম কোন দেশে সস্তা?
বাংলাদেশে ১০ ট্যাবলেটের এক পাতা প্যারাসিটামলের দাম ১২ টাকা। আমেরিকায় ১০০ ট্যাবলেটের এক বোতল প্যারাসিটামল ১০.৯৭ থেকে ১২.৪৯ ডলার। সেই হিসাবে আমাদের একটা প্যারাসিটামল কিনতে খরচ হয় এক টাকা ২০ পয়সা। আর তাদের খরচ (বাংলাদেশী টাকার হিসাবে) ১৩ থেকে ১৪ টাকা। তাহলে ওষুধের দাম কোন দেশে কম?
আমাদের দেশে। সে হিসাবে আমরা তো ‘ভালো’ আছি! বাংলাদেশী ১০০ টাকার সমপরিমাণ খরচ করে ওই দেশের লোকেরা একবেলা ভালো খাবার জোটাতে পারে না, আমরা পারি। আমরা সস্তায় ওষুধ পাই। সুতরাং অসুখ হলেও আমাদের চিন্তা নেই!
হিসাবটা কি এতই সরল! নিজের পকেটের দিকে তাকিয়ে দেখুন এবার। আপনি প্রতিদিন ধাক্কাধাক্কি সামলে বাসে করে অফিসে যান। আর আমেরিকার লোকেরা অফিসে যায় এসি গাড়িতে করে। তারও অফিসে যাওয়া দরকার, আপনারও দরকার। তার যেতে খরচ হয় কত, আর আপনার কত?

এখন কেউ যদি বলে, আমেরিকার মানুষের চাইতে আমাদের যাতায়াতের খরচ সস্তা। তাহলে কি ভুল হবে? না, ভুল না- সত্য। এই সত্যের পেছনে আছে আরো একটা সত্য। সেটি জীবনযাত্রার পার্থক্য। আমাদের বেলায় নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তাদের পান্তা খাওয়ারই দরকার পড়ে না। কিন্তু দুই দেশের লোকেরই মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো ওষুধ বা চিকিৎসাসেবা। এই চাহিদা মেটাতে গিয়ে সস্তা ওষুধের দেশে আমাদের কেন ‘ফতুর’ হতে হয়? একজন লোকের কঠিন কোনো রোগ ধরা পড়লে তাকে কেন জমি-জিরাত বেচে চিকিৎসা করতে হয়? আসলে এই ‘সস্তা’টুকুও আমাদের কাছে সস্তা না। কারণ আমাদের জীবনযাত্রার মান আমেরিকানদের তুলনায় নিম্ন। তা ছাড়া আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক নেই। আমেরিকার একজন নাগরিকের কাছে ১০০ ডলার খরচ করে ওষুধ কেনা বড় কিছু নয়। ওষুধ কিনে তারা ‘দেউলিয়া’ হন না। তাদের পেছনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা। একেকজন নাগরিককে আগলে রাখে রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা বলয়। তাদের বেলায় ওষুধের দাম ১০০ ডলার পড়লেও নিজেদের পকেট থেকে হয়তো দিতে হয় ১০ ডলার। বাকি ৯০ ডলার দেয় বীমা কোম্পানি অথবা সরকার। আর বাংলাদেশে ওষুধের দাম যা, তার সবটাই যায় নিজের পকেট থেকে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেসব ওষুধ ফ্রি দেয়ার কথা, সেগুলোও চলে যায় কালোবাজারে। ওষুধের নাম লিখে স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হয় রোগীকে। কালোবাজার থেকেই ওষুধ কিনে আনতে বাধ্য হন তারা। আর এভাবেই ওষুধ কিনে ফতুর হয়ে যান অনেকে। যারা কিনতে পারেন না, তাদের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হয়। বাংলাদেশে খাবারে ভেজাল থাকায় ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ মুড়ি-মুড়কির মতো খেতে হয়। কয়েক দিন আগে ওষুধ নিয়ে একটা সেমিনার হয়েছে ঢাকায়। উপস্থিত ছিলেন ডাকসাইটে বিশেষজ্ঞ, আইনপ্রণেতা ও ফার্মা মালিকদের অনেকে। সেমিনার থেকে যে তাগিদটুকুু বের হয়ে এসেছে, তা হলো, মানুষের নাগালের মধ্যে দাম রেখেই ওষুধ শিল্প টিকিয়ে রাখতে হবে।
টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন আসছে কেন? কারণ ইতোমধ্যে ওষুধের দাম নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ে গেছে এই শিল্প। আমাদের ৯৮ শতাংশ ওষুধের উৎপাদন দেশের ভেতরেই হয়। তবে এর মূল কাঁচামাল বা ‘অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস’-এর প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করা হয় ভারত ও চীন থেকে। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। বেড়েছে পরিবহন খরচও। তার ওপর যোগ হয়েছে ডলার সঙ্কট। দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নে এক ধাক্কায় আমদানি করা কাঁচামালের খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। কাঁচামাল কেনার ডলার নেই, আবার কারখানায় চাকা ঘোরানোর জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎও নেই। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেয়ে ফার্মা কারখানাগুলোকে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে খরচ হয়, বাড়ে ওষুধের দাম।
ওষুধের উৎপাদন খরচ বেড়েছে সত্যি। কিন্তু বাড়তি দামের পেছনে আছে আরো একটা ওপেন সিক্রেট-ওষুধ কোম্পানিগুলোর নীতিহীন প্রমোশনাল খরচ। এই খরচ করা হয় ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন পাওয়ার আশায়। ডাক্তাররা যেখানে বসেন, সেখানে রোগী যেমন থাকেন, তেমনই থাকে ‘কোম্পানির লোক’দের আনাগোনা। কেতাদুরস্ত পোশাক পরে, গলায় টাই, হাতে ব্রিফকেস ঝুলিয়ে তারা ঢুকে যান ডাক্তারের কামরায়। কেস থেকে থোকায় থোকায় ওষুধ বের করে উপহার দেন। বছরজুড়ে থাকে আরো উপহার, বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ। এমনকি অনেক ডাক্তারের সন্তানের বিয়ের খরচও নাকি দেয়া হয় ওষুধ কোম্পানি থেকে। কোনো সুস্থ সংস্কৃতিতে প্রেসক্রিপশন পেতে এমন কোটি কোটি টাকার উপহার দেয়ার নজির নেই। বাংলাদেশে এসব অনৈতিক সুবিধার পেছনে কোম্পানিগুলো প্রায় তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা ঢালে। আর এসব টাকার বোঝা চাপে রোগীর ঘাড়ে।
ধরা যাক, রোগীর প্রয়োজন সামান্য প্যারাসিটামল। এটি জেনেরিক নাম। কিন্তু বাজারে মানসম্মত বিভিন্ন কোম্পানির একই প্যারাসিটামল বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামে বিক্রি হয়। সেগুলোর দামে থাকে আকাশ-পাতাল তফাৎ! ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট একটা দামি ব্র্যান্ডের নাম লিখে দিলে সেটা না কিনে রোগীর উপায় থাকে না! অথচ ডাক্তার যদি কেবল জেনেরিক নামটি লিখতেন, তাহলে রোগী ফার্মেসিতে গিয়ে নিজের পকেটের সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো ভালো কোম্পানির ওষুধ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা পেতেন।
জটিলতা আরো আছে। আমাদের বাজারে প্রায় ২৭ হাজারের বেশি ব্র্যান্ডের ওষুধ প্রচলিত। কিন্তু সরকার সরাসরি দাম নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ১১৭টি ওষুধের। বাকি ওষুধের দাম নির্ধারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা উৎপাদনকারী কোম্পানির হাতে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধি- ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম ইচ্ছেমতো বাড়ানোর লাইসেন্স পেয়ে গেছে তারা। গত কয়েক বছরে এসব জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম ধাপে ধাপে ৩০ থেকে শতভাগ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
২০২৩ সালের ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন’-এর সেকশন ১৩-তে একটা চমৎকার মেকানিজম তৈরির কথা বলা হয়েছিল। কথা ছিল, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রকাশ করা হবে। প্রতি দুই বছর পর তা হালনাগাদ করা হবে। কিন্তু বাস্তবায়নের ফাইলবন্দী আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো কয়েক শ’ ওষুধ অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় রাখতে হবে। সেখানে ২০২৬ সালের তালিকায় তাদের সুপারিশের অর্ধেকেরও কম এসেছে। কেন কম এলো, সেটা তদারকি করার কি কেউ আছেন?
এসব তদারকি যদি ঠিকঠাকমতো হতো, তাহলে এই সঙ্কট থাকত না। সঙ্কট যত গভীরই হোক, সমাধানের পথ বের করে নেয়া কঠিন কিছু না। এর জন্য দরকার সদিচ্ছার। আমাদের কাঁচামালের সঙ্কট আছে। অন্য দিকে মুন্সীগঞ্জে মেঘনার তীরে প্রায় ২০০ একর জমিতে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের এপিআই শিল্প পার্কও আছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগের অভাবে পার্কটি ধুঁকছে। চাইলে এই পার্কের কাজ পুরোদমে শুরু করতে পারি। দেশে কাঁচামাল তৈরি হলে আমদানিনির্ভরতা খানিকটাই কমবে। এতে এক ধাক্কায় ওষুধের উৎপাদন খরচ কমে যাবে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। এর পাশাপাশি দেশীয় এপিআই উৎপাদনকারীদের আগামী ১০ বছরের জন্য দেয়া যেতে পারে কর অবকাশ।
আমরা যদি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, ডাক্তারদের উপহার দেয়া বন্ধ করতে পারি। আর প্রেসক্রিপশনে ওষুধের ‘জেনেরিক নাম’ লেখা বাধ্যতামূলক করতে পারি, তাহলে দাম কমবে আরো। তারপর এগিয়ে যেতে পারি স্বাস্থ্য বীমার দিকে। প্রাথমিকভাবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের বেতন থেকে সামান্য অংশ নিয়ে, মালিক বা সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান নিয়ে স্বাস্থ্যবীমা ফান্ড গঠন করা যায়। এই ফান্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধের খরচ কভার করা সম্ভব। এর মাধ্যমে রোগীর ‘আউট-অব-পকেট’ খরচের চাপ কমিয়ে পর্যায়ক্রমে শূন্যে নামিয়ে আনাও অসম্ভব নয়।
সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করা দরকার। গ্রামের প্রান্তিক মানুষ যেন প্রয়োজনীয় ওষুধ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ঠিকমতো পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। ওষুধ যেন চোরাই বাজারে বিক্রি হয়ে না যায়, তার জন্য বারকোড বা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে।
ওষুধ কেউ শখ করে খায় না। দাম বাড়লেও ওষুধ সেবন বন্ধ করার উপায় নেই। পকেটে টান পড়লে চাল-ডাল কম কেনা যায়। কিন্তু ‘বাজেট নেই’ বলে ক্যান্সারের ডোজ আগামী মাসের জন্য তুলে রাখা যায় না।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



