সাদা পতাকার পেছনে কী

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা অনেকে ভালোভাবে নিতে পারছে না। তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা, মোংলা বন্দর এলাকায় চীনকে বিশেষায়িত এলাকা প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়া অনেকের গাত্রদাহের কারণ। এসব নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, বিশেষ করে বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা সন্দিহান হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসব ঘটনা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর প্রতি সরকারের নমনীয়তা হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে।

এ মাসের শুরুর দিকে সড়কপথে ঢাকা থেকে দাউদকান্দি হয়ে চাঁদপুর যাই। বছর ১৫ আগে এ পথে একবার কুমিল্লা গিয়েছিলাম। এবারের যাত্রায় বিস্তর তফাত। প্রশস্ত সড়কে ফুলেল বিভাজক, দু’পাশে সবুজের সমারোহ দেখে মন জুড়িয়ে যায়। অবশ্য পীড়াদায়ক ব্যাপারও ছিল। রাস্তার দু’পাশে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার পরিবেশদূষণের দৃষ্টিকটু উপস্থিতি। এসব কারখানার বর্জ্যে শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও গোমতী নদী ক্রমেই দূষিত হচ্ছে। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদন বেরিয়েছে; কিন্তু লাভ হয়নি।

দাউদকান্দি ছেড়ে চাঁদপুরের পথে ধনগোদা নদীর উপর ধনগোদা সেতু বা মতলব সেতু। ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার চার লেনের সেতুটি বেশ দৃষ্টিনন্দনও।

আমাদের দেশে প্রতি বিশ্বকাপের সময় ঘরবাড়ি, দোকানপাট, বিদ্যুতের খুঁটি, এমনকি গাছেও দেখা যায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা জার্মানির পতাকার আধিক্য। বুঝতেই কষ্ট হয় এটি বাংলাদেশ নাকি অন্য কোনো দেশ; কিন্তু ধনগোদা সেতুতে এক অস্বাভাবিক দৃশ্যে দৃষ্টি আটকে যায়। পুরো সেতুজুড়ে দু’পাশের রেলিংয়ে আরবিতে কলেমাখচিত অসংখ্য সাদা পতাকা টাঙানো। কে বা কারা, কখন টাঙিয়েছে কেউ জানে না। স্থানীয় লোকজন সকালে উঠে এগুলো দেখতে পান। তাদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কার ভাব লক্ষ করার মতো। ব্যাপারটি সাদা চোখে হয়তো গুরুতর কিছু নয়; কিন্তু ভাবার বিষয় অবশ্যই। আগেই খবর বেরিয়েছে, বিশ্বকাপের ডামাডোলে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ১৭ জুন রাতে শনির আখড়ায় একদল তরুণ যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের রেলিংয়ে সারিবদ্ধভাবে কলেমাখচিত সাদা পতাকা টাঙিয়ে দেন। সে রাতেই ফেসবুক লাইভে জনৈক এনামুল হাসান এসব পতাকা খুললে কঠিন পরিণতি হবে বলে হুমকি দেন। আবার গত ২৬ জুন কলেমাখচিত সাদা পতাকা হাতে তৌহিদি জনতার ব্যানারে মিছিল হয় বিভিন্ন জায়গায়।

দেশের আপাত শান্ত পরিবেশে হঠাৎ এসব ঘটনা পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে পারে। অনেকে একে নিছক একদল অতিউৎসাহী তরুণের ইসলামের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন; কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠও দেখা দরকার। ১৫ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। ২৪ থেকে ২৭ জুন প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা ও চুক্তি হয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিক পরিবর্তনের আভাস দেয়। একই সাথে জুন ২৭-২৮ তারিখে ঢাকায় বিশ্বের ৩৭টি দেশের প্রতিনিধিদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, জনকল্যাণমূলক অর্থনীতি পরিচালনার কৌশল উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে। তৃতীয়ত, ২৩ জুন ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এগুলোকে একসূত্রে ভাবলে, কলেমার পতাকা ওড়ানোর ঘটনাটি নিছক ধর্মীয় আবেগ হিসেবে নেয়া যায় না। এর মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল সঙ্কেত যাবে। এরই মধ্যে একটি দৈনিকে নারায়ণগঞ্জে দু’জন উগ্রবাদী গ্রেফতারের সংবাদ এসেছে। সন্ত্রাসীদের উগ্রবাদী তকমা দিয়ে সংবাদপত্রটি কী বার্তা দিতে চায়? এ ধরনের খবর প্রকাশের আগে খবরের সত্যতা, জনগণের মধ্যে এর প্রভাব, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর মাধ্যমে কী বার্তা যেতে পারে- গভীরভাবে ভাবা উচিত।

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা অনেকে ভালোভাবে নিতে পারছে না। তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতা, মোংলা বন্দর এলাকায় চীনকে বিশেষায়িত এলাকা প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়া অনেকের গাত্রদাহের কারণ। এসব নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, বিশেষ করে বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা সন্দিহান হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসব ঘটনা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর প্রতি সরকারের নমনীয়তা হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে।

এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নির্লিপ্ততা কাম্য নয়। নানা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে সংসদের মূল্যবান সময় ও সম্পদ অপচয় হয়। অথচ জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয় না। অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা জুলাই বিপ্লবের মহিমা খর্বের অপকৌশল নয় তো? দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব নস্যাতের কোনো চক্রান্তের অংশ নয়তো?

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]