পুতুলের সুতা বাঁধা থাকে পর্দার আড়ালে— ওস্তাদের আঙুলে। তিনি আঙুল নাচান, সাথে পুতুল নাচে। আঙুল বাঁকালে পুতুল হাত তোলে, টান দিলে ডিগবাজি খায়। পুতুলনাচ দেখে হাততালি দেয় দর্শক। এই নাচ কারো ভালো না লাগলে পুতুলকে গালাগালি করে লাভ নেই। কারণ যেমনি নাচায় তেমনি নাচে, পুতুলের কী দোষ!
ধরা যাক, কোনো একটা প্যান্ডেলে পুতুলনাচ চলছে। ওই সময় শুরু হয়ে গেছে ঝড়। বেসামাল বাতাসে ছিঁড়ে গেছে পুতুলের সুতা। তখন?
পুতুলগুলো ওস্তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। বাতাসে ভাসবে, নাচবে। নাচতে নাচতে ছিটকে যেতে পারে প্যান্ডেলের বাইরে।
কয়েক দিন আগে বাংলাদেশে একটা ঝড়ো বাতাস বয়ে গেছে। বাতাসের তোরে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজপথ। ২৩ জেলায় ছড়িয়ে গিয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই অনুষ্ঠানের পাশেও বিক্ষোভ করেছিল তারা। এ বিক্ষোভের সুতা কি বাঁধা ছিল কোথাও?
সবসময় যে সুতা বাঁধা থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। চব্বিশের বাংলাদেশে বিপ্লব এসেছে কোনোরকমের সুতার টান ছাড়া। তবে ওই বিপ্লব, ওই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটা ইশারা রেখে গেছে— কারো যেমন খুশি তেমন করে দেশ চালানোর ইচ্ছা থাকলে, সেই ইচ্ছাকে কবর দিতে হবে। কারণ চব্বিশের জুলাইয়ের আগের তরুণ আর ছাব্বিশের তরুণদের মানসিকতায় আকাশ-পাতাল ফারাক। তারা ইতোমধ্যে ভয়ের দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন। এখন পুরনো দিনের মতো দেখে নেয়া হবে বলে তাদের দমানো যাবে না। পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়াও যাবে না। এ সত্যটা সরকার ও প্রশাসনে থাকা অনেকে বুঝতে যেন অপারগ। সম্ভবত এই কারণে লঘুচাপের একটা বাতাস শক্তি সঞ্চয় করে এতদূর বয়ে যেতে পেরেছে।
বাতাসের এত গতির পেছনে কী ছিল? সহজ একটা কারণ ব্যাখ্যা করা যায়, কিশোর-তরুণ মানে গতিশীল। তাদের উদ্যম আছে। বেগ আছে। আছে আবেগও। এই আবেগ ব্যবহার করে ফেলাও কূটকৌশলীদের জন্য সহজ। কারণ ওরা নবীন, ওরা কাঁচা।
এবার আসা যাক আসল প্রশ্নে— এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কি কোনো পক্ষ ব্যবহার করেছে? বা ব্যবহার করতে চেয়েছে?
প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ছোটখাটো একটা খতিয়ান ঘেঁটে দেখা যাক— শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণ ছিল তিনটি। এক. ভারী বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা নেয়া। দুই. পদার্থবিদ্যা প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে সৃজনশীল অংশের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকা। এই দুই কারণের সাথে যোগ হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর একটি অসতর্ক মন্তব্য। শিক্ষার্থীদের ফার্মের মুরগি বলেছিলেন তিনি।
এই তিন দাবি পূরণ হলে তো ল্যাঠা চুকে যাওয়ার কথা; কিন্তু তিন দাবি পূরণ হওয়ার পরও ল্যাঠা থেকে গেল। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, পদার্থবিদ্যার ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেয়া হবে। ভুল প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সাথে জড়িতদের সাময়িক বরখাস্ত করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় যারা পরীক্ষা দিতে পারেনি তারা আবার পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পাবে। আর শিক্ষার্থীদের ফার্মের মুরগি বলায় জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।
তারপরও পরীক্ষার্থীরা কেন ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিল? রাজপথ বন্ধ করে রেখেছিল? এই প্রশ্নগুলো তো থেকে যায়। হতে পারে এটা ছিল ‘নবীন ও কাঁচা’দের অপরিপক্বতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটা ভিডিওতে দেখা গেছে— কোনো এক এইচএসসি শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলছে— তাদের আন্দোলনে ভার্সিটির ভাইয়ারা এগিয়ে আসছেন না। তাদের পাশে কেউ নেই। তার অভিযোগ, চব্বিশে কোটাবিরোধী আন্দোলনে তারা ছিল। মাঠে লড়াই করেছিল। এখন ভার্সিটির ভাইয়াদের পাশে পাচ্ছে না তারা।
হতে পারে এই বিক্ষোভ নিয়ে ‘ভার্সিটির ভাইয়া’দের দ্বিধা ছিল। দ্বিধা মানে দ্বিধাই। দ্বিধা মানে এটা বোঝানো হচ্ছে না— এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পেছনে কোনো না কোনো পক্ষের সুতার টান ছিল।
দাবি মেনে নেয়ার পরও বিক্ষোভ কেন থামেনি? এর পেছনের কারণ হতে পারে বিক্ষোভকারীদের গতিজড়তা। দুই বছর আগের বিপ্লবটা তাদের চোখের সামনে ঘটে গেছে। তাদের কেউ কেউ রাজপথে লড়াই করেছে, শহীদ হয়েছে। সেই গতিজড়তাটা এখনো থেকে গেছে। একটু উনিশ-বিশেই ফুঁসে উঠছে তারা। আর এই সংবেদনশীলতা কাজে লাগাতে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া শক্তি ওঁত পেতে আছে। শিক্ষার্থীরা তাদের ক্ষোভ জানাতে রাস্তায় নেমেছে। ওই সময় পেছন থেকে কেউ না কেউ তাদের শরীরে সুতা বেঁধে দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকতে পারে।
প্রবাসে বসে সেই ‘তিনি’ যে সবসময় বাংলাদেশের দিকে সুতা পেতে রাখেন, এটা কি সরকারে যারা আছেন, তাদের জানা নেই? তাহলে তারা এই সুযোগ করে দিচ্ছেন কেন? তারা কি এই সত্যটা জানেন না?— মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু জিহ্বা, আবার বড় শত্রুও এই জিহ্বাই। জিহ্বা দিয়ে যুদ্ধের ময়দান জয় করে আসা যায়। আবার জিহ্বার অসতর্ক ব্যবহারে জেগে ওঠে আগ্নেয়গিরি। জিহ্বা সামলাতে পারেননি বলে তো সেই ‘তাকে’ পালিয়ে যেতে হয়েছে দিল্লিতে।
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পেছনে সুতার প্রথম টান কিন্তু কোনো ‘ষড়যন্ত্রকারী’দের থেকে আসেনি। এসেছে খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের মুখ থেকে। সেই আলোচিত ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা গেছে— ওরা তো ফার্মের মুরগি, একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর চলে আসবে।
তিনি হয়তো স্নেহভরে, রসিকতা করে অভিভাবকসুলভ কথা বলেছেন; কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে রসিকতা করলেও ভেবে-চিন্তে করতে হয়। একজন মন্ত্রীর প্রতিটি কথা, প্রতিটি নিঃশ্বাসের রাজনৈতিক মূল্য থাকে। ড্রয়িংরুমে যা বলা যায়, মন্ত্রী হিসেবে ক্যামেরার সামনে সেটি বলা যায় না।
‘ফার্মের মুরগি’ শব্দটা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে তীরের মতো বিঁধে গেছে। যে শিক্ষার্থী পানি ভেঙে, জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে কাকভেজা হয়ে পরীক্ষা দিতে গেছে— সে তো ফার্মের মুরগি নয়! তার সাথে এমন তুলনা দিলে আহত হওয়াই স্বাভাবিক। আর শহুরে শিক্ষার্থীরা এমন মন্তব্যকে নিজেদের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করেছে। চব্বিশের পর তারা অবজ্ঞা হজম করার মানসিকতায় নেই। এটি শিক্ষামন্ত্রীও ভালো করে বোঝেন। তিনি জানেন, সেই ‘তার’ রেজিম যখন চলছিল, তখন তাদের কেমন অবজ্ঞা করা হতো।
এহসানুল হক মিলন ছিলেন নির্যাতিত। বহুবার হেনস্তা করা হয়েছে তাকে। তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল চুরি, ছিনতাই ও লুটপাটের অভিযোগ। এসব ‘ছ্যাঁচড়া’ অভিযোগ মাথায় নিয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে তাকে। তিনি একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ, ব্যক্তি হিসেবে ভদ্র এবং মার্জিত।
চারদলীয় জোট সরকারের সময় নকলের মহামারী দূর করেছিলেন এহসানুল হক মিলন। তিনি তখন ছিলেন শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী। কেন্দ্রে কেন্দ্রে আকস্মিক পরিদর্শনে যেতেন তিনি। তার সেই অবদানের কথা মনে রেখেছে বাংলাদেশ।
শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন উচ্চশিক্ষিত। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলে কথা বলে অভ্যস্ত। এ কারণে অন্যদের তুলনায় তিনি শব্দচয়নে বেশি সতর্ক থাকবেন, সেটি আশা করা হয়; কিন্তু দেখা গেল তার মুখ থেকে বের হওয়া একটা কথায় রাজপথ গরম হয়ে গেল। শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে হলো এটা প্রমাণ করতে যে, তারা আসলে ফার্মের মুরগি নয়।
সরকার যদি প্রথম দিন থেকে শিক্ষার্থীদের আবেগকে গুরুত্ব দিত, তাহলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।
গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন— বুকসমান, কোমরসমান পানি ভেঙে হলের দিকে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীরা। এক হাতে প্লাস্টিকের ফাইল। এর ভেতর প্রবেশপত্র, রেজিস্ট্রেশন কার্ড। অন্য হাতে ভেজা জামা উঁচু করে ধরে রাখা। পরীক্ষার্থীদের সবাই শহরের ধনী পরিবারের সন্তান নয়। তাদের অনেকের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। হয়তো বাবা রিকশা চালান, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।
সন্তানকে কোনোরকম জোগাড় করে দিয়েছেন ফরম ফিলাপের টাকা। বন্যায় তাদের ঘর ডুবে গেছে। চালের পাত্র ভিজে গেছে। এই অবস্থায় থেকে কী করে পদার্থবিদ্যার মতো জটিল একটা বিষয়ের প্রশ্নের উত্তর লিখবে পরীক্ষার্থী? তার ওপর প্রশ্নপত্রে ত্রুটি থাকলে হলে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া তো স্বাভাবিক। কেবল ফুল মার্কস দিয়ে কি সেই ট্রমার ক্ষতি পোষানো সম্ভব? এ বিষয়গুলো কী নীতিনির্ধারকরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভেবে দেখেছেন?
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



