মহাসড়কে ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতি আর কতদিন

জনগণ করের টাকা দিয়ে যে সড়ক প্রশস্ত করে, তা যদি সাধারণের চলাচলে উপকারে না আসে, তবে সেই উন্নয়নের মানে কী? মহাসড়ক চার লেনের পরিবর্তে ছয় লেন করা হলেও রাস্তার দুই পাশের অবৈধ দোকানপাট ও স্ট্যান্ড যদি সেই দখল ধরে রাখে, তবে কার্যকর লেনের সংখ্যা দুই বা তিন লেনে এসে ঠেকে। এটি প্রকৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে একটি বড় অপচয়। অবকাঠামো উন্নয়নে যে বিপুল বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়, তার বেশির ভাগ চলে যায় নির্মাণকাজে। সেই অবকাঠামো রক্ষায় যে ‘ম্যানেজমেন্ট’ বা সুশাসন দরকার, তা আমাদের পরিকল্পনায় বরাবর অনুপস্থিত।

দেশের সড়ক অবকাঠামো আজ গভীর ও বহুমাত্রিক সঙ্কটের মুখোমুখি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক চার বা ছয়লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব প্রশস্ত সড়ক দেশের অর্থনীতির প্রাণসঞ্চারের মাধ্যম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। রাস্তা চওড়া হচ্ছে ঠিকই, সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে বিভিন্ন অপরাধী সিন্ডিকেট, একশ্রেণীর শ্রমিক নেতা ও দখলদার চক্র। হকার, সিএনজি, রিকশা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দখলে চলে যাওয়া এসব সড়ক আজ মানুষের চলাচলের পরিবর্তে চাঁদাবাজির এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই মহাসড়কগুলোতে জনদুর্ভোগের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং উন্নয়নের প্রকৃত সুফল পাওয়ার পথে বিশাল বাধা।

দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের সাথে সাথে সেখানে এক ধরনের ‘অলিখিত ইজারা প্রথা’ বা দখলদারত্ব শুরু হয়। সড়ক বা মহাসড়কের বিভিন্ন স্পট দখল করে অস্থায়ী দোকান, ফলের আড়ত, সবজি বা মাছ-গোশতের বাজার বসানো হয়। এরপর সেখানে প্রবেশ করে সিএনজি, রিকশা ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড। এ পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কাজ করে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র, মাস্তান এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনের একাংশ। অনেক ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের পদধারীরা নিজেরা চাঁদাবাজির হোতা। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা চাঁদাবাজির বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তারা জানেন, মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরলে বা অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো উচ্ছেদ হলে তাদের দৈনিক লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা কৌশলে সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন।

গবেষণায় দেখা যায়, একজন হকার বা ছোট বিক্রেতা থেকে শুরু করে সিএনজি চালক— প্রত্যেকে দৈনিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ চাঁদা দিতে বাধ্য হন। এই অর্থ থানা পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ, স্থানীয় শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মাসোহারা হিসেবে বণ্টিত হয়। সড়ক প্রশস্তের সাথে সাথে সিন্ডিকেটের আওতাও বাড়ে; ফলে জায়গা যত বেশি হয়, দখলদারত্ব তত বাড়ে। চাঁদাবাজির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। টিআইবির গবেষণার তথ্য, পরিবহন খাত ও সড়কপথের চাঁদাবাজি থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়।

কেন এই সমস্যা নির্মূল হচ্ছে না? এটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। ফুটপাথ বা রাস্তার পাশের জায়গা দখল করে চাঁদাবাজির পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির বড় ভূমিকা থাকে। একেক এলাকায় দখলদারত্বের নিয়ন্ত্রণ বদলায়, কিন্তু চাঁদাবাজির পদ্ধতি একই থাকে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাংশের সাথে চাঁদাবাজদের যোগসাজশ থাকায় আইন প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাবে অসংখ্য মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় হকারি করছেন। তাদের অসহায়ত্ব পুঁজি করে চাঁদাবাজরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।

মহাসড়কগুলোতে সিএনজি চালিত তিন চাকার অটোরিকশা বা ছোট যানের চলাচল আইনত নিষিদ্ধ। মহাসড়কে ভারী যানবাহন (যেমন : বাস, কার, লরি ও ট্রাক) দ্রুতগতিতে চলে। সিএনজি বা অটোটেক্সির মতো ছোট ও ধীরগতির যানবাহন যখন হাইওয়েতে ওঠে, তখন তা বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়। ৮০-১০০ কিলোমিটার গতির বাসের সামনে সিএনজির আকস্মিক উপস্থিতি বা লেন পরিবর্তন ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্ম দেয়। এতে যাত্রী ও চালকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ থাকে। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে সিএনজি চালকরা নিয়মিত মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ অনাচারের পেছনে আছে ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতি। স্থানীয় পুলিশ ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটকে মাসিক বা সাপ্তাহিক ‘টোকেন’ ফি দিয়ে ছোট যান চালকরা মহাসড়কে নিজেদের অবস্থান বৈধ করে নিয়েছেন।

ক্ষমতার সমান্তরাল কাঠামো
অতীতে শ্রমিক নেতাদের দাপট এতটা প্রবল ছিল যে, তাদের সংগঠনগুলো যেন রাষ্ট্রের সমান্তরাল একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। মহাসড়কে কোন গাড়ি চলবে, কোথায় সিএনজি স্ট্যান্ড বসবে, কে চাঁদা তুলবে— এসব সিদ্ধান্ত নিতেন স্থানীয় পর্যায়ের শ্রমিক নেতারা। যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (পুলিশ বা ট্রাফিক বিভাগ) নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে যেত, তখন এসব নেতার রাজনৈতিক পরিচয় তাদের ঢাল হিসেবে কাজ করত। যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অসাধু সদস্যরা চাঁদাবাজির অর্থের অংশীদার হন, তখন আইন প্রয়োগের নৈতিক ক্ষমতা তাদের থাকে না। ফলস্বরূপ, মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে উচ্চ গতির বাস ও ট্রাকের জন্য, কিন্তু সেই প্রশস্ত জায়গা দখল করে রাখা এসব ছোট যান যানজট সৃষ্টি করছে এবং প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ।

পরিবহন খাত বিশাল শ্রমশক্তি অধ্যুষিত। রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের রাজনীতির হিসাব কষতে গিয়ে এই খাতের নেতাদের সবসময় তোয়াজ করে চলেছে। দলগুলো জানত, এসব নেতাকে চটালে বা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কঠোর হলে নির্বাচনের সময় বড় ধরনের ক্ষতিতে পড়তে হবে। তাই মহাসড়কের শৃঙ্খলা রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক স্থিতি বজায় রাখা বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। উন্নয়নের নামে সড়ক প্রশস্ত করা হলেও, শ্রমিক সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক সদিচ্ছা কখনো দেখা যায়নি।

সড়ক অব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার পথচারী ও যাত্রীসাধারণ। সড়কের জায়গা দখল হওয়ায় যানবাহন ও মানুষের চলাচলের পথ সঙ্কুচিত হয়ে যায়, যা প্রতিদিন হাজারো মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট করে। এর যে আর্থসামাজিক ক্ষতি (যেমন : দীর্ঘ যানজট, দুর্ঘটনা, সময় অপচয়), তা হিসাব করা সম্ভব নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য বিশাল বোঝা। এর পেছনে কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। হকাররা পরিস্থিতির শিকার। তাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ না করে উচ্ছেদ করলে তারা ফের রাস্তায় ফিরে আসেন, কারণ, তাদের জীবিকা এখানে জড়িত।

জনগণ করের টাকা দিয়ে যে সড়ক প্রশস্ত করে, তা যদি সাধারণের চলাচলে উপকারে না আসে, তবে সেই উন্নয়নের মানে কী? মহাসড়ক চার লেনের পরিবর্তে ছয় লেন করা হলেও রাস্তার দুই পাশের অবৈধ দোকানপাট ও স্ট্যান্ড যদি সেই দখল ধরে রাখে, তবে কার্যকর লেনের সংখ্যা দুই বা তিন লেনে এসে ঠেকে। এটি প্রকৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে একটি বড় অপচয়। অবকাঠামো উন্নয়নে যে বিপুল বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়, তার বেশির ভাগ চলে যায় নির্মাণকাজে। সেই অবকাঠামো রক্ষায় যে ‘ম্যানেজমেন্ট’ বা সুশাসন দরকার, তা আমাদের পরিকল্পনায় বরাবর অনুপস্থিত।

স্ট্যান্ড হোক নিজস্ব জমিতে
সড়ক দখল করে যে নৈরাজ্য চলছে, তা শুধু আইন প্রয়োগ দিয়ে চিরস্থায়ীভাবে সমাধান করা কঠিন; যদি না চালক ও মালিকদের জন্য একটি বিকল্প ও বৈধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। রিকশা, টমটম বা সিএনজি মালিকদের শক্তিশালী সমিতি আছে। এগুলো নিয়মিত চাঁদাবাজির পেছনে অর্থ ব্যয় না করে যদি সেই অর্থ ও সাধারণ চাঁদার একটি অংশ একটা ‘কমন ফান্ডে’ জমা করে, তারা খুব সহজে সড়কের পাশে জমি লিজ নিতে বা ক্রয় করতে পারে। সমিতিগুলো যখন নিজস্ব জমিতে স্ট্যান্ড করবে, তখন নিজেরাই শৃঙ্খলারক্ষক হিসেবে কাজ করবে। এতে রাস্তার ওপর অবৈধ দখলদারত্ব আর থাকবে না। এ ছাড়া সরকার চাইলে জনস্বার্থে সড়কের নিকটবর্তী অব্যবহৃত খাসজমি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে পরিবহন স্ট্যান্ডের জন্য বন্দোবস্তি বা লিজ দিতে পারে। জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে মালিক সমিতিগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি ‘পরিবহন শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। যখন বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা থাকবে, মহাসড়ক দখল করা চলবে না।

প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা
এই সঙ্কট সমাধানের প্রধান চাবিকাঠি প্রশাসনিক কঠোরতা। এটি কেবল ‘উচ্ছেদ’ নয়, বরং একটি টেকসই কাঠামোর দাবি রাখে। এক. কোনো নির্দিষ্ট সড়কের দখলদারত্বে ওই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক ইনচার্জ বা থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করতে হবে। দখলদারত্বে যদি বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তাহলে পুলিশ প্রশাসন চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করবে। দুই. সড়কের পাশে কোনো অবৈধ স্ট্যান্ড রাখা যাবে না। সব যান চলাচলে সুনির্দিষ্ট টার্মিনাল থাকতে হবে। সেখানে নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ করে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম চালু করতে হবে। যখন চাঁদা ডিজিটালাইজড হবে, তখন চাঁদাবাজদের কোনো সুযোগ থাকবে না। তিন. সড়ক মনিটরিংয়ে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে মহাসড়কের দখলদারদের শনাক্ত করে সাথে সাথে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা ও তৎপরতা বাড়িয়ে দখলদারত্বকে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চার. প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ এবং দলীয় প্রভাব চাঁদাবাজির প্রধান জ্বালানি। উচ্চপর্যায় থেকে যতক্ষণ না পর্যন্ত এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হবে, ততক্ষণ নিম্নপর্যায়ের প্রশাসনিক কঠোরতা মাঝপথে থমকে যাবে। পাঁচ. সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা, যার কাজ হবে দেশের প্রতিটি জেলা ও মহাসড়ককে অবৈধ দখলমুক্ত রাখা। চাঁদাবাজির সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।

উন্নয়ন মানে শুধু ইট-পাথরের মহাসড়ক নয়; উন্নয়ন মানে নাগরিকের নিরাপত্তা, গতিশীলতা এবং আইনের শাসন। আমরা যখন মহাসড়ককে আধুনিকায়ন করছি, তখন তার সাথে আমাদের সমাজ ও প্রশাসনিক মানসিকতারও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রশস্ত রাস্তা দখল করে যে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা উন্নয়নের সব অর্জন কলঙ্কিত করছে। রাস্তা চওড়া করার স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি সেই রাস্তা যেন সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলে উন্মুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করা হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন হোক জনবান্ধব, সিন্ডিকেটমুক্ত এবং টেকসই। অন্যথায়, প্রশস্ত সড়কের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল এক শ্রেণীর চাঁদাবাজদের অর্থনৈতিক উন্নতির হাতিয়ার হয়ে থাকবে। মহাসড়কে এই ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতির কবর রচনার এখনই সময়।

লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়

[email protected]