২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট এমন এক ক্রান্তিলগ্নে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি একযোগে বহুমুখী অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঝড়ের মুখোমুখি। দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি, ব্যাংক খাতের গভীরে প্রোথিত দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমাগত ক্ষয় এবং রাজস্ব আহরণের দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা- সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো এখন চরম চাপে। এই জটিল বাস্তবতা সামনে রেখে সরকার আগামী অর্থবছরের বাজেটকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধারের একটি ‘পুনরুদ্ধারমুখী রূপরেখা’হিসেবে তুলে ধরেছে।
বাজেটের তাত্ত্বিক কাঠামো ও ঘোষিত লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়, সময়োপযোগী ও জনবান্ধব। কিন্তু অর্থনীতির সমকালীন রূঢ় বাস্তবতার আয়নায় তাকালে একটি মৌলিক ও অনিবার্য প্রশ্ন সামনে আসে- এসব লক্ষ্য অর্জনের পথ কতটা মসৃণ এবং বাস্তবসম্মত? কারণ আধুনিক অর্থনীতিতে বাজেটের সাফল্য কেবল কিছু কাগুজে সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা বা চটকদার রাজনৈতিক ঘোষণায় নির্ভর করে না; বরং তা চূড়ান্তভাবে নির্ভর করে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা, সুশাসন ও অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ওপর।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বাজেট মূল্যায়নে একটি ধ্রুব সত্য পুনর্ব্যক্ত করেছে : বাজেটের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে ঘোষণার বিশালত্বে নয়, বরং বাস্তবায়নের গুণগত মানে। বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাও এ পর্যবেক্ষণের পক্ষে অকাট্য সাক্ষ্য দেয়। প্রতি বছর একধরনের প্রথাগত আশাবাদের ওপর ভিত্তি করে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা যায় বাস্তবতার সাথে ওই ঘোষণার ব্যবধান আকাশচুম্বী। ফলে মূল প্রশ্নটি এখন আর ‘বাজেট কত বড়’ বা ‘কতটা প্রবৃদ্ধিমুখী’- তা নয়; বরং মূল প্রশ্ন- অর্থনীতির বিদ্যমান কাঠামোয় সরকার কতটা কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে।

রাজস্ব আহরণ : বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
যেকোনো দেশের উন্নয়ন ও বাজেট বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো অভ্যন্তরীণ সম্পদ তথা রাজস্ব আয়। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দুর্বল ও ভঙ্গুর ক্ষেত্র। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এখন প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের জন্য ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে এটিকে হয়তো আগের বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার থেকে ১৮ শতাংশ বেশি মনে হতে পারে, যা আপাতভাবে যৌক্তিক ও অর্জনযোগ্য বলে ভ্রম তৈরি করে। কিন্তু এর পেছনের প্রকৃত পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার হিসাবটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) অফিসিয়াল ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এনবিআরের রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ১১ দশমিক ১৫ শতাংশের কিছু বেশি। আর আগের অর্থবছরের সংশোধনী লক্ষ্যমাত্রা সঠিকভাবে অর্জিত না হওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্বছরের এনবিআর এর মূল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হয়ে যায় আগের বছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। আর সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা আরো সোয়া ৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। মানে হলো চলতি বছরের এনবিআরের রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশের মতো। চলতি এই অর্থবছরের শেষ ২ মাসে আগের ১০ মাসের একই হারে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হলে শেষ অবধি ২১/২২ শতাংশ ঘাটতি থেকে যেতে পারে। তার মানে হলো এই ঘাটতির সমহারে বেড়ে যাবে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী সাড়ে ৩২ শতাংশ রাজস্ব বাড়াতে হবে এনবিআরকে। বাংলাদেশের নিকট ইতিহাসে তেমন অর্জনের নজীর দেখা যায় না।
আরো গুরুতর বিষয় হলো, এ অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঠিক কোথা থেকে আসবে, সে প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক রোডম্যাপ বাজেটে নেই। ব্যবসায়ী শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) সম্প্রসারণ এবং খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট প্রশাসনের আওতা বাড়ানোর কিছু সনাতনী উদ্যোগের কথা বলা হলেও এর বড় অংশই দেশের সৎ করদাতা, সাধারণ ভোক্তা ও মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা আরো বাড়াবে। সেই সাথে তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপর তীব্র মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু করজালের বাইরে বিলাসী জীবনযাপন করা উচ্চ আয়ের ব্যক্তিবর্গ, কর ফাঁকির বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক উৎস, অর্থ পাচারকারী সিন্ডিকেট এবং বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে করের আওতায় আনার কোনো সাহসী, সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান রূপরেখা এ বাজেটেও অনুপস্থিত।
কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা : কেন পিছিয়ে থাকে রাজস্ব
রাজস্ব ঘাটতির এ ক্রনিক রোগ বা স্থবিরতার পেছনে সাময়িক কোনো কারণ নেই; বরং এর পেছনে কাজ করছে দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,
আমদানিনির্ভর রাজস্ব কাঠামো : বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের একটি বড় অংশ কাস্টমস বা আমদানি পর্যায়ের শুল্ক ও ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ডলার সঙ্কটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে বিলাসবহুল পণ্য তো বটেই, শিল্পের অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। স্বাভাবিকভাবে কাস্টমস খাত থেকে প্রত্যাশিত রাজস্বের গতি থমকে গেছে।
কর ফাঁকি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তার : দেশে করদাতার সংখ্যা কাগজে-কলমে বাড়লেও নিয়মিত ও কার্যকর সংখ্যা এখনো নগণ্য। একটি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি কর ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আন্ডার-ইনভয়েসিং, ওভার-ইনভয়েসিং ও হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার, যা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত : সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিম্ন পর্যায়ে (মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে) আছে। এই প্রাচীন ও ক্ষয়িষ্ণু কর কাঠামো নিয়ে কোনো মৌলিক প্রশাসনিক সংস্কার, আধুনিক ডিজিটাল নজরদারি এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় তথ্যভিত্তিক কর ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন না করে শুধু করারোপের মাধ্যমে রাজস্বে বড় রূপান্তর আশা করা সম্পূর্ণ অবাস্তব।
আর্থিক খাতের ভগ্নদশা ও বিনিয়োগ স্থবিরতা
বাজেটের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বড় বাস্তবতা হলো দেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের চরম সুশাসনের অভাব ও তারল্য সঙ্কট। বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক প্রভাব, বেনামি ঋণ জালিয়াতি ও খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পাহাড় ব্যাংকগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে সরকার যদি আবারো অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তবে তা বেসরকারি খাতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। অর্থনীতিতে তীব্র ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব সৃষ্টি হবে, যেখানে ব্যাংকগুলো সরকারকে নিরাপদ ঋণ দিতে গিয়ে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া বন্ধ বা সীমিত করে দেবে।
সুদের উচ্চ হার ও ডলার সঙ্কটে এমনিতে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এর ওপর যদি ঋণের প্রাপ্যতা আরো সঙ্কুচিত হয়, তবে শিল্পায়ন থমকে যাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য কাগজে বাণীরূপে রয়ে যাবে।
মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক সুরক্ষার টানাপড়েন
বাজেটের সবচেয়ে বড় সামাজিক পরীক্ষা হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। দুই অঙ্কের কাছাকাছি থাকা খাদ্য মূল্যস্ফীতি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম যাতনায় ঠেলে দিয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোর কথা বলা হলেও বাস্তব পদক্ষেপে বড় অসঙ্গতি আছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত মানতে গিয়ে সরকার বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়াচ্ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরো উসকে দিচ্ছে। অন্য দিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, তা মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হারের তুলনায় এতটাই অপ্রতুল যে, তা দরিদ্র মানুষের ক্ষয়প্রাপ্ত ক্রয়ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একই সাথে একটি বড় সুযোগ, একই সাথে কঠিন অগ্নিপরীক্ষাও। সঙ্কটের তীব্রতা স্বীকার করে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার যে লক্ষ্য সরকার নির্ধারণ করেছে, তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু সংস্কারের বাস্তব কুঠার না চালিয়ে কেবল সংখ্যার চাতুর্য দিয়ে এ সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয়।
রাজস্ব প্রশাসনের আমূল ডিজিটাল রূপান্তর, ব্যাংক খাতে আপসহীন সুশাসন ও খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, করজালের গুণগত সম্প্রসারণ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির গুণগত মান নিশ্চিত করা না গেলে এ বাজেটও অতীতে পথ হারানো বাজেটগুলোর মতো আরেকটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় তাই বাজেটের মূল প্রশ্নটি এখনো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে- ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব কি আসলে আদায় হবে? এনবিআরের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সাত লক্ষ ১ হাজার কোটি টাকার সার্বি রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রাও অর্জিত হবে না। কারণ এই একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরের ওপর নির্ভর করছে পুরো বাজেটের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা। আয়ের ঘরে শূন্যতা থাকলে ব্যয়ের পরিকল্পনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



