জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন

সাধারণ মানুষ বাজেটের ভালো-মন্দ বিচার করবে তাদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে। তবে সব সমস্যার সুরাহা এক বাজেটে এবং এক অর্থবছরে হওয়ার নয়। অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এবারের বাজেট তৈরি করা হয়েছে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, ঘোষিত বাজেটে জনকল্যাণের চিন্তা সবিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

সৈয়দ তোশারফ আলী
সৈয়দ তোশারফ আলী |ফাইল ছবি

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের এটিই প্রথম বাজেট, যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫.৫ এবং মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। উপস্থাপিত বাজেটের লক্ষ্য হলো অর্থনীতি স্থিতিশীল ও গতিশীল করা। সেই সাথে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে সরকার পরিচালনার ব্যয় নির্বাহ, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা প্রদান ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। আশার কথা, প্রস্তাবিত বাজেট আলোচিত পর্যালোচিত হবে জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা। এছাড়া সংবাদপত্র ও সামাজিকমাধ্যমেও প্রস্তাবিত বাজেটের উপর চুলচেরা আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। পরিশেষে আমরা একটি জনবান্ধব বাজেট পাব বলেই মনে হয়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট জ্বালানির সঙ্কট মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকার বাজেটের অপেক্ষা না করে অকটেন, পেট্রল, ডিজেল, এলএনজির দাম বাড়িয়েছে। বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দামও। বাজেটের আগে এই দাম বাড়ানো নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে বাজেট বক্তৃতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এমনকি সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম শুল্কমুক্ত করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি ভালো সিদ্ধান্ত। বিগত সরকার জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্ব না দিয়ে আমদানিমুখী, বিদেশী ঋণনির্ভর, বিদেশী কোম্পানির নীতিমালা মেনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পঙ্গু করে গেছে। বর্তমান সরকারের উচিত হবে জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের পথে হাঁটা। কারণ, বিদেশী কোম্পানি নির্দেশিত উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি মেনে চলার মডেল অনুসরণ করা হবে আত্মঘাতী। এ প্রসঙ্গে এলএনজি আমদানির চুক্তি এবং বাজেটের আগেই গ্যাস-তেল-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির অনুকূলে তথ্য ও যুক্তি জাতীয় সংসদে তুলে ধরার মাধ্যমে জবাবদিহির সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেতে পারে। অর্থমন্ত্রী যেখানে বাজেটকে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন বলে দাবি করেছেন তখন এ দাবি সঙ্গত কারণেই তোলা যায়।

জাতীয় বাজেট জুনে উপস্থাপনের রেওয়াজ থাকলেও এর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সুবিন্যস্ত করার কাজ শুরু হয় অনেক আগে থেকে। আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ কাজে দক্ষ জনবল রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের এ কাজে প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর এখন তো এ কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে তথ্য-উপাত্তের নির্ভরযোগ্যতা ও নির্ভুলতা নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী উপস্থাপন করেছেন তাকে আর যা-ই হোক, গতানুগতিক বলার সুযোগ নেই। অতীতের একাধিক বাজেট দেখলে বোঝা যায়, বছর বদলে গেলে অঙ্কের ফিগারগুলো কেবল বদলে যেত। কিন্তু এবার অঙ্কের ডিজিট বদল করে বাজেট তৈরি করা হয়নি। এর মধ্যে নতুন চিন্তাভাবনার ছাপ রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন স্কেল পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আগে চালু মুক্তিযোদ্ধা ভাতার সাথে যোগ করা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত, পঙ্গু, অন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ভাতা। ক্যান্সার আক্রান্তদের চিকিৎসায় অনুদানের পরিমাণ বেড়েছে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস খরচ কমানো হয়েছে। হার্টের রিং, চোখের লেন্সের দামও কমানো হয়েছে। ছাত্রীদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে লেখাপড়া শেখার সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়েছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের ৩০ শতাংশ গ্র্যাচুইটি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি খাতেও অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সর্বসাকুল্যে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি মেটাতে ট্যাক্স, ভ্যাট, শুল্ক ও অন্যান্য খাত থেকে আয় হবে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ হবে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের টাকা জোগাড় করাই এই বাজেট বাস্তবায়ন করার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এনবিআরকে এ ব্যাপারে অতীতের ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হবে। এদেশে মূল্য সংযোজন কর প্রথম চালু করে বিএনপি সরকার। কিন্তু বিগত আমলে ভ্যাট আদায় করা হলেও সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এবার এ ক্ষেত্রে কড়াকড়ি করলে কর আদায়ের পরিমাণ অবশ্যই বাড়বে। ঋণ করে ঘি খেতে গেলে সমস্যা বাড়ে, সে অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। এ পর্যন্ত নেয়া ঋণের সুদ হিসাবে এ বছর পরিশোধ করতে হবে এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। তারপরও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়া না গেলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা দুরূহ হবে। ঋণের অর্থ যথাসময়ে পাওয়ার গ্যারান্টি নেই। ঋণপ্রাপ্তি অনেক সময় রাজনীতির ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় দাতা সংস্থার বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়। আবার ঋণ পরিশোধের রেকর্ডও ভালো থাকতে হয়। সরকার আশা করছে– আইএমএফ, এডিবি প্রভৃতি দাতা সংস্থা ছাড়াও বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার দেশগুলোও সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।

জাতীয় বাজেট দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। দেশের অর্থনৈতিক প্রাণপ্রবাহের অন্যতম চালিকাশক্তি ব্যাংকিং সেক্টর। ব্যাংকের সহযোগিতা ছাড়া ব্যবসায় বলুন, শিল্প বলুন, কিছুই বিকশিত হতে পারে না। সরকারও ব্যাংক থেকে প্রচুর ধার নিয়ে থাকে। এবারের বাজেটেও সে সুযোগ রাখা হয়েছে তবে পরিমাণ কমানো হয়েছে। কারণ, এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ সঙ্কুচিত হয়ে যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই ব্যাংক সেক্টর। যা মেরামত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের অর্থনীতির শক্তি প্রতিফলিত হয় তার শেয়ার মার্কেটে। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে দুর্বৃত্ত পুঁজির মালিকরা এই পুঁজিবাজারটিকেও ধ্বংস করে রেখে গেছে। দেশের অনেক কলকারখানা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ফলে শ্রমিকদের একটি অংশ কাজ হারিয়েছে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তেমন সৃষ্টি হচ্ছে না। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে উচ্চ ডিগ্রিধারী বেকারের হার সবচেয়ে বেশি (৩৩ শতাংশ)। শিক্ষিত বেকার থাকার অর্থ শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয়। যার একটি অংশ পরিবারের অপর অংশটি রাষ্ট্রের। তার পরও এবারের বাজেটে উচ্চ শিক্ষায় ঋণ পাওয়ার সুবিধা রাখা হয়েছে; কিন্তু চাকরির সুযোগ না থাকলে ঋণ করে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে কী হবে?

বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন না এনে অর্থ ব্যয়ে তেমন লাভ হবে না। আর জনস্বাস্থ্যের উন্নতি দেখতে চাইলে ভেজালমুক্ত খাবার, দূষণমুক্ত বায়ু, বিশুদ্ধ পানীয় জল, খেলার মাঠ, শরীর চর্চার কেন্দ্র এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে মানসম্মত শিক্ষিত জনবল যেমন পাওয়া যাচ্ছে না, তেমনি ব্যবসায়ী মনোভাব নিয়ে হাসপাতাল ক্লিনিক মেডিক্যাল কলেজ আর ডাক্তারের সংখ্যা বাড়িয়েও জনস্বাস্থ্যের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ঘটবে না। এ নিয়ে ভিন্নতর ভাবনা ও পরিকল্পনার দরকার আছে।

সাধারণ মানুষ বাজেটের ভালো-মন্দ বিচার করবে তাদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে। তবে সব সমস্যার সুরাহা এক বাজেটে এবং এক অর্থবছরে হওয়ার নয়। অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে এবারের বাজেট তৈরি করা হয়েছে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, ঘোষিত বাজেটে জনকল্যাণের চিন্তা সবিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

লেখক : দ্য নিউ ন্যাশনের উপদেষ্টা সম্পাদক