আগ্রাসী ভূমিকা থেকে সমঝোতার পথে যুক্তরাষ্ট্র : সাফল্য ইরানের

চুক্তি অনুযায়ী, ইরান সবচেয়ে লাভবান হয়েছে। এত দিন দু’টি দেশের মধ্যে সমঝোতার কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। এখন থেকে ইরান নির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আলোচনা চালাতে পারবে। ইরান আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যে সুবিধা পাবে; তা তাদের দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় সুবিধা দেবে। দেশটি যদি নির্বিঘ্নে তেল ও অন্যান্য পণ্য রফতানি করতে পারে, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে

ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব
ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

সাম্প্রতিককালে সংঘটিত যুদ্ধে বিশ্বে সামরিক শক্তিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের কাছে দুর্বল বলে কথিত ইরান যে হিম্মত দেখিয়েছে, তা রীতিমতো বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর অব্যাহত অর্থনৈতিক অবরোধ ও অসহযোগিতা সত্ত্বেও দেশটি ও তার ইসলামী সরকার যে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা এক কথায় বিস্ময়কর। বিশেষ করে বিগত কয়েক মাসে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত আক্রমণে ইরান তার শীর্ষ নেতাকে হারানো ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও প্রতিরোধের অংশ হিসেবে এক সাথে সাতটি দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক হামলা চালিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। একাধিক সূত্র অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানি আক্রমণে এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, যা আর ব্যবহার উপযোগী নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সঠিক তথ্য লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও এখন জানা যাচ্ছে, তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক বাহিনী সদস্যকে হারিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরান তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে যে শক্তিমত্তা ও কৌশল দেখিয়েছে, তাও সবাইকে বিস্মিত করেছে। ইরানের নিজস্ব বিমানবাহিনী দুর্বল হলেও মিসাইল প্রযুক্তিতে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এর পেছনে অবশ্য রাশিয়া ও চীনের সহযোগিতা রয়েছে বলে মনে করা হয়। এখন লক্ষণীয় যে, ইরানের সাথে যুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের যে দম্ভ ছিল; তা প্রমাণিত হয়নি। তারা বলতে গেলে এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এটি পরিষ্কার যে, এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সুপারপাওয়ার ইমেজ দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। অনেকে এখন আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র কি তাহলে বিশ্বব্যাপী তার সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রাধান্য হারাতে বসেছে। বিষয়টি একটু পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি, জাপান ও ইতালিকে পরাজিত করতে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাশাকি শহরে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়। সেই সাথে বিশ্বে নিজেকে হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পাশাপাশি ইউরোপের বিধ্বস্ত অর্থনীতি ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের নেতৃত্ব নিয়ে নেয়। সেখানে ব্যাপক বিনিয়োগের সুবিধার্থে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ গঠন করে বিশ্ব অর্থব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হাতে নেয়। পাশাপাশি মার্শাল পরিকল্পনার আওতায় ইউরোপ পুনর্গঠনের কাজ হাতে নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোকে তার হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়। এরপরে যুক্তরাষ্ট্রকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দেশটি ক্রমান্বয়ে পুরো বিশ্বের প্রায় সর্বত্র অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। যুক্তরাষ্ট্র অতুলনীয় শিল্পায়ন, আর্থিক স্থায়িত্ব, ভূরাজনৈতিক সুবিধা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাফল্য ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুরো ইউরোপ বিধ্বস্ত হয় যায়। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশের ক্ষতি হয়। ব্রিটেনসহ ইউরোপের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ নিজেদের উপনিবেশগুলো স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু যুদ্ধে আমেরিকার কোনো ক্ষতি হয়নি। একদিকে আটলান্টিক, অপরদিকে প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে সুরক্ষিত যুক্তরাষ্ট্রকে কেউ যুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষতি করার সুযোগ এখন পর্যন্ত পায়নি। ফলে অর্থনৈতিক ও সামরিক খাতে যুক্তরাষ্ট্র অভাবনীয় সুবিধা পেয়ে যায়। এরূপ সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে সামরিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের পরিকল্পনা নেয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত প্রায় ৮০টি দেশে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে। ইউরোপের দেশগুলো নিয়ে গঠন করে ন্যাটো জোট। অবশ্য রাশিয়ার নেতৃত্বে ও প্রভাবে বহু দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রমাদ গুনতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ওয়ারশো সামরিক জোট গঠিত হলে তাদের উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়। একে মোকাবেলা করতে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী দেশগুলো কমিউনিজম-বিরোধী বিভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশল নিতে থাকে। এক পর্যায়ে ভিয়েতনামের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ২০ বছরব্যাপী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে বহু সম্পদ ও সেনা হারিয়ে সেখান থেকে পরাজিত হয়ে ফিরতে হয়।

দেশটি সামরিক শক্তির পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্র্ণের মজুদ গড়ে তোলে। এরপর নিজস্ব মুদ্রা ডলারের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর সউদি আরবকে কেবল ডলারের মাধ্যমে তেল বিক্রির চুক্তি করাতে সক্ষম হয়। এরপর মার্কিন ডলার বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যা আজও অব্যাহত আছে। কেবল কাগজের নোট ছাপিয়ে ডলারের এক ধরনের কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে চীন, রাশিয়ার মতো শক্তি কোনো বিকল্প কৌশল সফল করতে পারেনি। তবে ইরান, ইরাক, লিবিয়া বিকল্প মুদ্রায় তেল বিক্রির উদ্যোগ নিতে চাইলে ওই তিনটি দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে সাদ্দাম ও গাদ্দাফির মতো সাহসী নেতাকে জীবন দিয়ে মাশুল দিতে হয়। অপরদিকে, ইরানকে বাগে আনতে বিগত ৪৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র নানারকম বাধানিষেধ দিয়ে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চালাতে থাকে। তার সর্বশেষ উদ্যোগ হচ্ছে ২০২৬ সালের যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরাইলের প্ররোচনায় ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অবশ্য এতে তার নিজস্ব স্বার্থও নিহিত ছিল। প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল বেশ সফল হয় অর্থাৎ ইমাম খামেনিসহ ইরানের বেশ কিছু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে তারা বেশ উল্লসিত হয়েছিল। তারা ভেবেছিল, এর মধ্য দিয়ে ইরানের জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নামবে। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি; বরং ইরানিরা আরো ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। যুদ্ধের কৌশলে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। ইরান অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মিসাইল দিয়ে আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যাপক মাত্রায় বিধ্বস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানি কর্তৃত্ব বজায় থাকায় তারা কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যায়।

প্রায় তিন মাসব্যাপী যুদ্ধে ইরান একাধারে প্রায় সাতটি দেশের ওপর আঘাত হেনে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হারিয়েও যেভাবে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বিশ্বের অপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে চোখ রাঙিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে, তা দেখে পুরো বিশ্ব রীতিমতো হতবাক হয়েছে। যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান থেকে পরাজিত হয়ে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে, সে রকম একইভাবে তারা ইরানের সাথেও পরাজিত হয়েছে।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বিগত ১৭ জুন (২০২৬) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ডিজিটালি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন। এর মধ্য দিয়ে এই অন্তর্বর্তী চুক্তিটি কার্যকর হতে শুরু করেছে। পরবর্তী ৬০ দিনে মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর এটিই দুই দেশের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো।

এরূপ চুক্তির মধ্য দিয়ে কে কী পেল? মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘যদি আমি এটি (চুক্তি) পছন্দ না করি, তারা যদি ভালো আচরণ না করে, আমরা গিয়ে তাদের ঠিক মাথার মাঝখানে বোমা ফেলব।’ ট্রাম্পের এরূপ মজার কৌতুক নতুন কিছু নয়। পক্ষান্তরে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের গালিবাফ বলেন, ‘সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা যা কিছু অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পেয়েছি, এ নিয়ে কোনো তুলনাই চলে না।’ স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরানের আটককৃত তহবিল ফেরত প্রদান ও ইরানের পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নেবে। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরান কোনো টোল আরোপ করবে না, তবে সেখানে ওমান ও ইরানের প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ইরান আবার অঙ্গীকার করেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ‘আবার’ শব্দটি বলার কারণ হলো- এর আগেও ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এরূপ আশ্বাস দিয়ে চুক্তি করেছে। ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারকটির বিষয়বস্তু প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি অনুযায়ী, ইরান সবচেয়ে লাভবান হয়েছে। এত দিন দু’টি দেশের মধ্যে সমঝোতার কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। এখন থেকে ইরান নির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আলোচনা চালাতে পারবে। ইরান আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যে সুবিধা পাবে; তা তাদের দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় সুবিধা দেবে। দেশটি যদি নির্বিঘ্নে তেল ও অন্যান্য পণ্য রফতানি করতে পারে, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

এ যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় লাভ হচ্ছে- বিশ্বব্যাপী তার ইমেজ বৃদ্ধি পাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে একটি সাহসী আপসহীন লড়াকু জাতি হিসেবে তারা পুরো বিশ্বের সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছে, যা একটি জাতির পক্ষে সহজে স্বল্পসময়ে অর্জন করা যায় না।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব
[email protected]