সাংবিধানিক পুনর্জাগরণ

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার পরও রাজনৈতিক দলগুলো পরাজয় মেনে নিতে চায়নি। তাই আজকের এই পরিবর্তিত বাংলাদেশে শুধু সাংবিধানিক সংস্কার নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন। সংসদকে এখন এমন একটি যুগোপযোগী ও আধুনিক নির্বাচনকালীন রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে, যা কেবল কোনো নির্দিষ্ট দলের স্বার্থ রক্ষা করবে না; বরং পুরো জাতির আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

সংবিধান স্থবির নয়। এটি একটি বহতা নদীর মতো, যা সময়ের প্রয়োজনে, জনগণের আকাক্সক্ষায় এবং রাষ্ট্রের পরিবর্তিত বাস্তবতার সাথে তাল মেলায়। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে গত দেড় দশক ধরে যে অচলাবস্থা, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের সৃষ্টি হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে তার একটি চূড়ান্ত ও যৌক্তিক পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায়ই বহাল রেখেছেন। এর ফলে সংবিধানে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং গণভোটের অধিকার ফিরে আসার পথ প্রশস্ত হয়েছে। এটি কেবল একটি বিচারবিভাগীয় রায় নয়; বরং এটি একটি জাতির দীর্ঘদিনের অবদমিত গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা এবং জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের যে ডাক উঠেছিল, তার এক অসামান্য আইনি স্বীকৃতি। তবে এই রায় বাস্তবায়ন এবং এর পরবর্তী সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

ঘটনার গভীরে যেতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তখন তার মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখা; কিন্তু ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বাতিল করে দেয়। শুধু তাই নয়, সংবিধানে ৫৪টি মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়, যার মধ্যে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে সংবিধানের একটি বড় অংশকে ‘অপরিবর্তনীয়’ বা সংশোধনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এই একটি মাত্র সংশোধনী বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থাকে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়।

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর যখন রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কারের দাবি ওঠে, তখন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনসহ বিশিষ্ট নাগরিকরা হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানির পর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর বেশ কয়েকটি ধারাকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ও মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে বাতিল ঘোষণা করেন। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সেই রায়ের বিরুদ্ধেই করা আপিলগুলো খারিজ করে দেন। এর অর্থ হলো- হাইকোর্টের দেয়া রায়টিই এখন রাষ্ট্রের চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল, গণভোট বিলুপ্তি এবং সংবিধানের কিছু অংশকে অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করার বিধানগুলো চিরতরে অসাংবিধানিক বলে সাব্যস্ত হলো।

এই যুগান্তকারী রায়ের পর আইনি অঙ্গন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, অ্যাটর্নি জেনারেল অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আমাদের বর্তমান সংসদ যেহেতু অত্যন্ত প্রাণবন্ত, তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই কাঠামোটি পুনরায় নির্ধারণ করার ক্ষমতা তাদের হাতেই রয়েছে।

আইনি লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির উল্লেখ করেছেন, আদালত পঞ্চদশ সংশোধনীর ৫৪টি বিষয়ের মধ্যে কেবল চারটি মৌলিক বিষয়ের (তত্ত্বাবধায়ক, গণভোট, ৭ক/৭খ এবং নিম্ন আদালতের রিট ক্ষমতা) নিষ্পত্তি করেছেন। বাকি প্রায় ৫০টি নীতিগত বিষয়- যার মধ্যে সংবিধানের প্রস্তাবনা, চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, বিভিন্ন ঘোষণাপত্র ইত্যাদি রয়েছে, তা ভবিষ্যৎ সংসদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এটি বিচার বিভাগের একটি অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আদালত বুঝিয়ে দিয়েছেন, সংবিধান কোনো দন্ডবিধি নয়, এটি একটি জীবন্ত দলিল। সব পরিবর্তন আদালতের কাঠগড়ায় হয় না, জনগণের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংসদেও এর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।

সংবিধান বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এই রায়ের পর কিছু কারিগরি ও আইনি জটিলতার কথাও উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, পঞ্চদশ সংশোধনীতে বলা আছে- সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগে নির্বাচন করতে হবে। যদি এই বিধানটি এখনো বহাল থাকে, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময়কাল ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা নিয়ে একটি আইনি জট তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার শপথ গ্রহণ সংক্রান্ত কিছু বিলুপ্ত বিধান কিভাবে পুনরায় কার্যকর হবে, তা সংসদকে সর্বসম্মতিক্রমে পাস করতে হবে।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের ভাষায়- এই রায়ের ফলে ভবিষ্যতে ‘রাতের ভোট’ হওয়ার মতো কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ হয়ে গেল।

আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আইনি পথ খুলে দিয়েছেন ঠিকই; কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর আসল পরীক্ষা, বিশেষ করে বিএনপির জন্য এটি এক নতুন চ্যালেঞ্জ। যদি আগের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী ব্যবস্থাটি ফিরে আসে, তবে নিয়ম অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। তিনি রাজি না হলে তার আগের জন, এভাবে পর্যায়ক্রমে এগোবে; কিন্তু বাস্তবতা হলো- বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি বা অন্য কোনো দলই হুবহু আগের সেই কাঠামোটি আর চায় না।

এখানেই সামনে আসছে ‘জুলাই সনদ’-এর প্রসঙ্গ। জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, একটি ‘সার্চ কমিটি’ বা অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করা হবে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বিরোধী দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব ছিল; কিন্তু মজার বিষয় হলো- সনদের শর্ত অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দল থেকে আসার কথা, যার ফলে সার্চ কমিটিতে বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা (পাঁচজনের মধ্যে তিনজন) নিশ্চিত হয়। বিএনপি এই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। এখন প্রশ্ন হলো- আদালত যেহেতু আইনিভাবে আগের কাঠামোটিকেই পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ করে দিয়েছেন, তখন বিএনপি কি জুলাই সনদের সেই সার্চ কমিটির শর্ত মানবে? নাকি আদালতের দোহাই দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধামতো পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবে? এটি আগামী দিনে রাজনৈতিক দরকষাকষির অন্যতম প্রধান ইস্যু হতে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে তারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের নীতি সংবিধানে পুনর্বহাল করবেন। এখন আদালত যেহেতু ওই বিষয়গুলো বাতিল করেননি, তাই বিএনপি যদি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে তাদের সরকার গঠন করার পর সংবিধানে আরেকটি নতুন সংশোধনী আনতে হবে। খুব সম্ভবত সেটি হবে ‘অষ্টাদশ সংশোধনী’। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হবে, বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর মূল দর্শন কী এবং তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে কতটা প্রস্তুত।

এই রায়ের সবচেয়ে দার্শনিক ও শক্তিশালী দিকটি হলো গণভোট বা ‘রেফারেন্ডাম’ প্রথার প্রত্যাবর্তন। পঞ্চদশ সংশোধনীতে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে বলা হয়েছিল- সংবিধানের অনেকগুলো মৌলিক বিষয় কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। কেউ এর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হবে। এটি ছিল মূলত বর্তমানের রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঘাড়ে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়ার এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রয়াস। হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ এই ‘অপরিবর্তনযোগ্যতার দেয়াল’ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।

গণভোট ফিরে আসার মানে হলো- এখন থেকে সংবিধানের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কোনো অনুচ্ছেদ (যেমন ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ- ‘সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে, সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের মাধ্যমে সংবিধানের যেকোনো অনুচ্ছেদ সংযোজন, পরিবর্তন বা বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করা যাবে, তবে ৭(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো যেমন- রাষ্ট্রের মূলনীতি এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার পরিবর্তন বা বাতিল করা যায় না) পরিবর্তন করতে হলে কেবল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই চলবে না, দেশের সাধারণ মানুষের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে তার অনুমোদন নিতে হবে। এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে বড় আইনি রক্ষাকবচ। কোনো স্বৈরাচারী সরকার চাইলেই আর রাতের অন্ধকারে নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য সংবিধানকে যথেচ্ছভাবে কাটাছেঁড়া করতে পারবে না।

দেড় দশকের আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর দেশের বিচার বিভাগ তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, কেবল আইনের কিতাবে চমৎকার কিছু শব্দ বা অনুচ্ছেদ থাকলেই একটি দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা হয়তো নির্বাচনের দিন একটি সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা দিতে পারে; কিন্তু নির্বাচনের পর সেই গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের ওপর।

আমরা অতীতে দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ার পরও রাজনৈতিক দলগুলো পরাজয় মেনে নিতে চায়নি। তাই আজকের এই পরিবর্তিত বাংলাদেশে শুধু সাংবিধানিক সংস্কার নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন। সংসদকে এখন এমন একটি যুগোপযোগী ও আধুনিক নির্বাচনকালীন রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে, যা কেবল কোনো নির্দিষ্ট দলের স্বার্থ রক্ষা করবে না; বরং পুরো জাতির আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে।

আমরা একটি নতুন, বাসযোগ্য ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি- যেই স্বপ্নের বীজ এই রায়ের মাধ্যমে রোপিত হলো, এখন তাকে সযত্নে মহীরুহে পরিণত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rintuanowar.com