প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই সামনে ভেসে ওঠে অস্ত্র, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জামের ছবি। অথচ একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অস্ত্রে নয়; তার মানুষ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং জাতীয় সক্ষমতার মধ্যেও থাকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ধারিত হয় শুধু সীমান্ত রক্ষার ক্ষমতা দিয়ে নয়; তার দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা, সামাজিক সংহতি এবং সঙ্কট মোকাবেলার সামর্থ্য দিয়েও।
বাংলাদেশ এমন একসময়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যখন এক দিকে দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সঙ্কট, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি এবং আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে; অন্য দিকে দেশের বিপুল যুব জনসংখ্যা রাষ্ট্রের জন্য অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আমরা কি এই যুবশক্তিকে কেবল কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় রেখে দেবো, নাকি তাদেরকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করব?
প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ, সামাজিক সংহতি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জাতীয় প্রস্তুতিই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির ভিত্তি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো আজ আর শুধু সামরিক নয়; আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র, তথ্যযুদ্ধ, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ করিডোরের নিরাপত্তা— সবমিলিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা আরো জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা বাজেটকে শুধু ব্যয় নয়; জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষভাবে দেশের কিছু কৌশলগত যোগাযোগ করিডোর এবং ভূ-অবস্থানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে অধিকতর গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ফেনী ও বগুড়া অঞ্চলের কৌশলগত যোগাযোগ করিডোরগুলো জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। এসব এলাকায় উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা, লজিস্টিক অবকাঠামো এবং সমন্বিত নিরাপত্তা উপস্থিতি শক্তিশালী করা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হওয়া উচিত।
তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি যুবসমাজ। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী আজও পর্যাপ্ত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে জাতীয় সেবা (National Service) কর্মসূচি নিয়ে একটি জাতীয় আলোচনা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য কেবল সামরিক প্রশিক্ষণ নয়; শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, নাগরিক দায়িত্ববোধ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, সাইবার নিরাপত্তা এবং কারিগরি সক্ষমতা উন্নয়ন। যে রাষ্ট্র তার যুবসমাজকে দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধে রূপান্তর করতে পারে, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে শুধু অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একই সাথে তারা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা অর্জন করবে। যুবসমাজকে একটি জাতীয় রিজার্ভ কাঠামোর আওতায় আনা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর পুনঃপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা দুর্যোগ, মানবিক সঙ্কট, অবকাঠামোগত বিপর্যয় কিংবা অন্যান্য জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য জনশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এই কাঠামোর উদ্দেশ্য কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক শক্তি গড়ে তোলা নয়; দেশের যুবশক্তিকে জাতীয় উন্নয়ন, জনসেবা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে সংগঠিত করা। সেই সাথে দায়িত্বশীল, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, আইন মেনে চলার সংস্কৃতি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় স্বার্থে সম্মিলিতভাবে কাজ করার মানসিকতা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি। এর মাধ্যমে সামাজিক সংহতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শক্তিশালী করা সম্ভব। এটি নতুন নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশ্বের বহু দেশ এমন উদাহরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী শিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনের প্রস্তুতি নেয়; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যবর্তী সময়ে দক্ষতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং শৃঙ্খলার ঘাটতি থেকে যায়। বিশ্বের শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং পূর্ব এশিয়ায় দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও প্রযুক্তিগতভাবে প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। জাতীয় সেবা কর্মসূচিকে ভাষাশিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সার্টিফিকেশনের সাথে সংযুক্ত করা গেলে এটি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে। নির্মাণ, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতে আন্তর্জাতিক মানের কর্মী তৈরি হবে। এতে বাংলাদেশের যুবসমাজ পেশাদারিত্ব এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
প্রতিরক্ষা বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন। ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, যোগাযোগপ্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স, জাহাজ নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সহায়ক শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করা সম্ভব। প্রতিরক্ষা ব্যয়ের একটি অংশ সরাসরি দেশীয় প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতায় রূপান্তরিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে। অবশ্যই প্রতিরক্ষা ব্যয়কে উন্নয়নের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা উচিত নয়; উন্নয়ন রক্ষার বীমা হিসেবে দেখা উচিত। কারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি তখনই টেকসই হয়, যখন রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা, উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান এবং শিল্পোন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হতে পারে। প্রতিরক্ষা ব্যয়ের একটি অংশ যদি দেশীয় প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প সক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা উভয়কেই শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশকে যুদ্ধপ্রবণ রাষ্ট্র হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে একটি শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রকেও যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হয়, যাতে কোনো সঙ্কট তার স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বিপন্ন করতে না পারে।
আজকের বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা বাজেটে কত টাকা ব্যয় করা হবে? সেটা নিয়ে প্রশ্ন হওয়া উচিত না; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত— ‘কিভাবে সেই ব্যয়কে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করা হবে?’
প্রতিরক্ষা থেকে রাষ্ট্রশক্তির এই যাত্রাই হতে পারে একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের নতুন কৌশলগত দর্শন। সেই বিবেচনায় প্রতিরক্ষা বাজেট পুনর্মূল্যায়ন সময়ের দাবি।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য। সাবেক সদস্য, প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংসদিয় স্থায়ী কমিটি (১৯৯৬-২০০১)



