উম্মাহর ঐক্য ও পুনর্জাগরণে শায়খ নদভীর আহ্বান

বিশ্বখ্যাত ইসলামিক স্কলার শায়খ ড. আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নদভী হাফি: সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে ঢাকা ও কক্সবাজারে বিভিন্ন উলামা সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্য ছিল গতানুগতিকতার বাইরে ব্যতিক্রমধর্মী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। তার চিন্তাশক্তির ব্যাপকতা আলেমদের চোখ খুলে দিয়েছে। জীবন ও সমাজকে নতুনভাবে চেনার প্রণোদনা রয়েছে তার বক্তব্যে।

তিনি পারস্পরিক ভেদাভেদ ভুলে উম্মাহর অখণ্ড ঐক্যের উপর জোর দিয়েছেন বেশি। শায়খ সাজ্জাদ নদভী মূলত দাওয়াত, তারবিয়াত, আলেমদের দায়িত্ব, উম্মাহর ঐক্য, রাষ্ট্রচিন্তা এবং যুগোপযোগী ইসলামী নেতৃত্বের একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরেন।

উম্মাহর ব্যাপকতা
শায়খ সাজ্জাদ নদভীর মতে, উম্মাহ শুধু আলেমদের সমষ্টি নয়। উম্মাহ হলো এমন একটি সমাজ, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নারী-পুরুষ এবং তরুণ— সবাই ইসলামের বৃহত্তর পরিবারের অংশ। তাই আদর্শ ইসলামী সমাজ গড়তে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরকে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন এসব শক্তি একই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছে, তখনই মুসলিম সভ্যতা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর যখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তখনই শুরু হয়েছে অবক্ষয়।

তিনি বলেন, যদি আলেমদের সম্পর্ক শুধু মাদরাসা বা মসজিদের সীমায় আবদ্ধ থাকে, তবে সমাজের বৃহৎ অংশ নেতৃত্বহীন হয়ে পড়বে। আলেমদের সামাজিক উপস্থিতি যত বিস্তৃত হবে, ইসলামের ইতিবাচক প্রভাবও তত বিস্তৃত হবে। তিনি উলামায়ে কিরামের দায়িত্বকেও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। তার ভাষায়— আলেমদের প্রথম দায়িত্ব ইলম গ্রহণ করা এবং দ্বিতীয় দায়িত্ব সেই ইলমের আলোকে মানুষের তারবিয়াত করা। এই তারবিয়াত কেবল মাদরাসার ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।

মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব
বর্তমান সময়ে মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তিনি সেটিকে মুসলিম সমাজের অন্যতম বড় সঙ্কট হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার মতে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের মন্ত্রী, প্রশাসক, বিচারক, নীতিনির্ধারক, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাদের প্রতি অবজ্ঞা নয়, ভালোবাসা ও দাওয়াতের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ইসলামী সাহিত্য পাঠ, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, সেমিনার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তিনি আধুনিক জ্ঞানকে দ্বীনি শিক্ষার বিকল্প হিসেবে দেখেননি; বরং দাওয়াত ও সমাজসেবার একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। ব্যাংকিং, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আইসিটি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা সমসাময়িক ফিকহের জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আধুনিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা থাকা অপরিহার্য— এই উপলব্ধি তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। শিক্ষাব্যবস্থার মানবিক সংস্কারের আহ্বানও জানান। শিশুদের প্রতি কঠোরতা, শারীরিক প্রহার, ভয়ভিত্তিক শিক্ষা এবং নেতিবাচক পরিবেশের পরিবর্তে ভালোবাসা, উৎসাহ ও সুন্দর চরিত্র গঠনের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। কারণ, একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না; তিনি ভবিষ্যৎ মানুষও গড়ে তোলেন। এটি আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শাসকদের সাথে আলেমদের সম্পর্ক
তিনি বলেন, শাসকদের সাথে আলেমদের সুসম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। রাজনৈতিক তোষামোদ বা ব্যক্তিগত সুবিধা প্রাপ্তির স্বার্থে নয়; বরং নববী পদ্ধতিতে শাসকদের কল্যাণ কামনা ও নসিহতের কথা বলেছেন। এতে সঙ্ঘাতের পরিবর্তে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। দাওয়াতের ভিত্তি— আশা, কর্ম, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা। আমলা, সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক, বিচারক— এই শ্রেণীর মানুষ সমাজের গতিপথ নির্ধারণ করেন। তাই তাদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য পৌঁছে দেয়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখিয়েছেন।

কুরআনকেন্দ্রিক সামাজিক আন্দোলন
শায়খ সাজ্জাদ নদভী মসজিদকে কার্যকর দ্বীনি ও সামাজিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। জুমার বয়ান এবং নিয়মিত সংক্ষিপ্ত দারসুল কুরআনের আসর চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও যুবকদের আল্লাহর কালামের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি, পর্দার সুব্যবস্থা রেখে নারীদের এবং কলেজ-ভার্সটিপড়ুয়া মেয়েদের এই দারসগুলোতে সম্পৃক্ত করার দূরদর্শী চিন্তা প্রকাশ করেন।

যুবসমাজকে আকৃষ্ট করার জন্য তিনি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে আধুনিক ও সৃজনশীল পদ্ধতির প্রস্তাব করেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় প্রবন্ধ লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং আকর্ষণীয় পুরস্কারের ঘোষণা তরুণ প্রজন্মের সুপ্ত মেধা ও মননকে ইসলামের সোনালি ইতিহাসের দিকে ধাবিত করার এক চমৎকার কৌশল। প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে সিরাতভিত্তিক বই উপহার দেয়া এবং তা পাঠের সুযোগ করে দেয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে যুবকরা নবীর জীবনযাপনের সরলতা, মমতা, কোমলতার কথা জানতে পারবে। শায়খ নদভী আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার জন্য আলেমসমাজকে তাদের পুরনো ও গতানুগতিক কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান।

ভিন্নমতে সহনশীলতা
তার মতে, মুসলিম সমাজে বিভিন্ন মাসলাক ও তরিকার মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু তা শত্রুতায় রূপ নেয়া উচিত নয়। উম্মাহর প্রতিটি ধারার ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কেউ রাসূলুল্লাহর ভালোবাসায়, কেউ তাওহিদের চর্চায়, কেউ দাওয়াতে, কেউ তালিমে, কেউ জিহাদের চেতনায়, কেউ ইকামাতে দ্বীনের প্রচেষ্টায় অগ্রগামী— এসব শক্তিকে প্রতিযোগিতায় নয়, সমন্বয়ে রূপ দিতে হবে। বিভিন্ন মাসলাক ও জামায়াতের মধ্যে কল্যাণের উপাদান রয়েছে। ভালোকে গ্রহণ করতে হবে, অপ্রয়োজনীয় বিরোধ নয়। এটি উম্মাহর ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতি।

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য
শায়খ নদভী যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন, তা হলো— উম্মাহকে একটি ‘কার্বন কপি’তে পরিণত করার চেষ্টা নয়; বরং ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য গড়ে তোলা। তিনি বলেন, উম্মাহ কখনো একটি মাত্র ধারা বা একটি মাত্র সংগঠন দিয়ে গঠিত হতে পারে না। ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন মাজহাব, চিন্তাধারা ও কর্মক্ষেত্র পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আমাদের সামনে যেমন ঐক্যের সুযোগ রয়েছে, তেমনি বিভক্তির ঝুঁকিও রয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, যুগোপযোগী শিক্ষা, প্রজ্ঞাভিত্তিক নেতৃত্ব এবং সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। তার মতে, শুধু ধার্মিক হওয়া যথেষ্ট নয়; অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী মানুষের সাহচর্যও প্রয়োজন। নেতৃত্ব বিকাশে এটি একটি মৌলিক নীতি।

ইতিবাচক সুযোগের সদ্ব্যবহার
শায়খ সাজ্জাদ নদভী এমন একটি রাজনৈতিক বা শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর কথা বলেছেন, যা সরাসরি নিজেদের ইসলামী বা খেলাফত দাবি না করলেও ইসলাম চর্চা এবং দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখছে। তাত্ত্বিক বা আদর্শগত মতপার্থক্য থাকার পরও বিদ্যমান সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে বহুমুখী খেদমত চালিয়ে যাওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বক্তব্যটির মূল বার্তা হলো— বর্তমান কাঠামোর ভেতরে থেকেই শিক্ষা, দাওয়াত, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনের পথে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব
তিনি তার বক্তব্যে আলেমসমাজের আত্মশুদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। বাহ্যিক ইলম অর্জনের পাশাপাশি মনের ভেতরের রোগ— বিশেষ করে অহঙ্কার, পরচর্চা এবং হিংসার মতো মারাত্মক ব্যাধিগুলো কিভাবে একজন মানুষের সমস্ত ভালো আমল ও অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন তিনি। উম্মতের কোনো আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে যদি ইলম থাকার পরও দম্ভ তৈরি হয়, তবে তা উম্মতের ক্ষতির কারণ হয।

ইখলাসের সাথে দ্বীনের খেদমত করার মাধ্যমেই কেবল উম্মতকে সঠিক পথে পরিচালনা করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে তিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানির দাওয়াতি কর্মপদ্ধতির উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি দেখান, কিভাবে একজন মুজাদ্দিদ ধৈর্য, প্রজ্ঞা, চিঠিপত্র, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বিশেষত সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের চিন্তাধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

উম্মাহর পুনর্জাগরণ
শায়খ সাজ্জাদ নদভীর এই সফরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই— উম্মাহর পুনর্জাগরণ কেবল আবেগ বা স্লোগানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন গভীর ইলম, বিশুদ্ধ আখলাক, সুদূরপ্রসারী প্রজ্ঞা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আধুনিক বাস্তবতার সঠিক উপলব্ধি এবং সর্বোপরি উম্মাহর প্রতিটি শ্রেণীর মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা। আবেগ বা তাড়াহুড়া করে সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থার মতো জটিল কাঠামোগত রূপান্তর সাধন সম্ভব নয়। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, আত্মগঠন, জনশক্তি তৈরি, উপযুক্ত পরিবেশ এবং ধৈর্যশীল প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে।

শেষকথা
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তার এই বার্তাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করা গেলে আলেমসমাজ, মাদরাসা শিক্ষা, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। উম্মাহর পুনর্জাগরণের পথ বিভক্তির নয়, সমন্বয়ের; ঘৃণার নয়, মমতার; সঙ্কীর্ণতার নয়, প্রজ্ঞার। শায়খ সাজ্জাদ নদভীর বাংলাদেশ সফরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই— একটি ঐক্যবদ্ধ, জ্ঞানসমৃদ্ধ, চরিত্রবান এবং দূরদর্শী মুসলিম সমাজই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সেই প্রস্তুতি আজই শুরু করতে হবে।

লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

[email protected]