অধ্যাদেশ প্রণয়ন ক্ষমতা

বাংলাদেশ অভ্যুদয় পরবর্তী পাঁচবার দেশটি অসাংবিধানিক শাসনে পরিচালিত হয়। প্রথম অসাংবিধানিক শাসনকাল ছিল ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর।

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম ভাগের তৃতীয় পরিচ্ছেদ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ক্ষমতাবিষয়ক। পরিচ্ছেদটি ৯৩ নং অনুচ্ছেদ সমন্বয়ে গঠিত। সংবিধান প্রণয়নকালে অনুচ্ছেদটি সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়। একই সাথে সংবিধানের পঞ্চম ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদটির প্রথম দফায় বর্ণিত ‘সংসদের অধিবেশন কাল ব্যতীত’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় অথবা এর অধিবেশন কাল ব্যতীত’ শব্দগুলো দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকলেও সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত সীমাবদ্ধতায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারিবিষয়ক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না। প্রণিধানযোগ্য যে, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ আছে, এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করবেন।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ চারটি দফা সমন্বয়ে গঠিত। অনুচ্ছেদটির দফা (১) এ বলা হয়েছে, সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় বা এর অধিবেশন কাল ব্যতীত কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আশু ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান আছে বলে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে তিনি ওই পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলে মনে করবেন, সেরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করতে পারবেন। সেই সাথে জারি হওয়ার সময় থেকে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হবে; দফাটির সাথে শর্তাংশজুড়ে তিনটি বিধিনিষেধ আরোপ করে বলা হয়েছে যে, এ দফার অধীন কোনো অধ্যাদেশে এমন কোনো বিধান করা হবে না, ক. যা এ সংবিধানের অধীন সংসদের আইন দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না; খ. যাতে এ সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হয়ে যায়; অথবা গ. যার দ্বারা আগে প্রণীত কোনো অধ্যাদেশের যেকোনো বিধানকে অব্যাহতভাবে বলবৎ করা যায়।

অনুচ্ছেদটির দফা (২)-এ বলা হয়েছে— এ অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত কোনো অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তা উপস্থাপিত হবে এবং ইতোপূর্বে বাতিল না হয়ে থাকলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ৩০ দিন অতিবাহিত হলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে তা অনুমোদন করে সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হলে অধ্যাদেশটির কার্যকরতা লোপ পাবে।

অনুচ্ছেদটির দফা (৩)-এ বলা হয়েছে— সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান আছে বলে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে, তিনি এমন অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করতে পারবেন; যাতে সংবিধান দ্বারা সংযুক্ত তহবিলের ওপর কোনো ব্যয় দায়যুক্ত হোক বা না হোক, ওই তহবিল থেকে সেরূপ ব্যয় নির্বাহের কর্তৃত্ব প্রদান করা যাবে। অনুরূপভাবে প্রণীত কোনো অধ্যাদেশ জারি হওয়ার সময় হতে তা সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হবে।

অনুচ্ছেদটির চতুর্থ দফা অর্থাৎ শেষ দফায় বলা হয়েছে— এ অনুচ্ছেদের তিন দফার অধীন জারি করা প্রত্যেক অধ্যাদেশ যথাশীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হবে। সংসদ পুনর্গঠিত হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে এ সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদগুলোর বিধানাবলি প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হবে।

এখন দেখার বিষয় অনুচ্ছেদ ৮৭, ৮৯ ও ৯০ কী বলে। অনুচ্ছেদ ৮৭ বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিবিষয়ক। অনুচ্ছেদটি দুটি দফা সমন্বয়ে গঠিত। এর প্রথম দফায় বলা হয়েছে— প্রত্যেক অর্থবছর সম্পর্কে ওই বছরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয় সংবলিত একটি বিবৃতি সংসদে উপস্থাপিত হবে। অনুচ্ছেদটির দফা (২)-এ বলা হয়েছে— বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিতে পৃথক পৃথকভাবে ক. এ সংবিধানের দ্বারা বা অধীন সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়রূপে বর্ণিত ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এবং খ. সংযুক্ত তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে, এরূপ প্রস্তাবিত অন্যান্য ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদর্শিত হবে এবং অন্যান্য ব্যয় থেকে রাজস্ব খাতের ব্যয় পৃথক করে প্রদর্শিত হবে।

অনুচ্ছেদ ৮৯ বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি সম্পর্কিত পদ্ধতিবিষয়ক। অনুচ্ছেদটি তিনটি দফা সমন্বয়ে গঠিত। এর প্রথম দফায় বলা হয়েছে— সংযুক্ত তহবিলের দায়যুক্ত ব্যয় সম্পর্কিত আর্থিক বিবৃতির অংশ সংসদে আলোচনা করা হবে; কিন্তু তা ভোটের আওতাভুক্ত হবে না। অনুচ্ছেদটির দফা (২)-এ বলা হয়েছে— অন্যান্য ব্যয় সম্পর্কিত বার্ষিক আর্থিক বিবৃতির অংশ মঞ্জুরি দাবির আকারে সংসদে উপস্থাপিত হবে এবং কোনো মঞ্জুরি দাবিতে সম্মতিদানের বা সম্মতিদানে অস্বীকৃতির কিংবা মঞ্জুরি দাবিতে নির্ধারিত অর্থ হ্রাস সাপেক্ষে তাতে সম্মতিদানের ক্ষমতা সংসদের থাকবে। অনুচ্ছেদটির দফা (৩)-এ বলা হয়েছে— রাষ্ট্রপতির সুপারিশ ব্যতীত কোনো মঞ্জুরি দাবি করা যাবে না।

অনুচ্ছেদ ৯০ নির্দিষ্টকরণ আইনবিষয়ক। এটিও আগের অনুচ্ছেদের ন্যায় তিনটি দফা সমন্বয়ে গঠিত। এর প্রথম দফায় বলা হয়েছে— সংসদ কর্তৃক এ সংবিধানের ৮৯ অনুচ্ছেদের অধীন মঞ্জুরিদানের পর সংযুক্ত তহবিল থেকে নিম্নলিখিত ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় সব অর্থ নির্দিষ্টকরণের বিধান সংবলিত একটি বিল যথাশীঘ্র সংসদে উত্থাপন করা হবে : ক. সংসদ কর্তৃক প্রদত্ত অনুরূপ মঞ্জুরি; এবং খ. সংসদে উপস্থাপিত বিবৃতিতে প্রদর্শিত অর্থের অনধিক সংযুক্ত তহবিলের দায়যুক্ত ব্যয়। অনুচ্ছেদটির দফা (২)-এ বলা হয়েছে— অনুরূপ কোনো বিল সম্পর্কে সংসদে এমন কোনো সংশোধনী প্রস্তাব করা হবে না, যার ফলে অনুরূপভাবে প্রদত্ত কোনো মঞ্জুরির পরিমাণ বা উদ্দেশ্য কিংবা সংযুক্ত তহবিলের উপর দায়যুক্ত ব্যয়ের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। অনুচ্ছেদটির দফা (৩)-এ বলা হয়েছে— এ সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে সংযুক্ত তহবিল থেকে এ অনুচ্ছেদের বিধানাবলি অনুযায়ী গৃহীত আইনের দ্বারা নির্দিষ্টকরণ ব্যতীত কোনো অর্থ প্রত্যাহার করা হবে না। অনুচ্ছেদ ৯৩ দফা (৪)-এর বিধানাবলি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়— অনুচ্ছেদটির দফা (৩)-এর অধীন জারিকৃত প্রত্যেক অধ্যাদেশ অনতিবিলম্বে সংসদে উপস্থাপিত হবে। একই সাথে সংসদ পুনর্গঠিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এ সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদগুলোর বিধানাবলি প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্যসাধন বা সংশোধনসহ পালিত হবে।

অনুচ্ছেদ ৯৩-এর বিধানাবলি পর্যালোচনায় দেখা দেখা যায়, অধ্যাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমত, অস্থায়ী বিধান হিসেবে অধ্যাদেশ একটি অস্থায়ী আইনরূপে কার্যকর হয়। এ ছাড়া এটি তখনই জারি হয় যখন সংসদ বা আইনসভা সচল থাকে না। দ্বিতীয়ত, সংসদীয় অনুমোদনের জন্য সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে অধ্যাদেশ উপস্থাপন করতে হয় এবং অনুমোদিত হলে এটি স্থায়ী আইনে পরিণত হয়। আর সংসদ যদি এটিকে অনুমোদন না করে, তবে অধ্যাদেশ কার্যকর থাকে না এবং তা বাতিল হয়ে যায়। তৃতীয়ত, অধ্যাদেশ প্রণয়ন বা জারি করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকলেও এটি সরকারের প্রধান নির্বাহীর পরামর্শানুযায়ী রাষ্ট্রপতি সম্পন্ন করে থাকেন। চতুর্থত, জরুরি পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ জারি করা হয় যখন সংসদ জরুরি ভিত্তিতে বসার মতো অবস্থায় থাকে না এবং একটি বিশেষ আইন অবিলম্বে প্রণয়ন করা প্রয়োজন হিসেবে দেখা দেয়। পঞ্চমত, একটি সীমাবদ্ধ সময়কাল পর্যন্ত অধ্যাদেশ কার্যকর থাকে। অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর সংসদ বসার ৩০ দিন পর্যন্ত এটি কার্যকর থাকে। এরপর সংসদে আলোচিত ও অনুমোদিত হলে এটি স্থায়ী আইন হিসেবে গৃহীত হয়, অন্যথায় বাতিল হয়।

বাংলাদেশ অভ্যুদয় পরবর্তী পাঁচবার দেশটি অসাংবিধানিক শাসনে পরিচালিত হয়। প্রথম অসাংবিধানিক শাসনকাল ছিল ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর। দ্বিতীয় অসাংবিধানিক শাসনকাল ছিল এইচ এম এরশাদ কর্তৃক ২৪ মার্চ ১৯৮২ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর। তৃতীয় অসাংবিধানিক শাসনকাল ছিল ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর। চতুর্থ অসাংবিধানিক শাসনকাল ছিল ১১ জানুয়ারি ২০০৭ ফখরুদ্দীন-মইন ইউ আহমেদ কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর এবং সর্বশেষ পঞ্চম অসাংবিধানিক শাসনকাল ছিল ৮ আগস্ট ২০২৪ ড. ইউনূস রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর। এসব অসাংবিধানিক শাসনকালে বিপুলসংখ্যক অধ্যাদেশ জারি করে সরকার পরিচালনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারের আগমনে সংসদ কর্তৃক কিছু অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয়। কিছু বাতিল হয়।

দেশে প্রথম ও দ্বিতীয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার যথাক্রমে ৩০ মার্চ ১৯৯৬ ও ১৫ জুলাই ২০০১ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর বেশ কিছু অধ্যাদেশ জারি করে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারের আগমন হলে এর কিছু আইনে পরিণত হয়। অবশিষ্ট কিছু বাতিল হয়।

রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় আইন অপরিহার্য। এ বাস্তবতা থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংসদ বহাল না-থাকা অবস্থায় সংবিধান স্বীকৃত পন্থায় রাষ্ট্রপতি বা রাজা অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩-এ রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দেয়া আছে।

পাকিস্তানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮৯-তে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর অর্পিত। শ্রীলঙ্কার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫৫ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করে থাকেন। নেপালের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৪-তে রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দেয়া আছে। ভুটানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ এবং মালদ্বীপের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৫-এর বিধান মতে, যথাক্রমে রাজা ও রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করে থাকেন।

যেকোনো অধ্যাদেশের কার্যকারিতা জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সাধারণ আইনের মতো শক্তিশালী; তবে জারি করা অধ্যাদেশটি পরবর্তী সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করতে হয়। সংসদ চাইলে এটি অনুমোদন বা বাতিল করতে পারে।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]