একটি দেশের বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার খতিয়ান নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক দর্শন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় উন্নয়নের সামষ্টিক রূপরেখা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। বিগত ৫৩ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রগতির হাত ধরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় এক হাজার ১৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে; কিন্তু এ সংখ্যাগত উল্লম্ফন কি দেশের প্রকৃত বাস্তবায়ন সক্ষমতার প্রতিফলন ঘটায়? উত্তরটি নিরাশাজনক।
পরিসংখ্যান বলছে- বাজেটের আকার প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বাড়লেও তা বাস্তবায়নের হার ক্রমাগত নিম্নমুখী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরের পর দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এমনকি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এই দীর্ঘস্থায়ী অসামঞ্জস্য প্রমাণ করে, আমাদের বাজেট ব্যবস্থাপনায় গভীর কাঠামোগত ও পরিচালনাগত সঙ্কট বিদ্যমান। এ কলামে বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অন্তরায় এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে বিশ্লেষণ করা হলো।
সঙ্কটের সারসংক্ষেপ : শূন্য অগ্রগতির গোলকধাঁধা
বাস্তবায়ন সঙ্কটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বহিঃপ্রকাশ ঘটে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এডিপি কাটছাঁটের মাধ্যমে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি বরাদ্দ দুই লাখ ২৬ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা করা হলেও প্রকৃত ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ছিল একেবারে শূন্য! অথচ এ প্রকল্পগুলোতে আট হাজার ৩৮৩.৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর চেয়েও পরিতাপের বিষয় হলো, বহু প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ না হলেও শুধু কর্মকর্তাদের বেতনভাতা এবং অফিসিয়াল খরচে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ১১টি প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল ২৫ শতাংশের নিচে। এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থায়নে একধরনের পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা জেঁকে বসেছে।
কাঠামোগত বনাম পরিচালনাগত প্রতিবন্ধকতা
বাজেট বাস্তবায়নের অন্তরায়গুলো প্রধানত দু’টি ভাগে ভাগ করা যায় : কাঠামোগত ও পরিচালনাগত।
কাঠামোগত অন্তরায় (দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক) : অবাস্তব ও অতি-উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, চরম নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত (৬.৫৬ শতাংশ), ক্রমবর্ধমান ঋণ ও সুদের চাপ, নীতিনির্ধারণের অতি-কেন্দ্রীকরণ এবং দক্ষ জনবলের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি।
পরিচালনাগত অন্তরায় (দৈনন্দিন প্রশাসনিক) : আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অর্থছাড়ে বিলম্ব, জুন স্পেন্ডিং সিনড্রোম, জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর জটিলতা, ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং দুর্বল তদারকি ও জবাবদিহির অভাব।
এই দুই ধরনের সমস্যা একটি আরেকটির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কাঠামোগত দুর্বলতা যেখানে বাজেটের ভিত্তি দুর্বল করে, পরিচালনাগত জটিলতা সেখানে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের গতি স্তব্ধ করে দেয়।
অবাস্তব বাজেট লক্ষ্যমাত্রা ও রাজস্ব ঘাটতির ফাঁদ
বাজেট ব্যর্থতার মূল সূত্রপাত হয় এর প্রণয়ন প্রক্রিয়া থেকে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতা, করের আওতা এবং এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাকে বিবেচনায় না নিয়ে প্রতি বছর একটি অতি-উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি এই প্রবণতাকে পরিচালনাগতভাবে অবাস্তব বলে আখ্যায়িত করেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৯ শতাংশ), যার মধ্যে এনবিআরের অংশ চার লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা; কিন্তু অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাকি দুই মাসে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ১২৮.৬ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা অলৌকিক কিছু ছাড়া অসম্ভব।
বিশাল এই রাজস্ব ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে কর-জিডিপি অনুপাতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত নেমে আসে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-ওইসিডির ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩৭টি দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। যেখানে এ অঞ্চলের গড় অনুপাত ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে ভারতের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে থাকা পাকিস্তানেরও ১২ শতাংশের ওপরে। এনবিআরের বর্তমান চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান নিজেই একটি সেমিনারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘পাকিস্তানের ডেপুটি পিএম যেখানে গর্ব করে বলেন- তাদের কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশের বেশি, সেখানে আমাদের অনুপাত ৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যাওয়া অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।’
এডিপি কাটছাঁটের নিষ্ঠুর কোপ এবং সামাজিক খাতের বলিদান
যখন রাজস্ব আদায়ে ধস নামে, তখন সরকারের সামনে দু’টি পথ খোলা থাকে- হয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া, না হয় উন্নয়ন বাজেট কমিয়ে ফেলা। বাংলাদেশ সরকার সাধারণত দু’টি পথ একসাথে বেছে নেয়। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক খাতগুলো। এ ধারা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সামগ্রিক এডিপি ১৮.৪৯ শতাংশ কমিয়ে দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে দুই লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা করে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ এক ধাক্কায় ৭৩ শতাংশ কমিয়ে ১১ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা থেকে পাঁচ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। একটি উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে এমন গণহারে বাজেট কর্তন দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নকে পঙ্গু করে দেয়।

প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সঙ্কট ও অতি-কেন্দ্রীকরণ
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির অন্যতম কারণ দক্ষ প্রকল্প পরিচালক (পিডি), প্রকৌশলী এবং আর্থিক ব্যবস্থাপকের তীব্র অভাব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন প্রভাবশালী আমলা বা সরকারি কর্মকর্তাকে একসাথে তিন থেকে চারটি মেগা প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে কোনো প্রকল্পে তিনি পূর্ণ সময় বা মনোযোগ দিতে পারেন না। এর সাথে যোগ হয় নীতিনির্ধারণের অতি-কেন্দ্রীকরণ। জেলা বা মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যদি নকশায় সামান্য পরিবর্তন বা ইউটিলিটি স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়, তবে সেই ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তের জন্যও ফাইল ঢাকায় মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পাঠাতে হয়। এ আমলাতান্ত্রিক গ্যাঁড়াকলে একটি ফাইলের অনুমোদন আসতে তিন থেকে ছয় মাস সময় নষ্ট হয়। ২০০৫ সালে মিড-টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক (এমটিবিএফ) প্রবর্তন করা হলেও দক্ষ জনবলের অভাব, সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থায় এর পূর্ণ সুফল আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ঋণের দুষ্টচক্র ও ‘ক্রাউডিং-আউট’ প্রভাব
বাজেট ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ এখন জাতীয় বাজেটের জন্য এক বিশাল বোঝা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের সামগ্রিক শিক্ষা খাতের মোট বরাদ্দকে (৯৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা) বহু পেছনে ফেলে দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৬২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি।
সরকার যখন বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে দেদার ঋণ নেয়, তখন বাজারে ‘ক্রাউডিং-আউট’ প্রভাব তৈরি হয়। অর্থাৎ- ব্যাংকের বেশির ভাগ তহবিল সরকার নিজে তুলে নেয়ায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ নেয়, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ। আবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকার ব্যাংক থেকে ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬১৯ শতাংশ বেশি! পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট-পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর যথার্থই সতর্ক করেছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হবে।
পরিচালনাগত ব্যাধি : আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও ‘জুন সিনড্রোম’
বাংলাদেশের এডিপি বাস্তবায়নের একটি পরিচিত এবং হাস্যকর রোগ ‘জুন সিনড্রোম’ বা ‘জুন মাসের তাড়াহুড়ো’। অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস মন্ত্রণালয়গুলো অলস সময় পার করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ছিল ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু মে ও জুন মাস আসতেই অর্থছাড় এবং ব্যয়ের ধুম পড়ে যায়। বাকি ৫৯ শতাংশ বরাদ্দ মাত্র দুই মাসে খরচ করতে তড়িঘড়ি করে দরপত্র আহ্বান ও বিল পাস করা হয়।
ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফাইন্যান্সের নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শেষ মুহূর্তে প্রকল্প পরিচালকদের অনুপস্থিতিতে বিগত অর্থবছরগুলোতে এ সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়েছে। জুন মাসে তড়িঘড়ি করে বর্ষাকালের মধ্যে যে সড়ক বা ড্রেনেজ নির্মাণ করা হয়, তা কয়েক মাসের মধ্যে ভেঙে যায়। ফলে জনগণের ট্যাক্সের টাকার চরম অপচয় ঘটে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩১১টি প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও আইএমইডির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাত্র ১৫৪টির ভৌত কাজ শতভাগ শেষ হয়েছিল। বাকিগুলো অসম্পূর্ণ রেখে কাগজে-কলমে ‘সমাপ্ত’ দেখিয়ে দেয়া হয়েছে।
মেগা প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি : ঢাকা-আশুলিয়া ও রূপপুরের ব্যবচ্ছেদ
পরিকল্পনা স্তরের দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং অবাস্তব ব্যয় প্রাক্কলনে বাংলাদেশের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ মেগা প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। ফলে প্রকল্পগুলোর ব্যয় জ্যামিতিক হারে বাড়ে।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : ২০১৭ সালে যখন প্রকল্পটি পাস হয়, তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। সমাপ্তির মেয়াদ ছিল জুন ২০২২; কিন্তু নকশা পরিবর্তন, অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে (৮৬ টাকা থেকে ১২২ টাকা) বর্তমানে এর ব্যয় ৫৫ শতাংশ বেড়ে ২৭ হাজার ২৩৩ কোটি টাকায় ঠেকেছে। মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে জুন ২০২৮ পর্যন্ত।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প : ২০১৬ সালে এই মেগা প্রকল্পের মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা। টাকার অবমূল্যায়নে রাশিয়ান ঋণের সমতুল্য মূল্য বেড়ে বর্তমান ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা (২৩ শতাংশ বৃদ্ধি)। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রথম ইউনিটের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে পিছিয়েছে। এই বিলম্বে প্রতিদিন ১০-১২ কোটি টাকা অতিরিক্ত সুদ গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে, যার ফলে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট-প্রতি খরচ ছয় টাকা থেকে বেড়ে ১০ টাকায় পৌঁছাবে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর : ২০২০ সালের ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর নতুন মেয়াদ ২০২৯। অথচ এখন পর্যন্ত এর ভৌত অগ্রগতি প্রায় শূন্য!
ইউটিলিটি ও জমি অধিগ্রহণের ত্রিমুখী বিরোধ
প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় আইনি জটিলতা এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট) মধ্যে সমন্বয়হীনতা বাস্তবায়নকে দীর্ঘসূত্রতায় ঠেলে দেয়। ঢাকা এলিভেটেডের এক্সপ্রেসওয়ে (এয়ারপোর্ট-কুতুবখালী) চুক্তি হয়েছিল ২০১১ সালে। দীর্ঘ ১৬ বছর পরও এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে চীনা এক্সিম ব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়ায় মালিবাগ-কুতুবখালী অংশের কাজ গতিহীন হয়ে পড়েছে।
একইভাবে ঢাকা মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬)-এর মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার বর্ধিত অংশের কাজ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা ২০২৮ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে। কারণ মাটির নিচের ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর নিয়ে জটিলতা এবং সরকারি প্রাক্কলন (২৭৪ কোটি টাকা) বনাম ঠিকাদারের দাবির (৬৪০ কোটি টাকা) মধ্যে বিশাল ফারাক। এই চার বছরের বিলম্বে ডিএমটিসিএলের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হবে কমপক্ষে ১২৬ কোটি টাকা।
দুর্নীতি ও জবাবদিহির সঙ্কট
দুর্বল অভ্যন্তরীণ অডিট এবং জবাবদিহির অভাবে প্রকল্পগুলোতে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। ২০১২ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে। যদিও পরে কানাডার এবং দেশীয় আদালত এ অভিযোগ খারিজ করে দেয়; কিন্তু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান আবদুল মোমেন মামলাটি ফের চালু করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুর কনসালট্যান্ট নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা পূর্ববর্তী কমিশন রাজনৈতিক চাপে চেপে গিয়েছিল। এ ধরনের দৃষ্টান্ত আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে।
আন্তর্জাতিক সফল মডেল থেকে শিক্ষা
বাজেট বাস্তবায়নে বাংলাদেশ যখন হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন বিশ্বের অনেক দেশ আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। আমাদের সামনে প্রধানত তিনটি মডেল রয়েছে :
১. দক্ষিণ কোরিয়ার পারফরম্যান্স-বেসড বাজেটিং (পিবিবি) : নব্বইয়ের দশকে আর্থিক সঙ্কটের পর দক্ষিণ কোরিয়া এ মডেল প্রবর্তন করে। তারা প্রতিটি সরকারি কর্মসূচিতে সুনির্দিষ্ট কেপিআই বা মুখ্য সাফল্যসূচক নির্ধারণ করে দেয়। কোনো মন্ত্রণালয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে পরবর্তী বাজেটে ওই কর্মসূচির বরাদ্দ ১০ শতাংশ কেটে নেয়া আইনিভাবে বাধ্যতামূলক। এর ফলে দেশটিতে অদক্ষ ব্যয় ২৮ শতাংশ কমেছে।
২. রুয়ান্ডায় ‘ইমিহিগো’ মডেল : এটি একটি ঐতিহ্যবাহী পারফরম্যান্স চুক্তিব্যবস্থা। জেলাপর্যায়ের মেয়ররা প্রতি বছর সরাসরি রাষ্ট্রপতির সামনে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রার চুক্তি স্বাক্ষর করেন। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো এর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করে। সেই সাথে ব্যর্থতার জন্য প্রকাশ্যে জবাবদিহি করতে হয়। এর ফলে রুয়ান্ডায় জাতীয় বাজেটের ২৫ শতাংশের বেশি বিকেন্দ্রীকৃত উপায়ে স্থানীয় সরকার সফলভাবে বাস্তবায়ন করছে।
৩. ভিয়েতনামের ডিজিটাল মনিটরিং : বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ভিয়েতনাম পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্টগুলোতে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ট্র্যাকিং-ব্যবস্থা চালু করেছে, ফলে প্রকল্প ঝুলে থাকার হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
উত্তরণের পথ : সময়ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব
বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নের এ মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। সংস্কারের এ প্রস্তাবগুলো তিনটি সময়সীমায় ভাগ করা যেতে পারে :
ক. তাৎক্ষণিক সংস্কার (শূন্য থেকে এক বছর) :
কেপিআই নির্ধারণ : দক্ষিণ কোরিয়ার মডেলে প্রতিটি প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) জন্য বার্ষিক পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর বা কেপিআই নির্ধারণ করতে হবে।
ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড : আইএমইডির সব ডাটা নিয়ে একটি পাবলিক ‘রিয়েল-টাইম এডিপি ড্যাশবোর্ড’ তৈরি করতে হবে, যাতে জনগণ ও গণমাধ্যম প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি দেখতে পারে।
এক কর্মকর্তা, দুই প্রকল্প : একজন কর্মকর্তাকে কোনোভাবে দু’টির বেশি প্রকল্পের পিডি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া যাবে না।
খ. মধ্যমেয়াদি সংস্কার (এক থেকে তিন বছর) :
এনবিআর ডিজিটালাইজেশন : করের পরিধি বাড়াতে এবং হয়রানি কমাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পিএফএম কর্মসূচির আদলে এনবিআরকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে হবে।
আন্তঃসংস্থা সমন্বয় : ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জটিলতা কাটাতে ক্যাবিনেট সেক্রেটারির অধীনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ‘স্থায়ী আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটি’ গঠন করতে হবে।
এমটিবিএফের আধুনিকায়ন : আইএমএফের কারিগরি সহায়তায় মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোকে অর্থপূর্ণ করতে হবে।
গ. দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার (তিন থেকে পাঁচ বছর) :
সংসদীয় বাজেট অফিস (পিবিও) : কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো বাংলাদেশেও একটি স্বাধীন ‘সংসদীয় বাজেট অফিস’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা বাজেট পাসের আগে এর বাস্তবায়নযোগ্যতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করবে।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ : রুয়ান্ডার ইমিহিগো অনুসরণ করে জেলাপর্যায়ে বাজেট বাস্তবায়ন ও ক্ষুদ্র প্রকল্প সংশোধনের স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
বাজেট কর্তনের আইন : পারফরম্যান্স-বেসড বাজেটিং আইন পাস করতে হবে, যাতে অকার্যকর বা শূন্য অগ্রগতির প্রকল্পে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজেট বরাদ্দ বাতিলের বিধান থাকে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে যদি মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে হয়, তবে ‘বড় বাজেটের চটকদার রাজনৈতিক প্রচার’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাজেটের আকার কত বড়, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন ক্ষমতা কতটুকু। ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পের ফানুস ওড়ানো সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য চরম বিপজ্জনক। ঋণের সুদের বোঝা যেভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতকে গিলে খাচ্ছে, তা এখনই থামাতে হবে। আন্তর্জাতিক সফল মডেলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাঠামোগত এই অচলাবস্থা ভাঙা এখন সময়ের দাবি।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



