মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম ও মো: সৈকত হোসেন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা। তিনি মালয়েশিয়া সফর শেষে ২৩ জুন চীন যাচ্ছেন। ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য তিন দিনের এই সফর নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এই সফর দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে।
প্রধানমন্ত্রীর এটি দ্বিতীয় বিদেশ সফর। প্রথম সফর মালয়েশিয়ায়, আর দ্বিতীয় গন্তব্য চীন। এই নির্বাচন ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের নতুন সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতাকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায়। এমন সময়ে এই সফর হচ্ছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশ সফরের সাফল্য এখন আর কেবল যৌথ বিবৃতি বা সমঝোতাস্মারকের সংখ্যায় পরিমাপ করা হয় না; বরং তা মূল্যায়িত হয় কতটা বিনিয়োগ এলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত প্রযুক্তি স্থানান্তরিত হলো এবং দেশের অর্থনীতিতে তার বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ল- এসব সূচকের ভিত্তিতে। সে দিক থেকে এই সফর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি পুরনো। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গত এক দশকে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, বৃহত্তম আমদানির উৎস এবং প্রধান উন্নয়ন সহযোগী।

এ সফরের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার দিক থেকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর সময় চীনের সাথে সম্পর্ক বরাবরই ইতিবাচক ও ঘনিষ্ঠ ছিল। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তি দেয়। পরে ১৯৯১ ও ২০০২ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চীন সফর সেই সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করে। ফলে তারেক রহমানের এই সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ধারাবাহিক অধ্যায়, যা বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা পাচ্ছে।
তবে আজকের বাংলাদেশ নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশ নয়। বর্তমান সময়ের বাস্তবতা অতীতের তুলনায় অনেক ভিন্ন। বাংলাদেশ এখন এমন এক অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখীকরণ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর- সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা সরকারকে নতুন বিনিয়োগ ও নতুন বাজারের সন্ধান করতে বাধ্য করছে।
এই প্রেক্ষাপটে চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এখন শুধু উৎপাদনশীল শিল্পেই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মতো খাতেও বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্যের দিকে এগোতে চায়, তাহলে এসব খাতে চীনের সাথে গভীর সহযোগিতা দেশের শিল্পকাঠামোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
চীনে বাংলাদেশের রফতানি প্রথমবারের মতো এক বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) চীনে প্রায় ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। এই সফরের মধ্য দিয়ে আগামী দুই বছরের মধ্যে রফতানি তিন বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনা দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহা: খোরশেদ আলম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর দুই বছরের মধ্যে চীনে রফতানি তিন বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যে বিশাল বাণিজ্যঘাটতি (প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) রয়েছে, তা কমানোর জন্য এটি এক সুবর্ণ সুযোগ।
গত এক দশকে চীনের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য তিনগুণ বেড়েছে; কিন্তু এর প্রায় সবটাই আমদানি। রফতানির পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরোয়নি। চীনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার পরও বাংলাদেশ সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। চীনের ১৪০ কোটির বেশি ভোক্তার বিশাল বাজার বাংলাদেশের জন্য এখন শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত। এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘আমাদের রফতানি ঝুড়ি এখনো একটি বা দু’টি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। চীন আমাদের তৈরী পোশাক খুব বেশি নেবে না, কারণ তারা নিজেরাই এ খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই তাদের যে পণ্যের চাহিদা আছে, সেই পণ্যই আমাদের রফতানি করতে হবে।’
তাই তৈরী পোশাকের পরিবর্তে চামড়া, পাট, প্লাস্টিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও মৌসুমি ফলের মতো নতুন খাতে মনোযোগ দিতে হবে, চীনের বাজারে যার ব্যাপক চাহিদা আছে। বিশেষ করে চুম্বক সামগ্রী, চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার, পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক দ্রব্য, সিরামিক, কাঁকড়া, কুঁচে, শুকনা খাবার, তিল, আম ও কাঁঠালের মতো মৌসুমি ফল রফতানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, সফর উপলক্ষে বেইজিংয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগ সম্মেলনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন সময় এসেছে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা শিল্পকারখানা স্থাপন, বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদন, সৌর ও বায়ুশক্তি, ব্যাটারি প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর-সংক্রান্ত সহায়ক শিল্প, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনে যৌথ বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের নিয়ে কর্মশালায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানিয়েছেন, ‘আমরা গত পাঁচ বছরে একই প্রবণতা দেখছি, বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য চীন সবচেয়ে বড় উৎস।’ প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সামনে রেখে দীর্ঘ এক দশক ধরে আটকে থাকা চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আলোচনার মধ্যে গত মঙ্গলবার একনেকে অনুমোদন পায় চার হাজার ১৮৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। এতে বেইজিংয়ের ঋণে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার কথা বলা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ এবং প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, সফর থেকে ফিরেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে। তা ছাড়া চীন মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক আরেকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
এ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ভবিষ্যতে রেল, সড়ক, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সংযোগ এবং সীমান্তবর্তী অর্থনৈতিক করিডোর উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
বর্তমানে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগেই জানিয়েছেন, তিস্তা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ইস্যু চীনের সাথে আলোচনায় থাকবে। নতুন সেতু ও অবকাঠামো প্রকল্পের বিষয়েও আলোচনা এগিয়েছে।
মানুষে-মানুষে যোগাযোগও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ভিত্তি। শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা, পর্যটন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং যুব সহযোগিতায় গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশী শিক্ষার্থী চীনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। একই সাথে চিকিৎসার জন্যও বাংলাদেশীদের মধ্যে চীনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ভবিষ্যতে সরাসরি বিমান যোগাযোগ এবং স্বাস্থ্য সহযোগিতা আরো সম্প্রসারিত হলে দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক আরো গভীর হবে।
তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক নীতিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান বিশ্বে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ান- সব পক্ষের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সবশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে স্বাক্ষরিত সমঝোতাস্মারকের সংখ্যায় নয়; বরং বাস্তব ফলাফলের ওপর।হ
লেখকদ্বয় : ড. মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওভারসিজ এডুকেশনের সিনিয়র প্রভাষক ও গবেষক
মো: সৈকত হোসেন, চিয়াংশি ইউনিভার্সিটি অব ফিন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের পিএইচডি শিক্ষার্থী



