একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এবং জনমানসের আবেগ-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করার সক্ষমতার ওপর। ইতিহাস সাক্ষী, অনেক সময় দলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত, পরীক্ষিত ও প্রমাণিত কোনো নেতাও তার ব্যাকগ্রাউন্ড বা বাইরের কোনো শক্তির সাথে দীর্ঘকালীন সংযোগে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে দেশের বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী মনোভাব অত্যন্ত তীব্র এবং সংবেদনশীল, সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং তার মন্ত্রিসভার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ইতিহাসের তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অমোঘ দৃষ্টান্ত এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একজন দূরদর্শী নেতাকে একপর্যায়ে তার সবচেয়ে পরীক্ষিত মানুষের প্রভাব থেকেও রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে হয়; অন্যথায় জনগণ তার সরকারের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠতে পারে।
ইতিহাসের তিনটি বড় শিক্ষা
ক. আকবর ও বৈরাম খাঁ : অতীত অবদান যতই থাকুক না কেন, জনমতের মেজাজ ও দরবারের ভারসাম্য রক্ষার্থে অভিভাবককে অপসারণ করা অনিবার্য হয়ে পড়ে।
খ. চতুর্দশ লুই ও মাজারিন : জনমনে ‘পুতুল রাজা’ হিসেবে পরিচিতি এড়াতে উজিরের মৃত্যুর পর পূর্ণ ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে হয়।
গ. কায়সার ও বিসমার্ক : নিখাদ দেশপ্রেমিক ও পরীক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও কেবল পররাষ্ট্রনীতি ও জনভাবাবেগের সাথে সঙ্ঘাতের কারণে চ্যান্সেলরকে বিদায় দিতে হয়।
১৫৫৬ সালে সম্রাট আকবর যখন মাত্র ১৩ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন, তখন তার প্রধান উজির ও অভিভাবক বৈরাম খাঁ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে সাম্রাজ্য রক্ষা করেন। কিন্তু আকবর যখন প্রাপ্তবয়স্ক হন, তখন তিনি বুঝতে পারেন, বৈরাম খানের অতিরিক্ত ক্ষমতা এবং সুন্নি-প্রধান রাজ্যে তার শিয়া-ঘেঁষা নীতির কারণে দরবারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। আকবর তার এই পরম বিশ্বস্ত অভিভাবককে সসম্মানে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
তারেক রহমানের উপদেষ্টা/মন্ত্রিসভায় এমন নেতা থাকতে পারেন যারা দলের জন্য চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাদের অতীত ইতিহাস বা বাইরের কোনো দেশের সাথে গভীর রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সংযোগ আছে। এ ধরনের সংযোগ জন অনুভূতিকে যদি আহত করে, তবে তারেক রহমানের জন্য আকবরের মতো কঠোর ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার বিকল্প থাকবে না।
ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই যখন শৈশবে সিংহাসনে বসেন, তখন তার প্রধান উজির ছিলেন কার্ডিনাল মাজারিন। মাজারিন ছিলেন চতুর। তার একক সিদ্ধান্তে জনগণ মনে করতে শুরু করে, রাজা আসলে একজন পুতুল শাসক। লুই অবশ্য মাজারিনকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। কিন্তু জনগণের অসন্তোষ টের পেয়ে মাজারিনের মৃত্যুর পর তিনি ঘোষণা করেন, ‘আজ থেকে আমি নিজে আমার প্রধান উজির।’ তিনি ক্ষমতার চাবিকাঠি নিজের হাতে তুলে নেন।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
বাংলাদেশের জনগণ আজ কোনো দুর্বল সরকার দেখতে প্রস্তুত নয়। তারেক রহমানকে স্পষ্ট করতে হবে, ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের ব্যাকগ্রাউন্ড যেন জনমনে এমন ধারণার জন্ম না দেয় যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশেষ কোনো শক্তির ইশারা রয়েছে।
প্রিন্স অটো ভন বিসমার্ক ছিলেন জার্মানির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল চ্যান্সেলর। তিনি টুকরো টুকরো জার্মানিকে একত্রিত করেন। ১৮৮৮ সালে তরুণ কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম সম্রাট হন, তখন তিনি দেখলেন, বিসমার্কের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি উদীয়মান তরুণ প্রজন্মের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার সাথে মিলছে না। কাইজার বুঝতে পারলেন, বিসমার্কের মতো লিজেন্ডের ওপর নির্ভর করলে সম্রাটের নিজস্ব কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। ফলে ১৮৯০ সালে নীতিগত দ্বিমত তৈরি হওয়া মাত্রই তিনি বিসমার্ককে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
বিসমার্কের মতো দলের শতভাগ পরীক্ষিত নেতাও যদি জনমতের আকাঙ্ক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক হন, তবে তারেক রহমানকে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের মতোই কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সামরিক সংযোগ, জিয়ার উত্তরাধিকার ও গণতন্ত্রের সমীকরণ
তারেক রহমানের রাজনৈতিক শক্তির পেছনে দেশের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে তার গভীর ঐতিহাসিক ও পারিবারিক সংযোগের বড় ভূমিকা আছে। তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন রণাঙ্গনের বীর উত্তম। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে লাহোরের প্রতিরক্ষায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়নের অকুতোভয় কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে ক্যাপ্টেন জিয়া ‘হিলাল-ই-জুরাত’ খেতাব লাভ করেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টই ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে মূল প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং তারই অংশ হিসেবে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।
পরে বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ এক দশকের বেশি সরকার পরিচালনা করেন মূলত জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ও তার কঠোর ভারতবিরোধী অবস্থানের ওপর ভর করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান এবং প্রাক্তন নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের জামাতা। এই পারিবারিক উত্তরাধিকার ও সামরিক বলয়ের মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন তার বিশেষ রাজনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতন প্রমাণ করেছে, এই সমর্থন কোনো চিরস্থায়ী সনদ নয়। জন-আকাঙ্ক্ষার অবমূল্যায়ন করা হলে কোনো শক্তিই কার্যকর থাকে না।
চাটুকারিতা পতন ডেকে আনে
আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে, গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত থাকার সময় অত্যন্ত কাছ থেকে চাটুকার গোষ্ঠীর অন্তর্ঘাতী ভূমিকা দেখার সুযোগ হয়। যদিও আজকের রাজনীতির দিকে তাকালে মনে হয়, বর্তমান চাটুকারিতা ও চাটুকারদের দৌরাত্ম্য তখনকার সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। এখন তা আরো বহুগুণ দক্ষতায় অতি ধূর্ত রূপ নিয়েছে। একদল সুবিধাবাদী নিজেদের স্বার্থে তারেক রহমানের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ভুল পথে চালিত করার চেষ্টা করেছে। যার খেসারত পরবর্তীতে তারেক রহমানকে দিতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের অন্ধ ভারত-তোষণ নীতি এবং ভারতের উপর্যুপরি বাংলাদেশের রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ জনগণের মধ্যে তীব্র ভারতবিরোধী চেতনার জন্ম দেয়, তারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে। সেই জনমত এখন আরো গভীর হয়েছে।
একসময় পুরো পূর্ব ইউরোপ ভ্রমণের বিরল সুযোগ আমার হয়েছিল। আশির দশকে, যখন পুরো পূর্ব ইউরোপজুড়ে ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ (Warsaw Pact) ভুক্ত শক্তপোক্ত কমিউনিস্ট ব্লকের দেশগুলো তাসের ঘরের মতো পতন ঘটছিল, ঠিক সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনগুলোতে পোল্যান্ড সফরের সময় উত্তাল গণ-আন্দোলনের মুখে আমরা আটকা পড়েছিলাম। পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সময়োপযোগী সহায়তা ও কূটনৈতিক তৎপরতায় আমরা সেখান থেকে উদ্ধার পাই। রোমানিয়ার স্বৈরশাসক নিকোলাই চসেস্কুর ক্ষমতার দাপট চুরমার হওয়া এবং তার নির্মম পতন প্রত্যক্ষ করি, যিনি মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগেও লাখো মানুষের সামনে নিজের জনপ্রিয়তার বড়াই করেছিলেন।
তৎকালীন ইস্ট বার্লিনে নিযুক্ত বাংলাদেশের দূরদর্শী কূটনীতিক মেজর (অব:) আসাফ উদ দৌলা, যিনি পরে জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তার সহায়তা ও দিকনির্দেশনায় বার্লিন প্রাচীরের ছায়াতলে কমিউনিস্ট ব্যবস্থার এক নিদারুণ গোপন জগৎ কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। রাষ্ট্রের কঠোর স্টাসি (Stasi) গোয়েন্দা নজরদারি, মানুষের চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস এবং লৌহ যবনিকার পেছনের রুদ্ধশ্বাস জীবনযাত্রা সেদিন আমাদের মনে গভীর কৌতূহলের জন্ম দিয়েছিল।
সফরকালে হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া ও বুলগেরিয়ার মতো দেশগুলোর সীমান্তজুড়ে এক অভিন্ন দৃশ্য চোখে পড়ে। রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ, গোয়েন্দা ভয়ভীতি কিংবা বিশাল সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মনে পরাধীনতার ও তোষণনীতির শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার এক তীব্র, সংক্রামক আকুলতা ফুটছিল। বার্লিন প্রাচীর ধসে পড়া থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপের স্বৈরাচারী ব্যবস্থার এই একের পর এক পতন আমার মনে রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর ও চিরন্তন শিক্ষা খোদাই করে দেয়। কোনো রাষ্ট্র কিংবা শাসকশ্রেণী যতই শক্তিশালী হোক, অস্ত্র বা চাটুকারিতার জোরে জনগণের ক্ষোভ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা চিরকাল চেপে রাখা অসম্ভব।
সময়মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস দেখতে রাজি নয়। উপদেষ্টামণ্ডলী বা মন্ত্রিসভায় যদি এমন কোনো ব্যক্তি বা উপদেষ্টা বহাল থাকেন, যার বিদেশী শক্তির প্রতি সামান্যতম নমনীয়তা রয়েছে বলে জনমনে সংশয় জাগে, তবে দেশের মানুষ তা সহজভাবে নেবে না।
শেষকথা
ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই, জার্মানির কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম কিংবা মুঘল সম্রাট আকবর, প্রত্যেকেই জানতেন, ব্যক্তি-আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের আস্থা অনেক বড় বিষয়। তারেক রহমানের জন্যও আজকের ঐতিহাসিক অগ্নিপরীক্ষা এটিই। আকবরের মতোই কঠোর, দূরদর্শী এবং দৃশ্যমান স্বাধীন নীতি গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল তিনি জনগণের আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে পারবেন। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, বাঙালির মগজ আর সাহস যখন এক হয়, তখন তা অপরাজেয়।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি



