বড় বাজেট, ছোট রাজস্ব : সামষ্টিক অর্থনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব

এক কথায়, এই বাজেট এক দিকে অর্থনীতিতে গতি আনার উচ্চাভিলাষী চেষ্টা, অন্য দিকে এটি আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাঠামো। তাই মূল প্রশ্ন- শুধু বাজেট কত বড় বা কত সম্প্রসারণমূলক- তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো এই সম্প্রসারণ বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং টেকসইভাবে বহনযোগ্য। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে সংখ্যার ওপর নয়; বরং বাস্তবায়নের ওপর।

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ৯ দশমিক ৩০ লাখ কোটি টাকার একটি সম্প্রসারণমূলক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। এটি আগের অর্থবছরের ৭ দশমিক ৯০ লাখ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি ২ দশমিক ৩০ লাখ কোটি টাকা থেকে বেড়ে তিন লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। এই পরিসংখ্যান শুধু বাজেটের আকার বড় হওয়ার ইঙ্গিত দেয় না; বরং অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ভূমিকা আরো গভীর করার একটি নীতিগত অবস্থানও নির্দেশ করে।

প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট, যার উদ্দেশ্য প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অর্থনৈতিক ধীরগতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক চাপে থাকা অর্থনীতির জন্য এমন সম্প্রসারণমূলক বাজেট স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা, বড় প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি এবং অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণ এই বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে ধরা যেতে পারে।

কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি মৌলিক নীতিগত অসামঞ্জস্য। যেখানে ব্যয় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, সেখানে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য মাত্র ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এই ব্যবধান অর্থনীতিতে একটি কাঠামোগত চাপ তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ভারসাম্য দুর্বল করতে পারে। কারণ যে গতিতে ব্যয়ের সম্প্রসারণ ঘটছে, সেই হারে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ছে না। ফলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি বাড়ে, যা পরবর্তী ধাপে ঋণনির্ভর অর্থায়নের চাপ তৈরি করে।

এ ধরনের ব্যবধান শুধু একটি বছরের হিসাব নয়; বরং মধ্যমেয়াদি আর্থিক স্থিতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত। যখন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে রাজস্বের তুলনায় দ্রুত বাড়ে, তখন সরকারের আর্থিক অবস্থান ক্রমেই ঘাটতিনির্ভর হয়ে পড়ে। এর ফলে ভবিষ্যতে সুদের চাপ, ঋণ পরিশোধের বোঝা এবং বাজেট নমনীয়তা- সবকিছুই সীমিত হতে পারে।

একই সাথে সরকার ৬ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৬ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি এবং ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বাজেট ঘাটতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই তিনটি লক্ষ্য আলাদাভাবে দেখলে মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ মনে হবে; কিন্তু একসাথে বিশ্লেষণ করলে এর মধ্যে একটি জটিল নীতিগত টানাপড়েন স্পষ্ট হয়। কারণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাধারণত বিনিয়োগ ও চাহিদা বাড়ানো দরকার, যা আবার মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। একই সময়ে ঘাটতি সীমিত রাখতে হলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ বা রাজস্ব আয়ের দক্ষতা বাড়াতে হয়, যা আবার প্রবৃদ্ধি সম্প্রসারণের গতি কমিয়ে দিতে পারে। ফলে এখানে একটি ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়, উচ্চ প্রবৃদ্ধি, নিম্ন মুদ্রাস্ফীতি এবং সীমিত ঘাটতি, এই তিনটি লক্ষ্য একসাথে অর্জন করা সহজ নয়, বিশেষ করে যখন অর্থনীতির কাঠামোতে বিনিয়োগের চাপ, ব্যাংকিং খাতের সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক চাপ বিদ্যমান।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য যে নীতিগত সমন্বয় প্রয়োজন, তা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি এবং বিনিয়োগ নীতির মধ্যে যথাযথ সমন্বয় না থাকলে বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, বাজেট যতটা ‘আকাক্সক্ষানির্ভর’ বাস্তবতা ততটা ‘সক্ষমতানির্ভর’।

গত এক দশকের গড় প্রবণতার তুলনায় এবারের বাজেট অনেক বেশি সম্প্রসারণমূলক। বাজেটের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে এবার তা ১৭ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে, অর্থাৎ- প্রায় দ্বিগুণ গতি। এই পরিবর্তন শুধু পরিসংখ্যানগত নয়; নীতিগত দিক থেকেও বড় শিফটের ইঙ্গিত দেয়।

উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে এই বিচ্যুতি আরো স্পষ্ট। দীর্ঘমেয়াদে যেখানে এডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে এবার তা ৩০ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা স্বাভাবিক প্রবণতার প্রায় চার গুণ। এ ধরনের দ্রুত সম্প্রসারণ সাধারণত দেখা যায় অর্থনৈতিক ধীরগতির সময়, যখন বেসরকারি বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত গতি পায় না এবং রাষ্ট্রকে অবকাঠামো ও চাহিদা সৃষ্টির বাড়তি দায়িত্ব নিতে হয়। ফলে বাজেট এখানে কেবল আর্থিক দলিল নয়; বরং একটি সক্রিয় অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের নীতিগত ঘোষণা হিসেবে কাজ করছে।

এই অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা এসেছে শুধু এডিপি সম্প্রসারণ থেকে। অর্থাৎ, বাজেট বৃদ্ধির একটি বড় অংশ সরাসরি উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। এক দিকে এটি অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করে, অন্য দিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপও সৃষ্টি করে।

নীতিগত যুক্তি অনুযায়ী, এ ধরনের সম্প্রসারণমূলক বাজেট সাধারণত তখনই গ্রহণ করা হয় যখন বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, বৈদেশিক বিনিয়োগ অনিশ্চিত এবং অর্থনীতি ধীরগতিতে থাকে। রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা, অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক গতি পুনরুদ্ধার করাই তখন মূল কৌশল হয়ে ওঠে। তবে এই কৌশলের কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবসময় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

গত এক দশকে এডিপি বাস্তবায়নের হার সাধারণত ৭৫ থেকে ৮৩ শতাংশের মধ্যে ছিল; কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে। এই পতন বাজেট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান স্পষ্ট করে তোলে। বিশেষ করে বড় আকারের এডিপি ঘোষণার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ প্রকল্প অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের মতো ধাপগুলোতে সময় ও দক্ষতা দু’টিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সরল হিসাবেই বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়। তিন লাখ কোটি টাকার এডিপির যদি ৮২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়, তাহলে প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ দশমিক ৪৬ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবায়ন যদি ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে থাকে, তাহলে ব্যয় নেমে আসে ২ দশমিক ০৪ লাখ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, শুধু বাস্তবায়ন দক্ষতার পার্থক্যে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রভাব পরিবর্তিত হতে পারে। এই পার্থক্য শুধু হিসাবের নয়; বরং অর্থনীতিতে প্রকৃত চাহিদা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান এবং প্রবৃদ্ধির গতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। বাজেটের আকার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়ন সক্ষমতা। কারণ বাজেট যত বড়ই হোক না কেন, যদি তা সময়মতো এবং দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করা না যায়, তাহলে তার প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রভাব অর্জন সম্ভব হয় না। ফলে বাজেট কেবল আর্থিক পরিকল্পনা নয়; বরং সক্ষমতা-নির্ভর অর্থনৈতিক পরীক্ষাও।

বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো রাজস্ব কাঠামো। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ দশমিক ০৫ লাখ কোটি টাকা, যা মাত্র ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি। অর্থাৎ, অতিরিক্ত আয় মাত্র ৪১ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যবধান দেখায়, অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি বড় অংশ নতুন রাজস্ব থেকে আসছে না।

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হলেও বর্তমান লক্ষ্য তার নিচে। এটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। প্রত্যক্ষ করের আওতা সীমিত, করফাঁকি উচ্চ এবং ডিজিটাল করব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়।

এর পাশাপাশি রাজস্বের বড় অংশ আসে ভোগ ও আমদানি থেকে; কিন্তু অর্থনৈতিক মন্থরতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে এই উৎসগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে বাস্তবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যদি লক্ষ্যমাত্রার ৮৫-৯০ শতাংশ অর্জিত হয়, তাহলে ৬০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এই ঘাটতি সরাসরি বাজেটের ওপর ঋণনির্ভরতার চাপ বাড়াবে। এই প্রেক্ষাপটে ঘাটতির চিত্র আরো গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ২৬ লাখ কোটি টাকা, যা ২০২৬-২৭ সালে বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি বাজেট সম্প্রসারণের তুলনায় অনেক দ্রুত।

সরকারিভাবে ঘাটতি ধরা হয়েছে জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ; কিন্তু বাস্তবে এটি ৫ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি হতে পারে। কারণ রাজস্ব ও বৈদেশিক অর্থায়নের অনিশ্চয়তা সবসময় বাস্তব ঘাটতিকে বড় করে তোলে। এই ঘাটতি পূরণের প্রধান উৎস দেশীয় এবং বৈদেশিক ঋণ; কিন্তু বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত অর্থ সবসময় দ্রুত ছাড় হয় না। ফলে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ ফেলতে পারে।

এখানেই শুরু হয় Crowding Out Effect-এর ঝুঁকি। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণযোগ্য তহবিল কমে যায়। ফলে সুদের হার বাড়ে, বিনিয়োগ ব্যয় বাড়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি কমে। এই প্রভাব সরাসরি প্রবৃদ্ধির ওপর পড়ে, কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। তৈরী পোশাকশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, আবাসন ও এসএমই খাত মূলত বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল।

সরকার ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে; কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৪ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ, এক বছরে প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে, যা প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সমান চ্যালেঞ্জ। তাত্ত্বিকভাবে বড় এডিপি এবং সরকারি ব্যয় প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু বাস্তবে সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে প্রয়োজন বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ এবং শক্তিশালী রফতানি প্রবৃদ্ধি।

অন্য দিকে মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্য ৬ শতাংশে নামানোও সহজ নয়। কারণ একই সময়ে বাজেট ব্যয় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ঘাটতি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, এমন সম্প্রসারণমূলক বাজেট চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা, বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি এই চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে লক্ষ্যটি অসম্ভব নয়; কিন্তু অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

সবমিলিয়ে এই বাজেটে চারটি বড় কাঠামোগত টানাপড়েন স্পষ্ট- ব্যয় বনাম রাজস্ব, প্রবৃদ্ধি বনাম ঋণনির্ভরতা, ব্যয় সম্প্রসারণ বনাম মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পনা বনাম বাস্তবায়ন সক্ষমতা। এই চারটি অসামঞ্জস্য একসাথে দেখলে বোঝা যায়, বাজেটটি একাধিক লক্ষ্য একসাথে অর্জনের চেষ্টা করছে; কিন্তু সেই লক্ষ্যগুলো সবসময় একে-অপরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এক কথায়, এই বাজেট এক দিকে অর্থনীতিতে গতি আনার উচ্চাভিলাষী চেষ্টা, অন্য দিকে এটি আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাঠামো। তাই মূল প্রশ্ন- শুধু বাজেট কত বড় বা কত সম্প্রসারণমূলক- তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো এই সম্প্রসারণ বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং টেকসইভাবে বহনযোগ্য।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে সংখ্যার ওপর নয়; বরং বাস্তবায়নের ওপর।

লেখক : অর্থনীতিবিদ গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]