আদালতপাড়ায় জালিয়াত সিন্ডিকেট

ডিজিটালাইজেশন প্রতিকার আনতে পারে

কেবল নথি জালিয়াতি নয়, ভাড়ার বিনিময়ে প্রক্সি আসামির ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে জালিয়াত চক্র। মামলার এজাহারভুক্ত এক নারী আসামির পরিবর্তে অন্য নারী আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে গেছেন, এমন উদাহরণও আছে। জামিন শুনানির সময় বাদিপক্ষের আপত্তির পর বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।

রাজধানী ঢাকায় আদালতপাড়ায় জাল-জালিয়াতির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। টাকার বিনিময়ে মেলে বিচারকের ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর। গতকাল সহযোগী একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, টাকা দিলেই তৈরি হচ্ছে আদালতের আদলে নথি। গ্রেফতারি পরোয়ানা, সমন, নোটারি হলফনামা, কাবিননামা, এমনকি মামলার সার্টিফায়েড কপি বা নকলের কপিতেও বসানো হচ্ছে বিচারকের সিল, স্বাক্ষর। এসব নথি ব্যবহার করে বিচারপ্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার কারসাজি চলছে। আদালতের আশপাশের কিছু ফটোকপির দোকানকে কেন্দ্র করে এই চক্রের কার্যক্রম চলে। আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারীর মাধ্যমে আসল নথির নমুনা, স্মারক নম্বর ও তথ্য সংগ্রহ করা হয় বলেও অভিযোগ আছে। এসবের সাথে জড়িত আছেন অসাধু আইনজীবীরাও।

কেবল নথি জালিয়াতি নয়, ভাড়ার বিনিময়ে প্রক্সি আসামির ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে জালিয়াত চক্র। মামলার এজাহারভুক্ত এক নারী আসামির পরিবর্তে অন্য নারী আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে গেছেন, এমন উদাহরণও আছে। জামিন শুনানির সময় বাদিপক্ষের আপত্তির পর বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।

বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করার ঘটনাও ঘটেছে। নির্দোষ মানুষকে ভুয়া সমন পাঠিয়ে হয়রানিও করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ১১ নম্বর আদালতের বিচারক আরিফুল ইসলামের সিল ও স্বাক্ষর জাল করার একটি ঘটনা সম্প্রতি সামনে আসে। আদালতের নথি অনুযায়ী, বরগুনার বামনা উপজেলার একটি সিআর মামলায় নোটারি হলফনামা দাখিল করা হয়। ওই হলফনামায় বিচারকের কাউন্টার সই ও সিল ব্যবহার করা হয়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে সিএমএম আদালতের নেজারত শাখার হলফনামা রেজিস্টার যাচাই করা হয়। সেখানে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট স্মারক নম্বরে অন্য একজনের হলফনামা নিবন্ধিত আছে। তদন্তে বিচারকের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ওই নথি তৈরির বিষয়টি প্রমাণ হয়। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় মামলা হয়েছে।

এই মামলার মাধ্যমে হয়তো এই ঘটনার সাথে জড়িত জালিয়াত চক্রের শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে; কিন্তু কেবল একটি ঘটনায় শাস্তি নিশ্চিত করে জালিয়াত চক্রের কারসাজি বন্ধ করা যাবে না। প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান। যাতে কেউ এমন জালিয়াতি এবং কারসাজি করার সুযোগ না পায়। এজন্য বিচারিক প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় সেবা চালু হলে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রতারক চক্রের সুযোগ অনেকটাই কমে যায়।

প্রতিটি সমন, পরোয়ানা ও আদালতের আদেশে সুনির্দিষ্ট কিউআর কোড ও অনলাইন ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সাথে আদালত প্রাঙ্গণের ফটোকপির দোকানগুলোকে কঠোর নজরদারিতে আনা জরুরি।

এই চক্রের সঙ্গে আদালত বা আইনি পেশার যারাই জড়িত থাকুক, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল সুরক্ষা পারে বিচার বিভাগের এই ভাবমূর্তির সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে। জালিয়াতির এই জাল কেটে দেয়ার জন্য বিচার বিভাগ ও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।