কমছে না পানিতে ডুবে মৃত্যু

কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করুন

২০৩০ সালের মাধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর ২০২৫ সালে একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এতে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও এসব কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ শুরু হয়নি। পানিতে ডুবে মৃত্যু কমিয়ে আনার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর কালক্ষেপণ না করে এটি শুরু করা জরুরি।

সময়ের সাথে সাথে মানুষের ব্যস্ততা বাড়ছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীও কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ছেন, এর প্রভাব পড়ছে সন্তান লালন-পালনে। নিকট অতীতে যৌথ পরিবারে মা-বাবার অনুপস্থিতিতে শিশুদের বেড়ে উঠায় দাদা-দাদী কিংবা অন্য কোনো সদস্য তাদের দেখাশোনা করতেন। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ায় এখন সেই সুযোগ অনেকটা কমে গেছে। ফলে শিশুদের ভালোভাবে দেখাশোনার অভাবে বাড়ির আশেপাশে থাকা নদ-নদী, পুকুর কিংবা অন্য কোনো জলাশয়ে পড়ে তাদের মৃত্যু হচ্ছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু জনস্বাস্থ্যের একটি বড় সঙ্কট হিসেবে সামনে এলেও এ নিয়ে উদাসীনতা লক্ষণীয়; যা এ মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ১৮ হাজার ৬৬৫ জন পানিতে ডুবে মারা যান। এর মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯টি শিশু। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে এক থেকে চার বছরের শিশুরা। তাদের বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটে বাড়ির কয়েক গজে থাকা পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয়ে। অন্য দিকে ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে পানিতে ডুবে মারা গেছে ৫৮৩ জন। এর মধ্যে ৫২৭ জন শিশু। গত বছর দেশে ডুবে মারা যান এক হাজার ৩১১ জন। তাদের মধ্যে এক হাজার ১৮৪ জন, অর্থাৎ ৯০ শতাংশের মতো শিশু।

পানিতে ডুবে মৃত্যু উদ্বেগের হলেও তা রোধে সরকারের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। বড় সমস্যা হলোÑ সরকার কোন বিষয়ে উদ্যোগ নিলেও পরে তা সঠিভাবে বাস্তবায়নে তেমন মনোযোগ থাকে না। ফলে ওই উদ্যোগ থেকে কাক্সিক্ষত ফল মেলে না।

গণমাধ্যমের খবর, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ২০২২ সালে ৩০৬ কোটি টাকার ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি)’ প্রকল্প চালু করে। এর আওতায় ১৬ জেলার ৪৫ উপজেলায় আট হাজার শিশুযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। সেখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী দুই লাখ শিশুর নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা হতো। একই সাথে এক হাজার ৬০০টি সুইম-সেইফ কেন্দ্রে তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে জীবনরক্ষাকারী সাঁতার শেখানো হয়। কিন্তু প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষে গত ডিসেম্বর থেকে কেন্দ্রগুলো বন্ধ। নতুন প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা যায়নি। অথচ প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রে নিবন্ধিত কোনো শিশুর ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

আমরা মনে করি, এমন প্রকল্প শুধু নিয়মিত নয়, এগুলোতে আরো সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে কিভাবে আরো উন্নত সেবা দেয়া যায় সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

২০৩০ সালের মাধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর ২০২৫ সালে একটি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এতে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও এসব কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ শুরু হয়নি। পানিতে ডুবে মৃত্যু কমিয়ে আনার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর কালক্ষেপণ না করে এটি শুরু করা জরুরি।

আমরা মনে করি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব।