বাংলাদেশে খুন নিয়ে মমতার ইঙ্গিত

সত্য উদঘাটনে চাই কূটনৈতিক দৃঢ়তা

সরকারের উচিত দ্বিপক্ষীয় বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ভারতে আটক আসামিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া। ভারতের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়ে স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইতে হবে। পাশাপাশি, দেশের ভেতরে সিআইডির চলমান তদন্তকে চাপমুক্ত রেখে স্বচ্ছতার সাথে শেষ করতে হবে। প্রয়োজনে জাতিসঙ্ঘের অধীনে আন্তর্জাতিক তদন্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। ওসমান হাদি হত্যার পেছনের মাস্টারমাইন্ড কারা, সেটা সামনে আনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে জরুরি।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার পর প্রায় ছয় মাস কেটে গেছে। এই হত্যার দিকে ইঙ্গিত করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ২ জুন কলকাতায় এক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া এক ‘বড় খুনি’কে গ্রেফতার করেছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স-এনটিএফ। পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে ফোন করে বিষয়টি গোপন রাখতে বলেছিলেন। ওই সভায় অমিত শাহকে প্রশ্ন ছুড়ে মমতা বলেন, কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল?

সরকার পরিবর্তন হয়ে গেলেও তিনি সবটাই জানেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না, বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে।

এই মন্তব্যে শরিফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনার ইঙ্গিত আছে বলে ধরে নেয়াটাই স্বাভাবিক। হাদি হত্যার মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুলসহ তিন অভিযুক্ত এখনো ভারতের হেফাজতে আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন তাদের গ্রেফতার করা হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন পেয়ে বিষয়টি তিনি কেন চেপে গিয়েছিলেন, এটিও নৈতিক প্রশ্ন। কেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যার পেছনের সত্য আড়াল করতে দিলেন তিনি? তার এই নীরবতা কি অপরাধীদের রক্ষা পাওয়ার সুযোগ দীর্ঘ করেনি?

হাদি হত্যার আসামিদের এখনো ফেরত পাঠানো হয়নি বাংলাদেশে। আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখকে দিল্লির ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি-এনআইএ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? ফেরত পাঠাতে ভারতের গড়িমসি এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ বাংলাদেশের জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হাদি ছিলেন ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তরুণ কণ্ঠ। তাকে হত্যার আসামি ভারতে পালিয়ে যাওয়া, সেখান থেকে এখনো হস্তান্তর না করা এবং সবশেষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যের পর সন্দেহ আরো গাঢ় হওয়াই স্বাভাবিক। এসবের মাধ্যমে খুনের মাস্টারমাইন্ডদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে কি না, সেই প্রশ্ন হওয়া স্বাভাবিক।

কারাগার থেকে বিশেষ তদবিরে শুটার মাসুদের জামিন পাওয়া প্রমাণ করে এই খুন সাধারণ কোনো অপরাধ নয়। এর পেছনে ছিল সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। এই চক্রান্তের রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমান সরকারও পারছে না; বরং মমতার মন্তব্যকে ভারতের অভ্যন্তরীণ কাদা ছোড়াছুড়ি বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অথচ বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করা যেত।

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত দ্বিপক্ষীয় বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ভারতে আটক আসামিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া। ভারতের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়ে স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইতে হবে। পাশাপাশি, দেশের ভেতরে সিআইডির চলমান তদন্তকে চাপমুক্ত রেখে স্বচ্ছতার সাথে শেষ করতে হবে। প্রয়োজনে জাতিসঙ্ঘের অধীনে আন্তর্জাতিক তদন্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। ওসমান হাদি হত্যার পেছনের মাস্টারমাইন্ড কারা, সেটা সামনে আনা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে জরুরি।