দামে সস্তা ও সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় দৈনন্দিন কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। আশঙ্কার বিষয় গৃহস্থালি ও খাদ্যেপণ্যে এর ব্যবহার নিয়ে। পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে এটি অনুপ্রবেশ করেছে। আমাদের প্রধান খাদ্যে এর উপস্থিতি আগেই পাওয়া গেছে। এবার দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্টে উচ্চহারে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। টুথপেস্ট খাদ্যপণ্য না হলেও এটি ব্যবহারের পর আমাদের রক্ত পরিচালন ব্যবস্থায় ঢুকে পড়া স্বাভাবিক। যে সময় খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিকের উপস্থিতি শূন্য করতে বড় উদ্যোগ দরকার ছিল। দেখা যাচ্ছে, সেই সময় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার আরো বাড়ছে। অদূর ভবিষ্যতে এটির জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটানোর আশঙ্কা থাকলেও এ নিয়ে কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।
পরিবেশবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলছে, দেশের বাজারে সামান্য কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সব ক’টি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে। সংস্থাটির গবেষণায় বাজার থেকে ৩৪টি ব্র্যান্ড পরীক্ষা করে ২৬টির মধ্যে এর উপস্থিতি পায়। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য উৎপাদিত ছয়টি পেস্টের চারটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শিশুদের জন্য এটি বেশি স্বস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে; কারণ শিশুরা ব্রাশ করার সময় টুথপেস্টের কিয়দংশ খেয়ে ফেলে। এমনকি বিদেশ থেকে আমদানি করা টুথপেস্টেও একই ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষণা প্রতিবদেন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সংস্থাটি দেশজুড়ে দুই হাজার ৭৬০ ভোক্তার ওপর জরিপ চালিয়েছে। নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে আধুনিক উন্নতমানের গবেষণাগারে। এক বছর সময় নিয়ে গবেষণাটি করা হয়।
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার সব ক’টিতে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা থাকার বিষয়টি একপ্রকার নিশ্চিত। এমনকি সমুদ্রের মাছ, উন্মুক্ত জলাশয়ে ঘুরে বেড়ানো পাখির মধ্যেও এটি ছড়িয়ে পড়েছে। বাজারে ফল, শাকসবজি, মধু, রুটি, দুগ্ধজাত দ্রব্যে এটি ঢুকে পড়েছে। ডিমের সাদা অংশ ভেদ করে ঢুকে পড়েছে কুসুমেও। টুথপেস্ট যেহেতু কোনো খাদ্যপণ্য নয়, তাই এটি নিয়ে তেমন উদ্বেগও নেই। কিন্তু লক্ষণীয়, সেখানেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি আছে। বাজারে টুথপেস্ট নিয়ে এখন নজরদারি কর্তৃপক্ষের সক্রিয় হওয়া উচিত। সরকার চাইলে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি বাজারকে ভেজাল টুথপেস্ট মুক্ত করতে পারে। প্লাস্টিক কৃত্রিম তন্তু, যা দেহকোষে ঢুকে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। দীর্ঘমেয়াদে কোষে বিষক্রিয়া তৈরি করে ক্যান্সারের জীবাণু সৃষ্টি করতে পারে। বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি জানা সত্ত্বেও আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং খাদ্যপণ্যকে প্লাস্টিকমুক্ত রাখতে কম সতর্কতা অবলম্বন করি। দেশে যেভাবে প্লাস্টিকের বিস্তার ঘটছে, তাতে ইতোমধ্যে পরিবেশের বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটিয়েছে। কখন এটি আমাদের জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের আঘাত হানে কি না তাই চিন্তার বিষয়।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে প্লাস্টিক উৎপাদন-ব্যবহার এবং খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে এর ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার নিয়ে এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই সাথে খাদ্যপণ্য প্লাস্টিকমুক্ত করতে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।



