জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়াল সরকার। এর চাপ পড়বে সব শ্রেণীর গ্রাহকের ওপর। ইরান যুদ্ধের কারণে অস্থির হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও যুদ্ধের প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে দুই দফায় দাম বেড়ে এখন দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে জ্বালানি তেলের দাম। এখন বিদ্যুতের দাম একবারে সর্বোচ্চ পরিমাণে বাড়ানো হলো। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম জুন থেকে কার্যকর হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাইকারি দাম বাড়ানোয় বছরে পিডিবির আয় বাড়বে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এতে সরকারের ভর্তুকি কিছু কমবে। এর পরও ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেবে সরকার। আর খুচরা দাম বাড়ানোয় ভোক্তার কাছ থেকে বাড়তি আসবে বছরে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে আনুপাতিক হারে ভ্যাট, করও বাড়বে সরকারের। তাই নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম না বাড়ালেও হতো। অযৌক্তিক খরচ, ক্যাপাসিটি চার্জের দায় ভোক্তার ওপর চাপানো রীতিমতো জুলুম। গত অর্থবছরেও ৪০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল।
বিদ্যুতের মূল্য বেড়ে যাওয়া মানে শুধু একটি সেবার খরচ বৃদ্ধি নয়, এটি জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। ২৫ বছরে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় নাগরিক জীবনে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তা গভীর উদ্বেগের। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী- যাদের আয় সীমিত, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি জনজীবনে বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তাই জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুৎ খাত পরিচালনা এবং টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা উচিত। কারণ, শিল্প-কারখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় পরিচালন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে পণ্যমূল্যে। ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি আরো তীব্র হবে। ভোক্তাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে। কৃষি খাতও এ পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নয়। সেচকাজে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এতে খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ছোট উদ্যোক্তা ও স্বনির্ভর পেশাজীবীদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে না পেরে উৎপাদন কমিয়ে কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হবে। প্রতিক্রিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সঙ্কুচিত হওয়ার শঙ্কা বাড়বে।
সরকার বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা ও উৎপাদন ব্যয় সমন্বয়ে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। কিন্তু যেকোনো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আগে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা, আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া উচিত। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি, অপচয় ও দুর্নীতি রোধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে ব্যয় কমানোর বাস্তব উদ্যোগ নিতে হবে।



