আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাজেট গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আমাদের বাজেটের আকার দিন দিন স্ফীত হলেও এর সফল বাস্তবায়নের হার বাড়েনি। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দেশ হওয়ায় বাজেটে উন্নয়ন খাত-এডিপি সবচেয়ে প্রাধান্য পায়। এতে বরাদ্দও বেশি থাকে। কিন্তু এর বাস্তবায়নে অদক্ষতা একটি স্থায়ী নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় মোট বাজেটের ৫০ শতাংশের বেশি উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেয়া হতো। এখন ৩০ শতাংশে নেমে এলেও এর বাস্তবায়নে অদক্ষতা আগের মতো রয়ে গেছে। এবারের বাজেটে আগে থেকে এ বিষয়ে সরকারের সজাগ দৃষ্টি থাকতে হবে; যাতে উপযুক্ত বরাদ্দ দেয়ার পাশাপাশি যথাযথ বাস্তবায়ন হয়।
দেশের বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতÑ এর আকার যথেষ্ট বেড়েছে। বাড়েনি বাস্তবায়ন সফলতা ও গুণগত মান। আকারে বাজেট বিশাল দেখা যাওয়ার মূল কারণ কাঠামোগত সাধারণ খরচ। বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা ও ঋণ পরিশোধে। সাথে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি খাতে অযাচিত ভর্তুকি। তার পরও বাজেট বরাদ্দের বড় একটি অংশ অবাস্তবায়িত থেকে যায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা হয়েছিল। বাস্তবায়নের হার মূল বাজেটের ৮০ শতাংশ, সংশোধিত বাজেটে সেটি ৮৫ শতাংশ হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৮০-৮৫ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন হার সবসময় কম। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেটি নেমে যায় ৬৮ শতাংশের নিচে। খরচ করা যায়নি ৭২ হাজার কোটি টাকা। ওই বছরে ক্ষমতার পালাবদল এতে নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে। কিন্তু অন্যান্য বছরে উন্নয়ন বাজেট ব্যবহারের ব্যর্থতা দেখা গেছে। সাধারণত দেখা যায় অর্থবছরের শুরুর দিকে বাজেট বাস্তবায়ন ধীরগতি থাকে। বছরের শেষের দিকে অর্থ খরচের হিড়িক পড়ে যায়। এ ধরনের প্রবণতা বাজেট ব্যবহারের অদক্ষতা অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়।
দরিদ্র একটি দেশের বিপুল অর্থ বছর বছর অপচয় হয়। এবার ঘোষণা হতে যাওয়া নতুন বাজেটেও এডিপির জন্য তিন লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে সরকার। বিস্তৃত পরিসরে উন্নয়ন কর্ম চালাবে এর মাধ্যমে। সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের যে কর্মসূচি রয়েছে এর মাধ্যমে বড় আকারে বাস্তবায়নের চিন্তাও করছে সরকার। মূল বাজেটের ৩২ শতাংশ এডিপিতে ব্যয় করবে। বিএনপির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। বাজেটে তার প্রতিফলন রাখতে যাচ্ছে সরকার। তবে এডিপি বাস্তবায়নের পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে এই বিপুল অর্থের বড় অংশ অপচয় হওয়ার শঙ্কা থেকেই যাবে।
আমাদের দেশ এখনো দরিদ্র। বাজেটের আসল উদ্দেশ্য উন্নয়ন। বাজেটেও এর প্রতিফলন সবসময় আছে। মোট বাজেটের ৬০ শতাংশও একবার এই খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়। এ যাবৎ যতটা অর্থ এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তার উপযুক্ত ব্যবহার হলে দেশ উন্নত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তা হয়নি। তাই সরকারের লক্ষ থাকতে হবে এডিপি বাস্তবায়নের দিকে। এই অর্থ যেন সময়মতো দক্ষতার সাথে ব্যয় হয়। অনিয়ম-দুর্নীতিও যেন না হয়।



