বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশ সফরে আসেন গত বৃহস্পতিবার। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে বৈঠক করেন। এতে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা সম্প্রসারণে তুরস্কের আগ্রহকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত নিরাপত্তায় ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
স্বাধীনতার পর একটি বিশেষ মহলের প্রচ্ছন্ন মদদে এ দেশে আত্মঘাতী মানসিকতা ও বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল বাংলাদেশে কোনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দরকার নেই। যুক্তি দেয়া হতো, বন্ধুপ্রতিম ভারত যে দেশকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে, সেখানে আক্রমণের ঝুঁকি শূন্য। এ ঠুনকো যুক্তির আড়ালে মূলত বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষায় পঙ্গু ও একক দেশনির্ভর করে রাখার ষড়যন্ত্র ছিল। এমনকি নিয়মিত সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে সমান্তরাল বাহিনী গঠনের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা একসময় হুমকিতে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। এই অবাস্তব ও সার্বভৌমত্ববিরোধী নীতি থেকে বাংলাদেশকে প্রথম টেনে বের করে এনেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের পর তিনি সাহসিকতার সাথে ঘোষণা করেছিলেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল সশস্ত্রবাহিনী অপরিহার্য। তিনি কেবল ঘোষণা দিয়ে ক্ষান্ত হননি, চীন ও মুসলিম বিশ্বের সাথে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক স্থাপন করেন। আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করে ভারতের ওপর একমুখী সামরিক ও কূটনৈতিক নির্ভরশীলতা দূর করেছিলেন।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের সেই দূরদর্শী নীতির গুরুত্ব আরো বেড়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখন কেবল একক কোনো দেশের দিকে তাকিয়ে থাকার সুযোগ নেই। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারত বর্তমানে সীমান্তে যে ধরনের আচরণ করছে, তা উদ্বেগের। প্রায় নিয়মিত বিরতিতে সীমান্তে ‘পুশইনে’র অপতৎপরতা চালাচ্ছে দিল্লি। যা কোনোভাবে বন্ধুসুলভ নয়। বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক এবং অতন্দ্র প্রহরী সীমান্তরক্ষীরা এ অন্যায় অনুপ্রবেশ প্রতিহত করছেন। প্রতিবেশীর এমন বৈরী আচরণে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তায় আমাদের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিরক্ষা কাঠামো। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হলে চীন, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মতো সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো নিবিড় করতে হবে।
তুরস্ক প্রতিরক্ষা শিল্পের উদীয়মান শক্তি। ড্রোন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ ও সমরাস্ত্র তৈরিতে দেশটির সক্ষমতা বিশ্বস্বীকৃত। হাকান ফিদানের এ সফরে প্রতিরক্ষা খাতে তুরস্কের যে সহযোগিতার প্রস্তাব এসেছে, তা বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। এই সহযোগিতা অনেকের কাছে পছন্দ না-ও হতে পারে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো বিদেশী শক্তির চোখ রাঙানি আমলে নেয়ার সুযোগ নেই। নিজেদের সীমানা এবং স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ কাকে বন্ধু হিসেবে বেছে নেবে, তা সম্পূর্ণ ঢাকার নিজস্ব সার্বভৌম এখতিয়ার।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর প্রতিরক্ষা খাতে যে নতুন অংশীদারত্বের ইঙ্গিত দিয়েছে, তাকে পূর্ণ শক্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। একটি আধুনিক, শক্তিশালী এবং ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের মর্যাদা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারব। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে এ স্বাধীন ও সাহসী পররাষ্ট্রনীতি হোক ভবিষ্যৎ পথচলার ভিত্তি।



