নবায়নযোগ্য জ্বালানি এই মুহূর্তে বিশ্বের প্রায় সব দেশে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, পরিবেশ সুরক্ষার দিক থেকেও এ খাতের গুরুত্ব সর্বোচ্চ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৃতি থেকে আহরিত হয়। ফলে এর উৎস অনিঃশেষ। এর চেয়ে সুলভ ও স্থায়ী আর কোনো উৎস নেই; যা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু এই খাতের উন্নয়নে সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না; বরং অভিযোগ উঠেছে, সরকার এ খাত নিয়ে রীতিমতো উল্টো পথে হাঁটছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে, পুরো পৃথিবী যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উৎসাহ দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ সরকার হাঁটছে উল্টো পথে। জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে শুল্ক, অর্থ বরাদ্দ ও ভর্তুকিতে কিভাবে বৈষম্য করা হচ্ছে, তা উদাহরণসহ দেখিয়েছে সিপিডি। দাবি তোলা হয়েছে, সবুজ জ্বালানি তথা দূষণহীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বাজেট প্রণয়নের।
বিশ্বের দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি বর্জন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও পানির উৎস থেকে জ্বালানি উৎপাদনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে। সবচেয়ে এগিয়ে চীন। এ খাতে গোটা বিশ্বে যত অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে এর ৪৪ শতাংশ একাই করছে চীন। ফলে বিশ্বে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের এক-তৃতীয়াংশই (৩২ শতাংশ) উৎপাদন হয় চীনে। ইরান যুদ্ধে বিশ্ব যখন জ্বালানি সঙ্কটে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে চীন নিজের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান অবস্থা আশাব্যঞ্জক না হলেও সম্ভাবনা আছে যথেষ্ট। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে মাত্র এক হাজার ৭৮১ মেগাওয়াট, যা আমাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার সাড়ে ৪ শতাংশের মতো। এর প্রায় পুরোটা আসে সোলার প্যানেল থেকে। জলবিদ্যুৎ এবং বায়ুশক্তি এখনো সেভাবে ব্যবহার করা যায়নি। অথচ বাংলাদেশ সরকারের ‘সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা’ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ (যা ২৪ হাজার মেগাওয়াটের সমান) নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় এ লক্ষ্য অবাস্তব মনে হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রতি সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের যে অভিযোগ, তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে দেশ কেবল পিছিয়ে পড়বে। জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা থেকে যাবে সুদূরপরাহত।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন করে না, যা বায়ুদূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা কমায়। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে একসময় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটি যত দ্রুত সম্ভব করা জরুরি। কারণ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারলে তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। তাতে অর্থনীতিতে গতি আসবে।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। এ জন্য সবার আগে চাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সরকার চাইলে এই খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ কঠিন হবে না।



