জনপ্রশাসনে এখনো অসন্তোষ

কর্মকাণ্ড গতিহীন না হয়

জনপ্রশাসনের কাজে স্থবিরতা থাকলে দৈনন্দিন কার্যক্রম কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এক পর্যায়ে সরকারই অচলাবস্থায় পড়ার উপক্রম হবে। এমনকি ১৯৯৫-৯৬ সালের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হলেও অবাক হওয়ার কারণ থাকবে না।

জনপ্রশাসনে এখনো অসন্তোষ রয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে শূন্যতা যেমন আছে, তেমনি আছে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে নানা অসঙ্গতি। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রায়ই অদক্ষতা ও উদাসীনতার চিত্র স্পষ্ট। অনেকে পদায়ন পেলেও পরক্ষণে সে আদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অনেকে নতুন পদে যোগ দিতে পারছেন না অথবা যোগদানে বাধা দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে যেসব খবর আসছে তাতে প্রশাসনে শৃঙ্খলার অভাব ফুটে ওঠে। গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, প্রায় তিন মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীর সচিব পদ শূন্য। নিয়োগ পেয়েও যোগ দিতে পারছেন না সচিবরা। বিভিন্ন দফতর-অধিদফতরে ডিজি নিয়োগ হলেও পরক্ষণে সে আদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। মাঠপ্রশাসন থেকে প্রত্যাহার করা সাবেক ডিসিদের অনেকের পোস্টিং আটকে গেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রশাসনে এখনো শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়নি। এমন বাস্তবতায় প্রশাসনের কাজে কোনোভাবে গতি ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। এর অর্থ, জনপ্রশাসনের কাজে এক ধরনের গতিহীনতা বিরাজমান। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের নিষ্পেষণে দেশের আর্থসামাজিক ভিত ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সেখান থেকে উত্তরণে নতুন নির্বাচিত সরকারের যখন পূর্ণোদ্যমে জাতি পুনর্গঠনের কাজে প্রয়াস চালানোর কথা, তখন প্রশাসনে স্থবিরতা উদ্বেগের বিষয়। কারণ, প্রশাসনের সহায়তা ছাড়া সরকারের পক্ষে কোনো কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আমলাতন্ত্রের জন্মই হয়েছে সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সাহায্যকারী হিসেবে।

আমলাদের নিয়ে বিশেষ করে বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। আমলারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন, চাকরির শর্ত ভেঙে রাজনৈতিক মঞ্চে উঠেছেন, এমনকি সরকার পতনের মতো গর্হিত অন্যায় কাজে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। সরকারের দুর্বলতায় আমলাতন্ত্র রাজনৈতিক সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান সরকারের শিক্ষা নেয়ার দরকার আছে।

মনে রাখতে হবে, ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী আদর্শে বিশ্বাসী দল আওয়ামী লীগ প্রশাসনে যে নির্বিচার দলীয়করণ করেছে সেই অযোগ্য, অথর্ব আওয়ামী অনুগত আমলারা এখনো প্রশাসনে বহালতবিয়তে আছেন। চব্বিশে হাসিনা সরকারের পতনের পর সুযোগ ছিল আমলাতন্ত্রে বড় সংস্কারের। কিন্তু নানা চাপে সে দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকার নেয়নি অথবা নিতে চায়নি। চাপ কেবল আমলাতন্ত্র বা অরাজনৈতিক মহল থেকে ছিল না। বিস্ময়কর হলেও সত্য, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

সংশ্লিষ্ট জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, প্রশাসনে শৃঙ্খলা বিনষ্টের জন্য পরোক্ষে আমলাদের একটি অংশ সক্রিয়। বিশেষ করে আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা ভোল পাল্টে বিএনপির বেশ ধারণ করলেও গোপনে সরকারের কাজে বাধার সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সুতরাং, এ মুহূর্তে প্রশাসনে যেসব কারণে অসন্তোষ বিরাজ করছে সেগুলো আমলে নেয়া দরকার। সতর্কতার সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

জনপ্রশাসনের কাজে স্থবিরতা থাকলে দৈনন্দিন কার্যক্রম কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এক পর্যায়ে সরকারই অচলাবস্থায় পড়ার উপক্রম হবে। এমনকি ১৯৯৫-৯৬ সালের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হলেও অবাক হওয়ার কারণ থাকবে না।