২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১, ১৩ শাওয়াল ১৪৪৫
`

জিয়াউর রহমান, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার

- ছবি : সংগৃহীত

বস্ত্রহীন মাছ ধরার জাল দিয়ে লজ্জা নিবারণের চিত্র, রাস্তায় আসা-যাওয়া করতে থাকা আঞ্জুমান মফিদুলের লাশ কুড়ানো গাড়ি, হাড্ডিসার রুগ্ন অপুষ্ট শিশু ও বৃদ্ধা, স্ট্রেচারে লাশের স্তুপ, সৎকারের কাজে ছুটে বেড়ানোর ব্যস্ততা। সময়কাল ১৯৭৪। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুঃস্বপ্নময় একটি বছর। এ বছরই বাংলাদেশে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সে সময় আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম প্রতিদিন শুধু ঢাকা শহর থেকেই আনুমানিক ৩০-৪০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করত। ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় তিন-চারজন লোক মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হতো অনাহারে। একপর্যায়ে মৃত্যু ও লাশ দাফনের সংখ্যা খবরের কাগজে প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়া হয় সরকারি আদেশে। ক্ষমতায় থেকেও দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে না পারার ব্যর্থতা থেকে মুক্তি পেতে হয়তো পদত্যাগ করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এবং পদত্যাগের দিনটিকে ‘অত্যন্ত পবিত্র’ বলে সম্বোধন করেছিলেন তিনি।

মূলত সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বন্যা, অপ্রতুল খাদ্য উৎপাদন, ভারতে খাদ্যশস্য ও পণ্যসামগ্রী পাচার, কূটনৈতিক ব্যর্থতা, রফতানিনির্ভর অর্থনীতি, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদি ছিল দুর্ভিক্ষের মূল কারণ। নড়বড়ে অর্থনীতি, একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানে টালমাটাল পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালে ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আবিভূত হন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পরিক্ষিত দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভুলণ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে ফিরিয়ে আনতে দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ব্যক্তিজীবনে ও কর্মজীবনে নিজ নিজ স্থানে অর্জিত কৃতিত্ব, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সম্মিলনে রসায়নের দ্রবীভূত মিশ্রণ তাকে ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ববান রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দান করে। মার্জিত রুচিবোধ, সুশৃঙ্খল জীবনাচরণ, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, বীরত্বখচিত ইতিহাস, দুর্নীতিমুক্ত কর্মজীবন, পরিছন্ন ভাবমর্যাদা, হালের ফ্যাশনবোধ তাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এশিয়ায়, মুসলিম বিশ্বে তথা পাশ্চাত্য ও আমেরিকার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তথাকথিত তলাবিহীন ঝুড়িখ্যাত রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে জিয়াউর রহমান সব রকম সফল উদ্যোগ নেন।

রাষ্ট্রের অবশ্যম্ভাবী যেসব স্তম্ভের একটি ছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রের পথচলা সম্ভব নয় তেমন কয়েকটি অত্যাবশ্যকীয় স্তম্ভের বেড়ে ওঠার গতির দিকে আলোকপাত করলেই অনুভূত হবে আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুননের কাঠামোগত বাস্তবিক প্রয়াস।
আধুনিক রাষ্ট্র গঠন একজন চৌকস রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া সম্ভব নয়। সুতরাং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান চৌকস ছিলেন কি না সে সম্পর্কে প্রথমে জানা দরকার। জিয়াউর রহমান সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য কয়েকটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ঐতিহাসিকভাবে তার স্মার্টনেসের সাক্ষী দিয়ে থাকে। জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনাচরণ নিয়ে বিশ্বের স্বনামধন্য দৈনিক ‘The Washington post’ তার প্রতিবেদন Zia Has Reputation as Bangladesh No. ১. ‘Motivator’ শিরোনামে (March 28, 1981) জিয়াউর রহমানের পরিধেয় পোশাকের বিবরণীতে স্মার্টনেসের বিষয়টি ফুটে ওঠে ‘Slight of build and wearing bush jackets when he tours the countryside, Zia is a charismatic figure here. Dressed in conservatively cut suits and neat striped shirts.’ জিয়া ছিলেন একজন সহজাত দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি, তিনি যখন গ্রাম্য এলাকায় সফর করতেন তখন তিনি হালকা পরিবর্তিত বুশ জ্যাকেট (a belted, hip-length, shirtlike jacket, usually with four patch pockets and a notched collar) মার্জিত সেলাইকৃত স্যুট ও পরিছন্ন ডোরাকাটা জামা পরিধান করতেন।

একই প্রতিবেদনে জিয়াউর রহমানের জীবনযাপন সম্পর্কে বর্ণনায় উঠে আসে তার সাধারণ ও জীবনযাপনের কথা ‘Zia lives quietly in a small house he occupied as a general in the military area of Dacca. He works hard, from 7:30 in the morning until about 1:30 the next morning, his aides say. He normally eats frugally-a chappati (fried for dinner and sandwiches for lunch bread) and a bit of curry.’ জিয়া অপেক্ষাকৃত ছোট বাসায় থাকতেন যেটি তিনি সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় বরাদ্দ পেয়েছিলেন। তিনি কঠিন পরিশ্রম করতেন, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে কাজ শুরু করে পরদিন মধ্যরাত (দেড়টা) পর্যন্ত করতেন। তিনি সাধারণত খাদ্য গ্রহণে মিতব্যয়ী ছিলেন, তিনি সকালে একটি চাপাতি রুটি, রাতে হালকা একটি তরকারি এবং দুপুর স্যান্ডউইচ খেতেন। স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক অপর এক দৈনিক ‘Economic Hope for Bangladesh’ শিরোনামে ১০ অক্টোবর, ১৯৭৬-এ জিয়াউর রহমানের শারীরিক গঠনের প্রশংসা করে ‘The 40©\year©\old soldier is an impressive man, if only because he has a disciplined flat stomach rather than the wellrounded pot bellies that many Bengalis acquire when they achieve the privileges of the middle class.’ সাধারণত বলেন অনেক বাঙালিরা যখন মধ্যম শ্রেণীর মর্যাদা অর্জন করে থাকে তখন তাদের একটি গোলাকার পটাকৃতির ভুঁড়িওয়ালা পেট দেখা গিয়ে থাকে, যেটি তার ছিল না, তার নিয়মানুবর্তী সমতল পেটের জন্য তিনি অন্যদের থেকে আকর্ষণীয় ছিলেন। তার ব্যবহৃত রোদচশমা এখনো স্মার্টনেসের অনুষঙ্গ হিসেবে ঐতিহাসিক আবেদন ধরে রেখেছে।

স্বনির্ভর অর্থনীতি রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ। সমৃদ্ধ অর্থনীতি ছাড়া স্বাবলম্বী রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। স্বাবলম্বী অর্থনীতি তৈরি করতে মূলত প্রয়োজন একটি সম্মিলিত অর্থনৈতিক চিত্র। রাষ্ট্রের অর্থনীতির ব্যাপ্তি সামগ্রিক বিষয়াদি নিয়ে পরিবেষ্টিত। সর্ব ক্ষেত্রে সমান পরিচর্যা ছাড়া স্বনির্ভর অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হয়ে গড়ে ওঠে না। তিনি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য দৈনিক ‘The New York Times পত্রিকায় ‘Economic Hope for Bangladesh’ শিরোনামে ১০ অক্টোবর ১৯৭৬-এ প্রকাশিত জিয়াউর রহমানের স্মার্ট নেতৃত্বে বেড়ে ওঠা স্মার্ট অর্থনীতির অগ্রযাত্রা সার্ক বলেন ‘General Ziaur has organized a National Economic Council to make the most important decisions and encouraged the middle-and lower-ranking civil servants to make the less important decisions without referring them to the top’. তিনি অর্থনৈতিক কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করতেন এবং মধ্যম ও নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের অধিকতর কম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা না নিতে উৎসাহিত করতেন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী অর্থবছর জুনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশে উন্নীত করেন ১৯৭৪ সালে যেটি ছিল শতকরা ১.২ শতাংশ। বাংলাদেশের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’-এর অপবাদ ঘুচাতে ইতিবাচক ভাবমর্যাদা তৈরি করতে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রচারণা চালান। তিনি বাংলাদেশের ইতিবাচক অর্থনৈতিক ভাবমর্যাদা ফিরিয়ে আনতে বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই ভিক্ষুক না, তবে কেন আমরা ভিক্ষা করব? আমাদেরও বিনিময়ের কিছু আছে।’

অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন উদ্যোক্তা তৈরি, শ্রমবাজার তৈরি, উৎপাদন ও উপযোগিতা, আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারে প্রবেশ এবং উৎপাদিত পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা। উদ্যোক্তা তৈরি করতে তিনি ব্যাপক প্রচার অভিযান চালান, বাণিজ্যিক উদারনীতির প্রতিষ্ঠা করতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের তহবিল প্রদান করেন, প্রথম আন্তর্জাতিক ব্যাংক ‘ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক’ ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন। বন্ধ পুঁজিবাজার আবার চালু করেন। পাবলিক বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা বিলুপ্ত করেন। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য ১৯৭৭ সালে জাতীয় রফতানি পুরস্কার প্রবর্তন করেন। শ্রমবাজার তৈরি করতে সক্ষম হন। ১৯৭৬ সালে দক্ষ শ্রমবাজার তৈরি করতে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে অনুমতি দেন জনশক্তি রফতানিতে। চার বছরে ৬০ হাজারের বেশি দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণ করেন, যাদের কারণে বৈদেশিক রিজার্ভ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ট্রেডমার্ক তৈরিতে সক্ষম হন এবং বাংলাদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক রফতানি শুরু করেন। পোশাক শিল্পের সূচনার মাধ্যমে প্রথম RMG সেক্টরের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশের প্রথম পোশাক শিল্পকারখানার নাম ‘দেশ গার্মেন্টস’। দক্ষিণ কোরিয়ার Daewoo কোম্পানি প্রথম পোশাক শিল্পে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে এবং ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের প্রথম ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে। তিনি Back to Back Letter of Credit সেবা চালু করেন এবং বন্ডেড গুদামের বিধান চালু করেন। ট্যানারি, হস্তশিল্প, পাট পণ্য, হিমায়িত পণ্য রফতানিতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন, যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। বৈদেশিক রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করে। সবুজায়নের উদ্দেশ্যে খরা ও বন্যার হাত থেকে কৃষিকে রক্ষা করতে সারা দেশে খাল খনন করেন। ইরি ধানের প্রথম প্রচলন তিনি করেন যার ফলে কৃষক পূর্বের থেকে দ্বিগুণ বা তিনগুণ ধান পেতে থাকেন।

নিম্নে World Bank এর প্রকাশিত সময়কাল হিসেবে তুলনামূলক শতকরা প্রবৃদ্ধির ছক উদ্ধৃত করা হলো। যেখানে স্পষ্টতভাবে প্রতীয়মান যে, জিয়াউর রহমানের সময়কালে (১৯৭৫-৮০) বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি মানদণ্ড উৎপাদন, কলকারখানা ও কৃষিতে স্বাধীন বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতির অগ্রযাত্রা শুরু হয়।
Table : East Pakistan/ Bangladesh Growth Trends 1965 - 1985

                     Manufacturing      Industry               Agriculture
1965 - 1970   5.3                       7.7                       2.8
1970 - 1975   9.8                       Na                       Na
1975 - 1980   5.1                       5.9                       3.3
1980 - 1985   4.5                       5.5                       2.8
Sources : Lewis (1969; Table 1) world bank ( 2008,2012); Na = Figures not available

গুড গভর্নেন্স রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম অনুসঙ্গ। জনসম্পৃক্ত ও বৈষম্যহীন সরকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল জিয়াউর রহমানের সময়কালে। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানিকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি Jimmy Carter (২৭ আগস্ট, ১৯৮০) অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বীকৃতি প্রদান করে তার বক্তৃতায় বলেন ‘The open process which resulted in the election of the world President Ziaur has been an inspiration to and free election.’ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছ ফলাফল, বিশ্ববাসীর কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। বাকশালের মাধ্যমে খর্বকৃত ভোটাধিকার জনগণের মধ্যে ফিরিয়ে দেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল তথা একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। তারই ধারাবাহিকতায় মাত্র ৪টি সরকারি পত্রিকা রেখে সব পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেন। জিয়াউর রহমান সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল প্রথা বাতিল করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। গণমাধ্যমের ওপর থেকে সব কালাকানুন প্রত্যাহার করে মুক্ত স্বাধীন গণমাধ্যম চালু করেন।

দৃঢ় প্রশাসক হিসেবে তিনি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তার পদচিহ্ন অঙ্কিত হয়নি এমন কোনো জনপদ ছিল না। তিনি স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য গ্রাম্য বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে কার্যকরী মন্ত্রিসভা প্রতিষ্ঠা করেন, যা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। তিনি জাত-কুল, ধর্ম-বর্ণ, ভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে এক ও অভিন্ন পরিচয় দান করতে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ প্রতিষ্ঠা করেন।

আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য তিনি অভিজ্ঞ বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতেন।

আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি স্বাস্থ্যখাতে প্রতিষোধক টিকা ও জন্ম নিয়ন্ত্রণে প্রচার অভিযান চালিয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি কমাতে ভূমিকা রাখেন। পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিয়োগ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। স্বল্প নগদ প্রণোদনার মাধ্যমে বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতি প্রচার করে থাকেন। জাতীয় শিশু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় পঙ্গু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। নবজাতকের ছয়টি ভ্যাকসিন বিসিজি, ডিপিটি, ওপিডি, টিটি, হাম প্রদানের কর্মসূচি চালু করেন; যার ফলে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

বাংলাদেশ প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করে জিয়াউর রহমানের আমলে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার একটি রাষ্ট্রকে গতিশীল করতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। জিয়াউর রহমানের সময়কালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় গঠন হয়। তথ্য প্রযুক্তির উন্নতি সাধনে কারিগরি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা চালু করেন তিনি।

বিদ্যুতায়ন একটা রাষ্ট্রের অন্যতম চালিকাশক্তি। বিদ্যুতের প্রাতিষ্ঠানিক সরবরাহ করার লক্ষ্যে এবং বাংলাদেশের সব জেলা-উপজেলায় বিদ্যুৎসেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং ১৯৭৮ সালে REB প্রতিষ্ঠা করেন।

বৈদেশিক শ্রমবাজার তৈরিতে তার কূটনৈতিক সাফল্যের বিষয়টি উঠে আসে। তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিকট সমতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানি বণ্টন করতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার আহ্বান জানান এবং স্থলসীমান্ত, সমুদ্রসীমানা ইত্যাদি অমীমাংসিত ইস্যুতে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

তিনি চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর পুনঃগঠনের কাজ সম্পন্ন করেন। জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৮ সালে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল জাপানকে ভোটে হারিয়ে। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশ নিয়ে আঞ্চলিক জোট গঠন করেন, যা সার্ক নামে পরিচিত। জিয়াউর রহমান তার স্মার্ট পররাষ্ট্র নীতির কারণে অতি অল্প সময়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রশংসা অর্জন করেন। The New York Times (June 7, 1978) জিয়াউর রহমানের প্রশংসায় শিরোনাম করেন ‘Bangladesh's Soft-Spoken but Strict President’ মৃদুস্বর কিন্তু নিয়মানুবর্তী রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের।
এক কথায় স্বনির্ভর ও বুদ্ধিদীপ্ত রাষ্ট্রের নবযাত্রা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই শুরু হয় এবং তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্বীকৃত।
লেখক : স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা


আরো সংবাদ



premium cement