১২ মে ২০২১
`

ধর্ষণের প্রতিযোগিতা, বিবস্ত্র বাংলাদেশ

-

সম্প্রতি ফেসবুকে চলমান ঘটনা নিয়ে কিছু মানুষের মন্তব্য ছিল এ রকম- থামাও ধর্ষণ, ফেরাও আইনের শাসন, চাই গণতন্ত্র, চাই সুশাসন, আরেকজনের মন্তব্য- ওই মা উলঙ্গ হননি, উলঙ্গ হয়েছে আইন, উলঙ্গ হয়েছে সরকার, উলঙ্গ হয়েছে বাংলাদেশ। আগে ভেবেছিলাম আমরা শুধু ভোটাধিকার হারিয়েছি। এখন দেখছি সম্ভ্রম হারিয়েছি। নৈতিকতার গুণগুলো এখন ওজনে হালকা আর ভারী হচ্ছে অনৈতিকতার গুণগুলো। ফেসবুকে একজন কমেন্ট করেছেন বাংলাদেশে ধর্ষণ তো ওই দিন থেকে বন্ধ হবে যে দিন বাংলাদেশের মন্ত্রী- মিনিস্টারের মেয়েরা ধর্ষিত হবে, ঠিক সেই দিনই ধর্ষণ বন্ধ হবে। দুঃখজনক এমন বাংলাদেশ মনে হয় স্বাধীনতার পরে আর কেউ দেখেনি। দেশে বর্বরতা অনৈতিকতা এতটাই বেড়েছে যা ’৭১ এ হানাদার বাহিনীর বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়েছে। দেশ পরিচালনা করার দায়িত্ব যারা যেভাবে পান তা কার্যকর করার ক্ষমতা তাদের থাকে না, কারণ তারা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার নন। সেহেতু সেই সরকারের দায়বদ্ধতাও জনগণর কাছে থাকে না। যত দিন পর্যন্ত দেশে নির্বাচিত সরকার না আসবে তত দিন পর্যন্ত দেশের কদর্য রূপ আমরা শুধু দেখতেই থাকব। ক্ষমতাসীনরা অনবরত বলতে থাকবে অপরাধ যারা করে তাদের কোনো দল নেই- এসব মুখরোচক কথা কবিতার আবৃত্তির মতো টকশো এবং সংবাদ সম্মেলনে বলা পর্যন্তই শেষ, বাস্তবে তা কখনো রূপ নেবে না।

মজলুম মানুষের ফরিয়াদ- হে আল্লাহ তোমার গজব দাও, আদ ও সামুদ জাতির মতো আমাদের ধ্বংস করে দাও, না হয় সত্য-ন্যায়ের এক সৎ সাহসী ঈমানদার মুমিন মুত্তাকির নেতৃত্ব দাও যে সব আবর্জনা নিশ্চিহ্ন করে সুপথ দেখাবে এবং সেই দিনই আমাদের নষ্টদের দৌরাত্ম্য চিরতরে শেষ হবে। সাড়ে ১৪০০ শ’ বছর আগে ছিল আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ যা এখন আমরা চর্মচোখে দেখছি। এই পরিণতির দিকে তুমি আমাদের নিয়ে যেও না। তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা করো এবং আমাদের মুক্তির ফয়সালা করে দাও। তোমার রহমত আমাদের গুনাহর চেয়ে অনেক বড়। তোমার রহমত দিয়ে আমাদের পাপ মোচন করো। আমরা বড়ই অসহায়। তোমার সাহায্য ছাড়া চলমান সঙ্কট থেকে আমরা মুক্তি পাবো না। স্বীকার করে নিচ্ছি আমরা গোনাহগার, তারপরও তোমার রহমতের দিকে তাকিয়ে আছি। তুমি আমাদের ক্ষমা করো প্রভু। আইন সালিশ কেন্দ্র (আসক) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন ১/১০/২০২০ বিগত ৯ মাসে ৯৭৫টি ধর্ষণ, গণধর্ষণ ২০৮, এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৩ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী। তারা এও বলেছেন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আজ ধর্ষণের ভয়াবহতা এবং নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় দেশটা ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে আর এখন দেশ চলে গেছে চরিত্রসীমার নিচে।

পত্রপত্রিকায় অনেক কিছুই লেখা হয়। যেমন, পেঁয়াজ ছাড়াও রান্না হয়, বাবা ছাড়াও সন্তান হয়, অপরাধ ছাড়াই জেল হয়, রডের বদলে বাঁশ হয়, ভোট ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী হয়, উচিত কথা বললে গুম হয়, প্রতিনিয়ত ধর্ষণ হয়। হ্যাঁ, এটা আমাদের বাংলাদেশ।

১ অক্টোবর ২০২০ বিবিসি নিউজ বাংলা এক রিপোর্টে বলেছে, গত সপ্তাহে সিলেটের মুরারি চাঁদ কলেজ এলাকায় স্বামীর সাথে বেড়াতে গিয়ে একজন নারী গণধর্ষণের শিকার হন। এই সংবাদ সারা বাংলাদেশের মানুষকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিবিসির কাছে চিঠি লিখেছেন- এমন কিছু মানুষের মন্তব্য তুলে ধরছি। ‘এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনার সাথে যুক্তদের দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধী হিসেবে যথাযথ বিচারের সম্মুখীন করা হোক।’ এর সঠিক জবাব দিতে গিয়ে বিবিসি বলছে, বর্তমানে যেভাবে তদন্ত এবং বিচার হয়, তাতে নারীরা অভিযোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে উৎসাহী হন না। এর ফলে বেশির ভাগ ধর্ষণের ঘটনার কোনো বিচারই হয় না। সিলেটের ঘটনা ঘটেছে শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। বিবিসি তাৎক্ষণিকভাবে রিপোর্টটি করতে না পারার কারণে বিবিসির দর্শক- শ্রোতারা অভিযোগ তুলে ধরেন সম্পাদক বিবিসি নিউজ বাংলার কাছে। আমরা মনে করি ছোট-বড় সব নারীর সম্মান রক্ষা করা সমাজে নৈতিক দায়িত্ব এবং নারীর ওপর সহিংসতা বন্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনার সাথে যুক্তদের দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধী হিসেবে যথাযথ বিচারের সম্মুখীন করা হোক। চার দিকে যে লোমহর্ষক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, এতে জোর দিয়ে বলতে পারি যে নারীরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। এমনকি তার স্বামী ও তার নিজের বাবা-মার কাছে থেকেও সে নিরাপদ নয়। এর জন্য আমি এ দেশের বিচারব্যবস্থাকে দায়ী করব। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও সঠিক শাস্তি না হওয়ায় দিন দিন কদর্য ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার মতে ধর্ষণের বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করে এবং দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে উন্মুক্ত স্থানে তার শাস্তি কার্যকর দরকার। তাহলে এ দেশে আর কোনো ধর্ষণকারী থাকবে না।

দেশে কী পরিমাণ ধর্ষণ বেড়েছে দুই দিনের একটি চিত্র এখানে তুলে ধরছি- নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের মধ্যেও সারা দেশে থেমে নেই ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনা। ৪ অক্টোবর রোববার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত শিশুসহ ১১ জন ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে শনিবার ৩ অক্টোবর পাঁচ নারীকে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়। এ নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে সব মহলে। সোমবার ৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে নারীকে দলবেঁধে ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। এ দিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মাদরাসাছাত্র (১১) এবং বন্দরে কিশোরীকে ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। একই দিন সাভারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কুষ্টিয়ায় ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে মাদরাসা সুপারের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া রোববার জয়পুরহাটে ১১ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। একই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। ৪ অক্টোবর রোববার রাতে সিলেট নগরীতে এক গৃহবধূ ধর্ষণের শিকার হন। ৩ অক্টোবর শনিবার রাতে গাজীপুর নগরীর কাশিমপুরে সাড়ে তিন বছরের শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। একই রাতে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ধর্ষণের শিকার হয় আরেক স্কুলছাত্রী। এ ছাড়া বগুড়ার শিবগঞ্জে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুরকে গ্রেফতার করা হয়েছে (সূত্র দেশ রূপান্তর ৬-১০-২০২০)। ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের আইনগত সহায়তা দেয়া বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র। সংস্থাটির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে ১৪১৩টি। তার আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। তারা বলেছে, ধর্ষণের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাকে কুমিল্লায় সেনানিবাস এলাকায় সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার তিন বছরেও বেশি সময় পার হলেও এখনো তদন্তেরই অগ্রগতির কোনো খবর মেলেনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কর্মকর্তা নীনা গোস্বামী বলেছিলেন- ধর্ষণের কোনো ঘটনা নিয়ে তোলপাড় না হলে সেটির তদন্ত থেকে শুরু করে সব কিছুই ধীরে চলে এবং সে কারণে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। ‘নুসরাত হত্যার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলে প্রধানমন্ত্রী যখন নির্দেশনা দেন, তখন এ বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। কিন্তু সব মানুষেই রাষ্ট্রের, সবার জন্যই একইভাবে আইনি প্রক্রিয়া এগোনো উচিত। শুধু একটা মামলা কোনো উদাহরণ হতে পারে না।’ আইনজীবী এবং নারী সংগঠনগুলো বলছে, অনেক ধর্ষণকারীর বিচার না হওয়ার ক্ষেত্রে দুটো বিষয় উল্লেখ করার মতো। প্রথমত, আদালতে তথ্য-প্রমাণ ঠিক মতো উপস্থাপন না করা, অন্য দিকে, মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে পরিবারের অনাগ্রহ, বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ বলছে, তারা এক গবেষণার অংশ হিসেবে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। এ গবেষণাটির পরিচালক এবং নারী পক্ষের প্রকল্প পরিচালক রওশন আরা বলেন, এই সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচজনের।

শুধু ধর্ষণ নয় যেকোনো যৌন হয়রানির মামলা লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে থানা পুলিশের অনাগ্রহ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ আছে। ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে মারার আগে নুসরাত জাহান যখন থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন, তখন সেখানে তিনি কী ধরনের হেনস্তার শিকার হন সেটি এখন কারো অজানা থাকার কথা নয়। যখন মামলা গ্রহণ করা হয় এরপর সেটির তদন্তের প্রশ্ন আসে। থানা পুলিশের বাইরেও পুলিশের একটি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে, সেখানে এসে নারীরা সহায়তা চাইতে পারেন। পুলিশ যেভাবে অভিযোগপত্র দাখিল করবে সেভাবেই বিচারপ্রক্রিয়া এগোবে এবং এখানেই ধর্ষণ মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে বলছেন ঢাকার পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের উপকমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন। ‘রেপ ভিকটিমের জন্য সবচেয়ে বড় সাজা হচ্ছে তার বায়োলজিক্যাল এভিডেন্স। অনেকসময় বায়োলজিক্যাল এভিডেন্সগুলো তাৎক্ষণিকভাবে প্রিজারভড (সংরক্ষণ) করা হয় না। এটা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলেছেন ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি এ-ও বলেন, অনেকসময় ডিএনএ টেস্টের ফলাফল দেরি করে আসে। সে জন্য তদন্তপ্রক্রিয়া ধীর গতির হয়। ধর্ষণকারী কেন পার পেয়ে যাচ্ছে এ প্রসঙ্গে নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে, তার সামান্য অংশই আইন আদালতের সামনে আসে। মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেছেন, বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এমন একধরনের মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যেকোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে তার ওপরই অনেকে দোষ চাপানোর চেষ্টা করে। এই পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য অনেকে মামলাও দায়ের করতে চান না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির। একটি প্রশ্ন থেকেই যায়- ছাত্ররা কেন ধর্ষণে নামবে কারণ তারা রাজনীতি, এই পরিচয়কে অপরাধের অস্ত্র ও শাস্তি ঠেকানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পায়। তারা মনে করে, পুলিশ, আইন, বিচার প্রভৃতি সব কিছুই তাদের ক্ষমতার কাছে নতজানু। বেপরোয়া ও মাসল পাওয়ার দেখানোর আরো নেপথ্য কারণ আছে। তালিকা লম্বা করে লাভ নেই। ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর ছাত্রসংগঠনের ধর্ষণকাণ্ড লিখতে গেলে কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়ে যাবে। ধর্ষণজনিত ঘটনা বেশির ভাগই খবরে আসে না। ধর্ষণের শিকার নারীরা সাধারণত ভয়েই ঘটনা প্রকাশ করেন না। সর্বশেষ বলব আমরা অপরাধীদের শাস্তি দৃশ্যমান দেখতে চাই।

লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক



আরো সংবাদ