১৬ জুন ২০২৪
`

তিস্তার আরো পানি নিতে পশ্চিমঙ্গে দুটি খাল খননের উদ্যোগ

তিস্তার আরো পানি নিতে পশ্চিমঙ্গে দুটি খাল খননের উদ্যোগ - ছবি : সংগৃহীত

তিস্তার পানি আরো সরিয়ে নিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহার করবে পশ্চিমবঙ্গ। দুটি নতুন খাল খনন করে এই পানি নেয়া হবে বলে জানিয়েছে দ্য টেলিগ্রাফ। খাল খনন করতে পশ্চিমবঙ্গ সেচ বিভাগ এক হাজার একর জমি বুঝে পেয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।

ভারতীয় এ সংবাদমাধ্যমের খবরে আরো জানানো হয়, পানি সরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও কোচ বিহারের আরো কৃষিজমি সেচের আওতায় আনা হবে।

খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সেচমন্ত্রী পার্থ ভৌমিকের উপস্থিতিতে জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন প্রায় এক হাজার একর জমি সেচ অধিদফতরের কাছে হস্তান্তর করেছে। এই জমি তিস্তার বাম তীরে দুটি খাল খননের কাজে ব্যবহার করা হবে। এছাড়া জলপাইগুড়ি জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আরেকটি নদী জলঢাকা থেকে পানি সেচের জন্য খালের দিকে প্রবাহিত করা হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে বাংলাদেশে তিস্তার পানি-প্রবাহ আরো কমে যাবে। তারা মনে করেন, ভারত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করছে। দুই দেশের সম্পর্কে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের খবরে প্রকাশ, তিস্তা ও জলঢাকা থেকে পানি নেয়ার জন্য কোচবিহার জেলার চ্যাংড়াবান্ধা পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। তিস্তার বাম তীরে ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘের আরেকটি খাল খনন করা হবে। এর ফলে সেখানকার প্রায় এক লাখ কৃষক সেচের সুবিধা পাবেন।

জলপাইগুড়ি জেলার জলডোবায় তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পটি ১৯৭৫ সালে ভারতের উত্তরাঞ্চলের ৯.২২ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে চালু করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল তিস্তা থেকে নদীর দুই তীরের খালের মাধ্যমে পানি পাঠানোর। পথে খালগুলো সেই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্যান্য নদী থেকেও পানি পাবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে এখন ১.০৪ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের সেচমন্ত্রী শুক্রবার বলেছেন, ‘জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন খাল খননের জন্য আমাদের কাছে এক হাজার একর জায়গা হস্তান্তর করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার (২০০৯ সালে) এটিকে একটি জাতীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করেছিল, কিন্তু তহবিল সরবরাহ করেনি। তহবিল না পেলেও আমরা পর্যায়ক্রমে কাজ (খালের নেটওয়ার্ক তৈরি) শেষ করার চেষ্টা করবো।’

২০ বছরেরও বেশি সময় পর তিন্তা ব্যারাজ প্রকল্পের অধীনে নতুন খাল খনন করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধাস্ত বাংলাদেশের জন্য আরো বেশি ক্ষতির কারণ হবে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে নয়া দিল্লি ও ঢাকা তিস্তার পানি ভাগাভাগির জন্য চুক্তি করতে পারেনি।

বাংলাদেশের জলবায়ু ও নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘এটা তাদের ৬০ বছর আগের পরিকল্পনা। সেটাই তারা বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে আমরা পানির অভাবে আরো মরবো। তারা যত পানি তুলবে আমাদের তত ক্ষতি হবে। এখন আমাদের কান্নাকাটি করা ছাড়া আর কী উপায় আছে? আমাদের কী করার আছে? যা করার সরকারকে করতে হবে।’

তার কথা, ‘তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে দু’দেশের মধ্যে বর্তমানে যে দ্বন্দ্ব আছে তার মধ্যে ভারতের এই প্রকল্প অনেকটা আগুনে ঘি দেয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি করবে। এখন কতগুলো প্রশ্ন আছে।’

প্রথম প্রশ্ন কোন সময় তারা পানি প্রত্যাহার করবে? শুকনো মৌসুমে তারা পুরো পানি প্রত্যাহার করলে সেই পানি নেয়ার প্রশ্ন আসে না, কারণ পানি তো শুকনো মৌসুমে নেই!

দ্বিতীয় প্রশ্ন, তিস্তা অববাহিকায় বাংলাদেশ ও ভারতের যে দুটি ব্যারেজ প্রকল্প আছে, সেখানে পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে। তখন নদীতে কিছুটা পানি আসে, বাংলাদেশও কিছুটা পানি পায়। ভারত তার প্রকল্পের জন্য পুরো পানি প্রত্যাহার করার পরে তলানিটুকু বাংলাদেশ পায়। এখন সেই তলানি থেকে ভারত যদি আরো পানি প্রত্যাহার করে, তাহলে বাংলাদেশের আমন মৌসুমে মারাত্মক ক্ষতি হবে। রংপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট, অর্থাৎ তিস্তা প্রকল্পের এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মহানন্দা অববাহিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

শিলিগুড়ির উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের একজন শিক্ষক দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘এখন যখন সরকার সেচ নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, এটা স্পষ্ট যে তিস্তা থেকে আরো বেশি পানি নতুন খালের মাধ্যমে প্রবাহিত হবে। এর মানে হলো, শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য কম পানি পাওয়া যাবে।’

আর ভারতের পরিবেশবিদ ডক্টর দীপায়ন দে বলেন ‘যেকোনো নদীতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার পানি ধরে রাখতে হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘এনভায়রনমেন্টাল ফ্লো'৷ একাধিক বাঁধের কারণে তিস্তার পানি এমনিতেই তার নিচ দিয়ে বইছে। আবার দুটি খাল তৈরি হলে পানির স্তর আরো নিচে নেমে যাবে। কারণ, তিস্তার স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ করে ওই খাল কাটা হবে। এতে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং তিস্তার অবস্থা আরো খারাপ হবে।’

দীপায়ন আরো জানান, পাকিস্তানের সাথে ভারত সিন্ধু নদীর পানি ভাগ করে নেয়, সেক্ষেত্রে ভারতের পলিসি এক রকম, কিন্তু তিস্তার পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে ভারতের পলিসি ঠিক উল্টো। এর জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে কথা শুনতে হয়। নতুন দুটি খাল তৈরি হলে বাংলাদেশ আরো কম তিস্তার পানি পাবে। এতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের অবস্থান আরো খারাপ হবে। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে।’

বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইমামুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভারত এটা করতে পারে না। ১৯৯৭ সালের ওয়াটার কোর্স কনভেনশন অনুযায়ী আমরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, তার ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা ভারতের। তবে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হলে আবার এই কনভেনশন কার্যকর হয়। কিন্তু ২০১১ সাল থেকে আমাদের দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি নেই। কূটনৈতিক একটা আলোচনার মাধ্যমে এর একটা সমাধান হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি। নদীতে দুই দেশের ঐতিহাসিক অধিকার আছে। কিন্তু আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ভারত একতরফাভাবে তিস্তার পানি ব্যবহার করছে। তারা সব পানি টেনে নিয়ে যায়।’

তার কথা, ‘এই পানি পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও পাঠানো হচ্ছে। আমাদের এখন আরো জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। মমতা বলছেন সিকিমে পানি আটকে দেয়া হচ্ছে। সেটা তো সিকিম পারে না। কোথায় আটকে দেয়া হচ্ছে, তা আমাদের জানতে চাওয়া উচিত।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনরেল (অব.) শহীদুল হক মনে করেন, ‘এখন তিস্তা নিয়ে নতুন করে যা শোনা যাচ্ছে, এটা ভেরি আনফ্রেন্ডলি মুভ। এখন দেখার বিষয় এটা পশ্চিমবঙ্গ সরকার করছে, নাকি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার করছে। মমতার কারণে তো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিস্তা চুক্তি আটকে আছে। আমাদের দিক থেকে বিষয়টি কীভাবে অ্যাড্রেস করা হবে সেটা দেখার বিষয় আছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা ভারতকে অনেক কিছু দিয়েছি, কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো আমরা কী পেয়েছি? বন্ধুত্বের সম্পর্কটা তো গিভ অ্যান্ড টেকের ওপর হওয়া উচিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘তিস্তার মূল পরিবল্পনায় তো আমাদের এখানে জলাধার করার কথা ছিল। কিন্তু সেটা তো হয়নি। এখন চীনের সহায়তায় করার কথা হচ্ছে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। যদি তারা তিস্তার পানি আরো তুলে নেয়, তাহলে রংপুরসহ উত্তরে ফসলী জমি তো উসর হয়ে যাবে।’

গ্রীষ্ম মৌসুমে তিস্তায় এখন ১০০ কিউসেক (কিউবিক মিটার প্রতি সেকেন্ড) পানি পাওয়া যায় বলে বলা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা অস্বাভাবিক। উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণেই এমন হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশে কৃষিজমিতে সেচের জন্য প্রায় এক হাজার ৬০০ কিউসেক পানি প্রয়োজন। পানিসঙ্কট নিরসনে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সাথে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ।
সূত্র : ডয়চে ভেলে


আরো সংবাদ



premium cement