১৮ মে ২০২৪, ০৪ জৈষ্ঠ ১৪৩১, ০৯ জিলকদ ১৪৪৫
`


মিরসরাইয়ে অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে জমিদার প্রাসাদ

মিরসরাইয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত জমিদারবাড়ি : নয়া দিগন্ত -


চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মঘাদিয়া ইউনিয়নের মিয়াপাড়া গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার প্রাসাদ। অট্টালিকার গায়ে জমিদারি বেশভূষা থাকলেও এটি অনেকটাই অরক্ষিত। জানালা ও দরজার ফ্রেম থাকলেও নেই কোনো কপাট। প্রবেশমুখে নেই কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা। অট্টালিকার ইট, দরজা-জানালা ও অনেক প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ কিছুই নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দূর থেকে দেখে মনে হবে- মনোরম পরিবেশে সবুজে ঘেরা যেন এক বাগানবাড়ি। কাছে গিয়ে দেখা গেল বিশালাকৃতির ভগ্নপ্রায় দ্বিতল অট্টালিকা। পুরনো ইটের দেয়ালে রকমারি আগাছা, থরে থরে সাজানো ঝুঁকিপূর্ণ ঘরের ভেতর ঝোপঝাড়। আর সেখানটার পুরোটাই এখন পাখি ও পোকামাকড়ের দখলে। একসময়কার প্রভাবশালী জমিদার শেখ ওয়াসিল চৌধুরীর নির্মিত প্রাসাদটি এখন প্রায় জরাজীর্ণ ও বিলুপ্তির পথে। জমিদারহীন এ জমিদার প্রাসাদটির ভেতরের পরিবেশ অনেকটাই ভুতুড়ে।
অষ্টাদশ শতকের আগে তৈরি করা জমিদার বাড়ি নির্মাণ করতে এর ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে লোহার গার্ডার। দেখে মনে হবে- কয়েক বছর আগেই বুঝি এসব দেয়াল তোলা হয়েছে। ইট, সুরকি আর রড দিয়ে নিপুণ শৈলীর গাঁথুনির এ দ্বিতল ভবন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি ঘরের ভেতর ও ছাদে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্যের অনেক নিদর্শন। বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা দেখতে আসেন এ জমিদার বাড়ি। তবে এ এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা বলছেন- জমিদার বাড়িটি এখন আর আগের মতো নেই, বাড়িটি তার রূপ ও জৌলুস দুটোই হারিয়ে ফেলেছে। আর এটি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই কোনো মাথাব্যথা। ফলে বাড়িটির প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন খুব কম সময়ের মধ্যে বিলুপ্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকার সচেতন মহল।


জানা গেছে, শেখ ওয়াসিল চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার দুই সন্তান অলি আহমেদ চৌধুরী ও মকবুল আহমেদ চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব ভার নেন। তাদের মৃত্যুর পরবর্তী সময় তাদের সন্তানেরা জমিদারির দায়িত্ব নিলেও একে অন্যের উপর বিভিন্ন অভিযোগ আনলে নিজেদের মাঝে বিভাজন শুরু হয়। এতে করে জমিদারির পতন হতে শুরু করে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, জমিদার বংশধররা ছিলেন ইসলাম ধর্মালম্বী। এই জমিদার বংশের সবচেয়ে পরিচিত জমিদার ছিলেন নুরুল আবছার চৌধুরী। তিনি ১৮৯৫ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এই জমিদার বংশের শেষ জমিদার। তিনি খুব অল্প বয়সেই জমিদারীর দায়িত্ব পান। কারণ নুরুল আবছার চৌধুরীর পিতা জমিদার অলি আহমেদ চৌধুরী মারা যাওয়ার পর তার বড় ভাই জমিদার আবদুল হাই চৌধুরী জমিদারি দেখাশুনা করতেন। কিন্তু তিনি মাত্র ৩৩ বছর বয়সে মারা যান। এতেই নুরুল আবছার চৌধুরীর উপর এই জমিদারির দায়িত্ব এসে পড়ে। তবে তিনি দয়ালু, সততা ও ন্যায়ের সাথে জমিদারি পরিচালনা করাতে প্রজাদের কাছে অতি তাড়াতাড়ি পরিচিত হয়ে উঠেন। তিনি অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। তিনি তার মায়ের নামে প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিজের নামে উচ্চ বিদ্যালয়, শান্তিরহাট নামে শান্তিরহাট বাজার। এ ছাড়াও অসংখ্য এতিমখানা তৈরি করেছিলেন। তিনি তৎকালীন সময়ে রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। বাংলার মুখ্য মন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সাথে রাজনীতি করেছেন এবং তার একজন ভালো বন্ধু ছিলেন।


শেখ ওয়াসিল চৌধুরীর বংশধর শোয়েব আহমদ চৌধুরী বলেন, আমাদের বাপ-দাদারা এখানে বসে জমিদারি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। ১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৯৬৩ সালে মাওলানা ভাসানীসহ অসংখ্য গুণী লোক আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে ভবনটি সংস্কার করলে এখানে পর্যটন স্থাপনা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘুরতে আসা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান- এটি একটি ঐতিহাসিক ভবন, এটি রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব। ভবনটি সংস্কার করা হলে এখানের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানতে এবং দেখতে অনেক পর্যটক ছুটে আসবে। মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা জেরিন বলেন, জমিদারবাড়ি মিরসরাইয়ের ঐতিহ্য ও ইতিহাস বহন করে। মঘাদিয়া জমিদারবাড়ির বিষয়ে কিছু জানা নেই, তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিষয়ে জেনে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতরের সাথে ভবনটি সংস্কারের বিষয়ে কথা বলব। তবে যেহেতু জমিদারের বংশধর বেঁচে আছে, তাই তাদেরও উচিত ঐতিহ্য-ইতিহাসের ভবনটা রক্ষণাবেক্ষণ করা।

 


আরো সংবাদ



premium cement