ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজাইর পারমাণবিক অস্ত্রসংক্রান্ত সাম্প্রতিক মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অত্যন্ত সরাসরি ও নজিরবিহীন এক বক্তব্যে দেশটির এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তাকে সরাসরি ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ও ‘রাষ্ট্রের টিকে থাকা’র সাথে যুক্ত করেছেন।
ইরানের বার্তা সংস্থা ওয়ানা জানায়, রেজাই স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলা প্রমাণ করেছে—পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) যোগদান কিংবা আন্তর্জাতিক কাঠামোর সাথে সহযোগিতা কোনো সামরিক পদক্ষেপ ঠেকাতে পারেনি। তার মতে, এ বাস্তবতা অন্য দেশগুলোকেও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। একই সাথে রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে ‘পারমাণবিক নিরাপত্তাহীনতা’ তৈরির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তেহরানের নীতিনির্ধারণী মহলে এতদিন ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার’ নিয়ে যে আলোচনা প্রাধান্য পেত, তা এখন ক্রমশ ‘নিরাপত্তার প্রয়োজনের’ দিকে মোড় নিচ্ছে।
ইরান কি তবে বোমা বানিয়ে ফেলেছে?
প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই। রেজাইর বক্তব্য থেকে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে কিংবা তেমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন প্রমাণ মেলেনি। এসবই একেকটি ভিন্ন পর্যায়, যা প্রমাণের জন্য প্রযুক্তিগত তথ্যের প্রয়োজন।
তবে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে: পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধরে রাখার গুরুত্ব ইরান নতুন করে মূল্যায়ন করছে। বোমা থাকা আর সক্ষমতা থাকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো দেশ অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয় জ্ঞান, পরিকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। এ অবস্থায় একটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে ঠিক কত দূরে রয়েছে—সেই অনিশ্চয়তাই তার প্রতিরক্ষার অংশ হয়ে ওঠে।
তর্কটি কেন এখন তীব্র হচ্ছে?
রেজাইর যুক্তির পেছনের কারণ পরিষ্কার। ইরান এনপিটিভুক্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ এড়াতে পারেনি। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেও যদি নিরাপত্তা সুসংহত না হয়, তবে নীতিনির্ধারকরা সে সমস্ত বিধিনিষেধ মেনে চলা নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতেই পারেন। তেহরানের নিরাপত্তা ভাবনায় এই ধারণার প্রভাব কতটুকু, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
গতানুগতিক সামরিক শক্তি দিয়ে যদি যুদ্ধ প্রতিরোধ করা না যায়, তবে পারমাণবিক প্রতিরোধ কি মূল বিকল্প হওয়া উচিত? এই প্রশ্নই এখন তেহরানের নীতিনির্ধারণে প্রাধান্য পাচ্ছে।
এনপিটি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত
এনপিটি চুক্তি থেকে ইরানের বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে এ প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে। চুক্তি ছাড়ার অর্থ এই নয় যে ইরান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছে। তবে ইরান যদি আনুষ্ঠানিকভাবে তা থেকে সরে আসার দিকে এগোয়, তবে তা হবে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা—বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিয়ম আর দেশটির নিরাপত্তার সাথে মিলছে না।
অবশ্য আলোচনার টেবিলে বাড়তি সুবিধা আদায়ের কৌশল হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে। তাই এনপিটির কথা উঠলেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে বলা যায় না। আসল বিষয় হলো, যে বিষয়টি একসময় ইরানের সরকারি আলোচনাতেই ছিল না, তা এখন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মহলে খোলামেলাভাবে আলোচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিমুখী সংকট
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও কৌশলের লক্ষ্য যদি হয় ইরানকে পারমাণবিক শক্তি হওয়া থেকে বিরত রাখা, তবে এ কৌশল বিপরীত ফল দিতে পারে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তেহরান যদি ধরে নেয় যে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকাটা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না, তবে অতিরিক্ত চাপ তাদের পিছিয়ে দেবে না; বরং পারমাণবিক প্রতিরোধের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে। এটি এক ক্লাসিক ‘সিকিউরিটি ডাইলেমা’—একপক্ষের নিরাপত্তা বাড়ানোর পদক্ষেপ অপরপক্ষকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষকেই ঝুঁকিতে ফেলে।
মূল বিষয় কেবল পারমাণবিক বোমা নয়
ইরান এখনো পারমাণবিক বোমা বানায়নি কিংবা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেয়নি। কিন্তু তেহরানে যদি এ বিশ্বাস পোক্ত হয় যে কেবল পারমাণবিক অস্ত্রই ভবিষ্যৎ যুদ্ধ ঠেকানোর একমাত্র গ্যারান্টি, তবে ইরানের পরমাণু নীতির গতিপথ ইতোমধ্যেই বদলে গেছে।
আসল প্রশ্ন এখন শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, সেন্ট্রিফিউজ বা ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলো যুদ্ধের পর ইরান নিজের নিরাপত্তাকে কীভাবে দেখছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই: সাম্প্রতিক যুদ্ধ কি ইরানকে বোঝাতে পেরেছে যে পরবর্তী যুদ্ধ এড়াতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার আরও কাছাকাছি যাওয়াই তাদের একমাত্র পথ?
উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয়, তবে তার প্রভাব কেবল ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ভারসাম্য ও ভূরাজনীতি ওলটপালট হয়ে যাবে।



