ইরান যুদ্ধেই ব্রিকসের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের ঘোষণায় সরাসরি কোনো কথা বলা হয়নি। এমনকি সংঘাতে আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দাটিও করেনি এ জোট।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর জাতীয় পতকা
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর জাতীয় পতকা |সংগৃহীত

নয়াদিল্লিতে এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে সহযোগিতা জোরদার ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের চিরাচরিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অনুপস্থিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের ঘোষণায় সরাসরি কোনো কথা বলা হয়নি। এমনকি সংঘাতে আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দাটিও করেনি এ জোট।

আল জাজিরা সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জানায়, এই যুদ্ধ ব্রিকসের ১১ সদস্য ও ১০ অংশীদার দেশের বেশির ভাগকেই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে। তবু এ বিষয়ে সরাসরি অবস্থান এড়ানোর ভাষা সব সদস্যকে একই কূটনৈতিক ছাতার নিচে থাকার সুযোগ দিয়েছে। একই সাথে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি সদস্যদের অভিন্ন অসন্তোষকে সমন্বিত ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপে রূপ দেয়া ব্রিকসের জন্য কতটা কঠিন।

ইরান যুদ্ধের পরীক্ষায় ব্রিকস

সম্মেলনের কয়েক মাস আগেই সমস্যাটি স্পষ্ট হয়েছিল। মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। বৈঠকের ফলাফলসংক্রান্ত নথিতে সদস্যদের মতপার্থক্যের কথা স্বীকার করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের নাম এড়িয়ে যাওয়া হয়।

ইরান চেয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানের নিন্দা করুক ব্রিকস। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এমন ভাষার বিরোধিতা করে, যাতে ইরানের হামলা ও নিজেদের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষিত থাকে। এই ব্যর্থতা শুধু কূটনৈতিক অস্বস্তির বিষয় ছিল না। এটি ছিল ব্রিকস সম্প্রসারণের রাজনৈতিক মূল্য কতটা, তারও স্পষ্ট প্রমাণ।

জোটের সদস্যসংখ্যা বাড়ায় বিশ্বজুড়ে ব্রিকসের প্রভাব বেড়েছে। কিন্তু এর সাথে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও সংগঠনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তার স্পষ্ট উদাহরণ। দুদেশই ব্রিকসের সদস্য, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত হিসাব একে অপরের সাংঘর্ষিক। ফলে একই সংগঠনে থাকা সত্ত্বেও উভয়কে সরাসরি প্রভাবিত করা কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে ব্রিকস কতদূর যেতে পারবে, তার একটি স্বাভাবিক সীমা তৈরি হয়েছে।

সেপ্টেম্বরের শীর্ষ সম্মেলনে শেষ পর্যন্ত একটি ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে সমঝোতার ধরনটিই অনেক কিছু বলে দেয়। দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান নেয়ার বদলে ব্রিকস যেন মতবিরোধ সামলানোর একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

এতে বোঝা যায়, ব্রিকসের প্রধান সমস্যা অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক শক্তির অভাব নয়। আসল সমস্যা হলো, সেই শক্তিকে একটি অভিন্ন ভূরাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করা।

যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় মতভেদ

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই ব্রিকসের উত্থান। কিন্তু ওয়াশিংটনকে মোকাবিলার প্রশ্নে জোটটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ এক নয়।

ভারতের অবস্থান এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট। নয়াদিল্লি ব্রিকসকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে নয়, কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখে। ভারত একদিকে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক গভীর করছে, কোয়াডে অংশ নিচ্ছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে ব্যাপক প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সাথেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

ভারতের কাছে ব্রিকসের একটি বড় মূল্য হলো, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকেন্দ্রগুলোর মধ্যে নিজেদের চলার জায়গা ধরে রাখা। ব্রিকসকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোটে পরিণত করা হলে সেই কৌশলগত নমনীয়তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চীন ও রাশিয়ারও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সংঘাতের হাতিয়ারে ব্রিকসকে পরিণত না করার কারণ রয়েছে। রাশিয়ার জন্য পশ্চিমা অর্থনৈতিক চাপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কমাতে ব্রিকস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সামরিক জোটের মাধ্যমে আরো আক্রমণাত্মক নীতি নিলে মস্কো যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সাথে এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তারা যেকোনো মূল্যে এড়িয়ে চলতে চায়।

চীনের হিসাব আরো জটিল। বেইজিং শক্তিশালী বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা ও গ্লোবাল সাউথের বড় ভূমিকা চায়। বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোগত সুবিধাও কমাতে চায়। তবে ব্রিকসের প্রতিটি বিরোধকে ওয়াশিংটনের সাথে দুই পক্ষের সংঘাতে পরিণত করার কোনো কারণ চীনের নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনা পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেরও বড় নিয়ামক।

বৈচিত্র্যই শক্তি, আবার দুর্বলতাও

ব্রিকস যেন বহুকেন্দ্রিকতার এক ফাঁদে আটকা পড়েছে। এর সবচেয়ে বড় শক্তি বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্য বিশ্বের এমন সব অঞ্চলে জোটটিকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে, যাদের বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার কাঠামোয় ঐতিহাসিকভাবে প্রভাব কম ছিল।

কিন্তু এই বৈচিত্র্যই যৌথ ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপকে কঠিন করে তুলছে। প্রতিটি নতুন সদস্য অর্থনৈতিক সম্পদ, কূটনৈতিক বিস্তৃতি ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। একই সাথে যোগ হয় নতুন জাতীয় স্বার্থ, যেগুলোকে সমন্বয় করতে হয়। এ কারণেই ব্রিকস একটি সুসংহত ভূরাজনৈতিক জোটের চেয়ে শক্তিশালী দরকষাকষির জোটে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য জোরদার, উন্নয়ন অর্থায়ন সম্প্রসারণ এবং পশ্চিমা আর্থিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর প্রশ্নে সদস্যরা একমত হতে পারে। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, উন্নয়ন ঋণ, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা সম্ভব।

কিন্তু কোনো বাস্তব ভূরাজনৈতিক সংঘাতে পক্ষ বেছে নেয়ার প্রশ্ন এলে ঐকমত্য অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। ইরান যুদ্ধ সেই দ্বন্দ্বকে অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকস অপ্রাসঙ্গিক। বরং এর প্রভাব হয়তো অন্য জায়গায়। বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দরকষাকষির পরিবেশ বদলানোর মতো কম নাটকীয় কিন্তু আরো টেকসই ভূমিকার মধ্যেই থাকতে পারে ব্রিকসের শক্তি।

যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থা ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই ব্রিকসের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিকল্প উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, ডলারের বাইরে লেনদেনের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ানোর মধ্য দিয়েই জোটটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ফলে ব্রিকসের ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতাই হয়তো শেষ পর্যন্ত আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। কঠিন সংঘাত এড়িয়ে চলা ধীরে ধীরে পরিবর্তনের জন্য আরো জায়গা তৈরি করতে পারে এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য বদলাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।