ইরানের সাথে ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আর বাড়াতে রাজি নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সাথে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে ইরানও কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে হরমুজে ‘পূর্ণাঙ্গ আক্রমণাত্মক’ অবস্থানে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের এমওইউর মেয়াদ ১৭ আগস্ট শেষ হয়েছে। ওই সমঝোতার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং পরমাণু কর্মসূচি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য দূর হয়নি।
সোমবার ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের সাথে বিদ্যমান এমওইউর মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে না। ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত চুক্তিতে রাজি হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি তেহরানের প্রতি আত্মসমর্পণের ভাষাও ব্যবহার করেন। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে এমন একটি চুক্তিতে সম্মত হতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও পরমাণু-সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করবে।
এদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার প্রশাসন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাথে যোগাযোগ করছে। তবে আইআরজিসি ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নৌ অবরোধের মাধ্যমে প্রণালীটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনকি হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করার ধারণাকেও তিনি ‘দারুণ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এর আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে এবং মার্কিন নৌ অবরোধকে তিনি ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে ইরান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই রয়েছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এর আগে বলেছেন, হরমুজ ‘ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে’। তেহরানই কখন প্রণালীটি খুলবে বা বন্ধ করবে—এ সিদ্ধান্ত ইরান নেবে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
বর্তমান সঙ্ঘাতের কারণে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার মাত্র পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করে এবং রোববার কোনো ট্যাংকার পার হয়নি। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে দৈনিক প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, সেখানে চলাচল এখন অত্যন্ত সীমিত।
হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ১৪ ডলারে উঠে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দামও ৮৫ দশমিক ০৪ ডলারে পৌঁছায়। জুলাইয়ের শেষের পর এটাই ছিল উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের সর্বোচ্চ দাম।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজে দীর্ঘ সময় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও খাদ্যপণ্যের দামে। ইতোমধ্যে সঙ্ঘাতের কারণে জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির চাপ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ছে।
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা বাড়াতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইরানও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে ‘পূর্ণাঙ্গ আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত।
এদিকে ইরান ও ওমান হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলাদাভাবে আলোচনা চালাচ্ছে। তবে এই উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প ওমানকে ইরানের সাথে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পথে বাধা না দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
৬০ দিনের এমওইউর মেয়াদ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে আলোচনা চালানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে।
সূত্র : আল জাজিরা, রয়টার্স



