কূটনীতি ব্যর্থ হলে হরমুজে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি ইরানের

তেহরানের দাবি, সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম ধারা অনুযায়ী ওমানের সাথে ভাগ করা হরমুজ প্রণালী পরিচালনার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। অননুমোদিত পথে হরমুজ অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজে ইরান গুলি চালানো শুরু করলে সঙ্ঘাতনতুন করে উত্তপ্ত হয়। পরে ৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, সমঝোতা ‘শেষ’ হয়ে গেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে হরমুজ প্রণালীতে ‘সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী’ সামরিক পদক্ষেপ নেয়া র হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোমবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের স্থায়ী অবসানে সমঝোতার প্রচেষ্টা অচলাবস্থায় পড়ায় তেহরান তার নীতি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে ‘পুরোপুরি আক্রমণাত্মক’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য ইরানের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ভাঙতে তেহরান সামরিক পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে শান্তি আলোচনা এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরুর বিষয়েও অগ্রগতি থমকে আছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর সঙ্ঘাত অবসানে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্যের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে ‘আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা তুলতে’ বলেছেন।

হরমুজ নিয়ে বিরোধ
গত ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে বৃহত্তর একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দুই দেশকে ৬০ দিনের সময়সীমা দেয়া হয়েছিল। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে ওই অন্তর্বর্তী সমঝোতা দ্রুত ভেস্তে যায়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

তেহরানের দাবি, সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম ধারা অনুযায়ী ওমানের সাথে ভাগ করা হরমুজ প্রণালী পরিচালনার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। অননুমোদিত পথে হরমুজ অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজে ইরান গুলি চালানো শুরু করলে সঙ্ঘাতনতুন করে উত্তপ্ত হয়। পরে ৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, সমঝোতা ‘শেষ’ হয়ে গেছে।

এক ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের নির্ধারিত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সমঝোতার সব শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পরবর্তী আলোচনার এটিই পূর্বশর্ত। মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের এই সময়সীমার বিষয়টি ওয়াশিংটন ও আঞ্চলিক দেশগুলোকে জানাবেন বলেও জানান তিনি।

হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সাথেও আলাদাভাবে আলোচনা করছে ইরান। তেহরানের দাবি, দুই দেশ একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে, যদিও আলোচনার অগ্রগতি ধীর।

তবে ওমান এ প্রক্রিয়ায় বাধা দিলে দেশটির বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ওমান যদি বাধা দেয়, আমরা তাদের ওপর বোমা বর্ষণ করব।’

হাউছি হামলায় বাড়ছে আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা
এদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হাউছিদের হামলা বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা আরো বাড়িয়েছে। সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে ইরান ও লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।

শুক্রবার এক সমাবেশে ট্রাম্প মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানির দাম আরো বাড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। একই সাথে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পরাজিত করার পর হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটিই তার প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটও বলেন, ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।

সঙ্ঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল, যা যুদ্ধের আগের দামের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। সোমবারও ব্রেন্টের দাম সামান্য বেড়ে প্রায় ৮৯ ডলারে দাঁড়ায়।

এদিকে হাউছিদের সর্বশেষ হামলা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি টেলিগ্রামে দাবি করেছেন, বাব আল-মানদেব প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি সৌদি সামরিক জাহাজ ও চারটি এসকর্ট জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এ দাবি নিশ্চিত করেনি।

সূত্র : রয়টার্স