২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩০, ১৩ জিলহজ ১৪৪৫
`

ভগ্ন হৃদয়, একি সত্য? সবই সত্য?

ভগ্ন হৃদয়, একি সত্য? সবই সত্য? -


মনের চাপ আহত করতে পারে হৃদপেশিকে, এমন উপসর্গ যেন হার্ট অ্যাটাক। এই বিকল হওয়ার নাম হলো স্ট্রেস কার্ডিওমায়োপ্যাথি- কঠিন শব্দ- আরো সহজ করে- ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম বা ভগ্ন হৃদয়। বেশি হয় বয়স্ক মহিলাদের-বড় ধরনের শারীরিক চাপ যেমন বড় কোনো অপারেশন বা প্রিয়জনের মৃত্যুর পর মানসিক চাপের পর এমন হয়।
এখন এক গবেষণায় দেখা গেল এ ধরনের সিন্ড্রোম হতে পারে পুরুষদের এবং প্রাক ঋতুবন্ধ নারীদের। এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, চিহ্নিত করার উপায় থাকে না। অনেক রোগীদের ক্ষেত্রে নানান পরীক্ষা করে বোঝা গেল এ রোগের কার্যকরণ ভিন্ন। বাল্টিমোর জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদচিকিৎসক ডা: ইলান এস উইটস্টাইন, ক্লিডল্যান্ড ক্লিনিকের ডা: ম্যাজন হান্না সবাই জড়িত। অন্যান্য হৃদরোগ থেকে এটি বেশ ভিন্ন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল এসোসিয়েশনে।


ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম সম্বন্ধে তথ্য, নথি
জার্মানি ও কানাডায় গবেষকরা জানুয়ারি ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সাতটি ভিন্ন ভিন্ন হাসপাতাল থেকে ২৫৬ জন স্ট্রেস কার্ডিওমায়োপ্যাথি রোগী চিহ্নিত করলেন। রোগীদের বয়স ৩০-৯০। গড় বয়স ৬৯। প্রত্যাশা মতো বেশির ভাগ রোগী ৮১ শতাংশ ছিলেন ঋতুবন্ধ উত্তর মহিলা, ৮ শতাংশ ৫০ বছরের কম বয়সী ও ১১ শতাংশ পুরুষ।
এদের মধ্যে মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ মহিলা শনাক্ত করতে পারলেন এমন সমস্যার অন্তর্গত কারণ। ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে কারণটি ছিল আবেগজনিত, বন্ধুর মৃত্যু, পোষা প্রাণীর মৃত্যু বা স্বজন বিয়োগের ব্যথা, কলহ-বিবাদ, উদ্বেগ, ক্রোধ বা চাকরিচ্যুতি। ৪১ শতাংশ ক্ষেত্রে কারণটি ছিল দৈহিক। শারীরিক আঘাতের কারণ ছিল বড় অপারেশন, সিওপিডি, হাঁপানি বা ব্রংকাইটিস এবং কেমোথেরাপি।
খুবই সতর্কভাবে, সযত্নে রোগের ইতিহাস নেয়ার পরও, গবেষকরা বললেন, মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ রোগী উদ্দীপক কারণটি শনাক্ত করতে পারলেন। তাদের বক্তব্য এই মাল্টিসেন্টার কোহোর্ট গবেষণা থেকে জানা গেল শনাক্ত করার মতো উদ্দীপক ঘটনা না থাকলেও রোগ নির্ণয় প্রতিপন্ন করা যাবে না তা নয়। তাদের ধারণা এই রহস্যজনক বৈকল্যের পেছনে থাকতে পারে অনেক জটিল অন্তর্গত ঘটনা : অন্তঃস্রাবী গ্রন্থি, রক্ত সংবহনতন্ত্র, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র সব জড়িত থাকতে পারে।
তাই নির্ভুল রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন অনেক সচেতনতা এবং বিকল অবস্থা চেনার দক্ষতা।
উইটস্টাইন বলেন, হার্ট অ্যাটাকের পর যত রোগী হাসপতালে ভর্তি হয় তাদের ২ শতাংশের থাকতে পারে স্ট্রেস কার্ডিওমায়োপ্যাথি। নারীদের মধ্যে এ সংখ্যা আরোও বেশি ৫-৭ শতাংশ।


কার্যকরণ সুষ্ট না হলেও গবেষকদের ধারণা :
স্ট্রেস হরমোন প্রচণ্ড বেগে নিঃসৃত হওয়ার জন্য হৃদযন্ত্রের চারধারে রক্তনালীগুলো হয় সঙ্কুচিত।
উইটস্টাইন বলেন, খুব সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো, মাইক্রো সার্কুলেশন, প্রভাবিত হলে হৃদযন্ত্রের রক্ত চলাচল সাময়িকভাবে কমে যায় এবং হৃদপেশি সাময়িকভাবে স্তব্ধ, আহত হয়।
তবে হার্ট অ্যাটাক থেকে এটি ভিন্ন: হার্ট অ্যাটাক হলে হৃদপেশি কোষের মৃৃত্যু ঘটে এবং ক্ষত থেকে যায় হৃদপেশিতে।
কিন্তু ভগ্নহৃদয় সিনড্রোম হলে হৃদপেশি সাময়িকভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়, একেবারে বিনষ্ট হয়ে যায় না। হাসপাতালে এলে পরে হৃদপেশিকে লাগে বড়ই দুর্বল কিন্তু কালক্রমে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। বেশির ভাগ রোগীর ছিল হার্ট অ্যাটাকের বৈশিষ্ট্যসূচক উপসর্গ। সব রোগীর এনজিওগ্রাম করা হলো। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ডাক্তাররা হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে কোনো অবরোধ থাকলে তা চিহ্নিত করতে পারলেন। এসব এনজিওগ্রাম থেকে দেখা গেল ৭৪ শতাংশ রোগীর রক্তনালী সুস্থ, অবরোধমুক্ত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবরোধ থাকলেও তা খুবই কম। কারো মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের আরও একটি বড় চিহ্ন ধমনিতে জমা রক্তপুঁজ দীর্ণ হওয়ার সম্প্রতিক নিদর্শন পাওয়া গেল না।
সব রোগীকে কার্ডিয়াক এমআরআই দিয়ে আরো পরীক্ষা করা হলো। এসব স্ক্যানে দেখা গেল ৮১ শতাংশ রোগীর হৃদপেশি ফোলা, স্ফীত।
রোগ চিহ্নিত হওয়ার পর রক্তচাপ ও হার্ট ফেলিওর চিকিৎসার জন্য ওষুধ দেয়া হলো। মাত্র ৮ জন রোগীর মৃত্যু হলো, বাকি সবাই সেরে উঠলেন। ৬ মাস পর তাদের স্ক্যান করে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক পাওয়া গেল।
যদিও ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোমের রোগীরা আরোগ্য হয় সম্পূর্ণই কিন্তু কেউ স্বচিকিৎসা করা, নিজে নিজে ডাক্তারি করা ঠিক না, কারণ মানসিক চাপ কিছু ক্ষেত্রে সত্যিকারের হার্ট অ্যাটাক ঘটাতে পারে।
ডা: হান্না বলেন, মনে রাখা প্রয়োজন ৯৮ শতাংশ সময়, হার্ট অ্যাটাকের মতো সিনড্রোম মনে হলেও সত্যি সত্যি হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। অনেক সময় তা ঘটে। তাই তুচ্ছ তাছিল্য করা উচিত নয় মোটেও।


আরো সংবাদ



premium cement