২৮ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

৩ সেকেন্ডে একজন আক্রান্ত হন ডিমেনশিয়ায় : হারান স্মৃতিশক্তি


কোভিড-১৯ মহামারী ছাড়া বর্তমান বিশ্বে যেসব বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তার একটি ডিমেনশিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বেশিরভাগ দেশ ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রস্ট হওয়ার ক্রমবর্ধমান সমস্যা মোকাবিলায় ব্যর্থ হচ্ছে।

সংস্থাটির নতুন এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বের মাত্র এক চতুর্থাংশ দেশের জাতীয় নীতিমালা রয়েছে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে সাহায্য দেয়ার ব্যাপারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বর্তমানে সাড়ে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই রোগটির কথা ১৯০৬ সালে প্রথম উল্লেখ করেন আলোইস আলঝেইমার নামের একজন জার্মান চিকিৎসক। স্মৃতি হারিয়ে ফেলা একজন নারীর ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান যে তার মস্তিষ্ক নাটকীয়ভাবে শুকিয়ে গেছে। একইসাথে স্নায়ুকোষগুলো ও তার আশপাশে অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হয়েছে। এ সময় এটি খুব বিরল রোগ ছিল। তার পরের কয়েক দশকেও এ নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। কিন্তু আজকের দিনে প্রত্যেক তিন সেকেন্ডে এতে একজন আক্রান্ত হচ্ছেন। উন্নত ও ধনী দেশগুলোতে ডিমেনশিয়াতেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

ডিমেনশিয়া কী
মস্তিস্কের অনেক অসুখের একটি উপসর্গ এই ডিমেনশিয়া। ‌এর স্বাভাবিক ও সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়া বা ভুলে যাওয়া। কেউ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হলে তার পক্ষে অতীতের চেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখা অনেক বেশি কঠিন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের নিউরো মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও নিউরোলজিস্ট ড. সেহেলী জাহান বলেন, এটা মূলত বয়স্ক মানুষের রোগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্মৃতির ব্যাপারে সমস্যা দেখা দেয়। সহজ করে বললে, এটি হচ্ছে ভুলে যাওয়া রোগ। এর সাথে অন্যান্য সমস্যাও হয়। যেমন নিজের কাজগুলো নিজে ঠিক মতো করতে না পারা। কারো হাঁটা চলারও সমস্যা হয়।

ডিমেনশিয়ার আরো যেসব উপসর্গ আছে তার মধ্যে রয়েছে আচরণের পরিবর্তন, মেজাজ ও ব্যক্তিত্ব, পরিচিত জায়গাতেও হারিয়ে যাওয়া অথবা কারো সাথে আলাপ করার সময় সঠিক শব্দটি খুঁজে না পাওয়া। এটা এমন একপর্যায়ে গিয়েও পৌঁছাতে পারে যে তিনি খেয়েছেন কি-না সেটাও তিনি মনে করতে পারেন না। চাবি কোথায় রেখেছেন, চেকে সই করেছেন কি-না- এসব তারা সহজেই ভুলে যান।

এমনকি তারা কথাও গুছিয়ে বলতে পারেন না। কথা বলার সময় কোন শব্দের পর কোন শব্দ ব্যবহার করবেন বা একটা বাক্যের পর পরের বাক্যে কী বলবেন- এসব তারা মেলাতে পারেন না।

ড. জাহান বলেন, ডিমেনশিয়ার বিভিন্নরকমের প্রকারভেদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়, আলঝেইমার্সজনিত ডিমেনশিয়া যা বংশগত। আরো কিছু ডিমেনশিয়ার মধ্যে রয়েছে- ভাসকুলার ডিমেনশিয়া, লিভি বডিস ডিমেনশিয়া, ফ্রন্টো টেম্পোরাল ডিমেনশিয়া ও পারকিনসন্সজনিত ডিমেনশিয়া।

কেন ভুলে যাই
মানুষ কেন ভুলে যায়- এই প্রশ্নের উত্তরে ড. সেহেলী জাহান বলেন, মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট জায়গা, যা স্মৃতির প্রবেশপথ তাকে বলা হয় হিপ্পোক্যাম্পাস। এই এন্ট্রি পয়েন্টের উপরেই রোগটি আক্রমণ করে। এর অর্থ হচ্ছে, বয়স হলে মস্তিষ্কের ওই হিপ্পোক্যাম্পাস সংকুচিত হয়ে যায়। মানুষের যখন বয়স কম থাকে তখন এটি ভালো থাকে। তখন এটি বিভিন্ন স্মৃতি সংগ্রহ করে জায়গা মতো গুছিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু হিপ্পোক্যাম্পাস যখন নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন সে আর স্মৃতি গুছিয়ে রাখতে পারে না।

তিনি বলেন, এ কারণে মানুষ তার নিকট অতীতের স্মৃতি হারাতে শুরু করে। ২০ বছর আগের জিনিস তার ঠিকই মনে আছে। কারণ সেগুলো গুছিয়ে রাখার মতো লোক ছিল। সেগুলো গোছানো আছে। কিন্তু এখনকার স্মৃতি গুছিয়ে রাখার লোক নেই! এ কারণেই তারা সাম্প্রতিককালের স্মৃতি ভুলে যেতে শুরু করে।

বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, ২০০০ সালের পর থেকে ডিমেনশিয়ার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সারা বিশ্বে বর্তমানে যেসব অসুখের কারণে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তার তালিকায় ডিমেনশিয়ার অবস্থার পাঁচ নম্বরে।

এই রোগে ধনী দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ব্রিটেনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান আলঝেইমার্স রিসার্চ ইউকে বলছে, আমাদের সময়ে স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ডিমেনশিয়া। এর চিকিৎসায় কিছু করতে না পারলে ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

কিন্তু বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের নিউরোলজিস্ট ড. সেহেলী জাহান বলেন, বাংলাদেশে এই অসুখটি এখনো পশ্চিমা দেশগুলোর মতো প্রকট নয়। তিনি বলেন, আমার হাসপাতালে আমি যত রোগী দেখি তাদের মধ্যে অন্য রোগের তুলনায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুব কম। তবে এই রোগের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও অনেক কম। এ কারণে তারা রোগীদের ডাক্তারের কাছে আনে না কি-না সেটা আমি বলতে পারবো না। তবে যারা ডিমেনশিয়ার রোগী তাদের বেশিরভাগই কয়েকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, মৃগী রোগীদের মস্তিষ্ক তো একটা পর্যায়ে গিয়ে ঠিক মতো কাজ করে না। অনেক সময় দেখা যায়, এই রোগীদেরকে পীর-ফকির দেখিয়ে বহু বছর পর ডাক্তারদের কাছে নিয়ে আসা হয়। তখন তেমন কিছু করারও থাকে না।

কেন হয় ডিমেনশিয়া
একটি কারণ- মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি বছর বেঁচে থাকছে। আর বয়স হলে ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিবিসির স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান-বিষয়ক সংবাদদাতা জেমস গ্যালাহার বলছেন, প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসার কারণে ডিমেনশিয়ার মতো মূল্য দিতে হচ্ছে- এটিকে এভাবেও দেখা যেতে পারে।

ড. সেহেলী জাহান বলেন, বংশগত কারণ ছাড়াও বারবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটলে, কিম্বা থাইরয়েডের মতো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে ও ভিটামিনের অভাবেও ডিমেনশিয়া দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, আলঝেইমার্সের সাথে এমিলয়েড বেটা প্রোটিনের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। ধারণা করা হয় যে এসব প্রোটিন জমা হওয়ার কারণেই মস্তিষ্কের কোষের মৃত্যু হয়। এ কারণে এমিলয়েড বেটা প্রোটিনকে সরিয়ে দিতে পারলে মস্তিষ্কের কোষগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা
এ বিষয়টিকে সামনে রেখেই ওষুধ প্রস্তুতকারক অনেক কোম্পানি ডিমেনশিয়ার ওষুধ তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু এখনো সেরকম কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে এমিলয়েডের সাথে ডিমেনশিয়ার সম্পর্কের ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ডিমেনশিয়ার এখনো কোনো চিকিৎসা বা ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। কেউ যদি ডিমেনশিয়া শ্লথ করে দিতে পারে এরকম একটি ওষুধও আবিষ্কার করতে পারেন- তাহলেও সেটি হবে যুগান্তকারী ঘটনা।

ফলে বিজ্ঞানীদের সামনে এখনো যেসব প্রশ্ন রয়ে গেছে
কেন নিউরনের মৃত্যু হয়? মস্তিষ্কে জমা হওয়ার কোন ধরনের প্রোটিন বিষাক্ত হয়? এসব প্রোটিন কেন মস্তিষ্কে জমা হয়, কোথায় শুরু হয়, কেন তারা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে ডিমেনশিয়ার চিকিৎসায় বড়ো ধরনের অগ্রগতি হবে।

প্রতিরোধের উপায়
ডিমেনশিয়ার প্রতিকার বের না হলেও এটি প্রতিরোধের বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি ঠেকানো সম্ভব হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে-

মধ্য বয়সে শ্রুতিক্ষয়ের চিকিৎসা, পড়াশোনা বেশি সময় কাটানো, ধূমপান না করা, বিষন্নতায় ভুগলে দ্রুত চিকিৎসা, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, নিঃসঙ্গ থাকা পরিহার করা, সামাজিকভাবে মেলামেশা করা, উচ্চ রক্তচাপ এড়িয়ে চলা, মোটা না হওয়া ও ডায়াবেটিস না হওয়া।

এসব বিষয় কেন মস্তিষ্ককে রক্ষা করে তা এখনো পরিষ্কার নয়। মানুষের মস্তিষ্ক সত্যিকার অর্থেই এক বিস্ময়কর ও জটিল এক কাঠামো। ১০০ বিলিয়নেরও বেশি নিউরন দিয়ে এই মস্তিষ্ক গঠিত।

বলা হয়, এই পৃথিবীতে সবার যদি একটি করে কম্পিউটার থাকে এবং সবাই একসাথে লগ-ইন করে একই সময়ে কাজ করেন, তার পরও সেই কাজ মস্তিষ্কের ১০ ভাগের একভাগ কাজের সমান হবে না।

সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ