২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০, ১৮ শাবান ১৪৪৫
`

নিয়মিত কার্যক্রমে ফিরতে চায় হেফাজত

-

- সক্রিয় নেতাদের বেশির ভাগই মামলা জালে
-পরিস্থিতি বুঝে সামনে এগোনোর চিন্তা

অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম আবারো নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রমে ফিরতে চায়। নিয়মিত কাজে সক্রিয় হতে কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর তৃণমূল থেকে চাপ বাড়ছে। এই চাপের অংশ হিসেবেই ইতোমধ্যেই সংগঠনটির বিলুপ্ত কমিটিকে পুনর্বহাল করে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে। কারাবন্দী বেশ কয়েকজন সাবেক শীর্ষস্থানীয় নেতার মুক্তির পরই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে কেন্দ্রীয় নেতারা এখনো কারাবন্দী চার শীর্ষস্থানীয় নেতার মুক্তি এবং হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুই শতাধিক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।

হেফাজতের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যারা অতীতে সংগঠনিক কার্যক্রমে বেশি সক্রিয় ছিলেন তাদের বেশির ভাগই এখন মামলায় বিপর্যস্ত। যদিও অনেকে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করে এখন জামিনে মুক্ত। এখনো অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে মামলা ও গ্রেফতারভীতি কাজ করছে। এই অবস্থায় পরিস্থিতির আলোকেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যায়ক্রমে নিয়মিত কার্যক্রমের দিকে অগ্রসর হওয়ার চিন্তা করছেন। তবে হেফাজতের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এই অবস্থায় মাঠপর্যায়ে নিজস্ব সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সক্রিয় হওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের চাপ দিচ্ছেন। এমনকি তারা বন্দী নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি দেয়ারও পক্ষে মত দিচ্ছেন বলে নেতারা জানান।

হেফাজত সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা ও ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২২৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মাওলানা মামুনুল হকের মামলাসহ ২২টি মামলার চার্জশিট দেয়ার পর বিচারকাজ চলমান রয়েছে। বর্তমানে কারাবন্দী রয়েছেন মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা মনির হোসেন কাসেমী, মাওলানা নুর হোসাইন নূরানী, মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী ও মুফতি ফখরুল ইসলাম।

হেফাজতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, গত ৩১ আগস্ট সর্বশেষ অনুমোদিত ২১১ সদস্যের কমিটিতে পুরনো নতুন প্রায়ট্ব নেতা স্থান পেয়েছেন। এমনকি কারাবন্দী নেতাদের জন্য পদ অনুমোদন করে রাখা হয়েছে। মুক্তি পেলে তারাও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন। তবে পুরনো কমিটির নেতাদের বর্তমান কমিটিতে স্থান দেয়ার ক্ষেত্রে হেফাজত গঠিত ১২ সদস্যবিশিষ্ট উপকমিটির সুপারিশ পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। কয়েকজনের পদবি পরিবর্তন করতে হয়েছে। বিশেষ করে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর নাম থাকলেও পরে তাকে যুগ্মমহাসচিব পদ দিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে অন্য একজনকে। এভাবে আরো কয়েকটি পদে পরিবর্তন হয়েছে। আবার ইসলামী ঐক্যজোট সংশ্লিষ্ট মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনী, মুফতি ফয়জুল্লাহ ও মাওলানা মঈন উদ্দিন রুহীসহ কিছু সাবেক নেতাকে স্থান দেয়া হয়নি।
নতুন কমিটি অনুমোদনের পর কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। শিগগিরই নতুন কমিটির পরিচিতিমূলক একটি সভা হবে বলে একাধিক নেতা জানিয়েছেন। ওই বৈঠকেই মূলত হেফাজতের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ব্যাপারে আলোচনা হতে পারে।

জানতে চাইলে হেফাজতের পুনর্গঠিত কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব নয়া দিগন্তকে বলেন, কমিটি পুনর্গঠনের পর নতুন কমিটির এখনো সভা হয়নি, ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের বিষয়ে এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। সভা হলে সেখানে নিশ্চয়ই করণীয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন। এই সংগঠনের নতুন করে কার্যক্রম গ্রহণের কিছু নেই। আমাদের এখনকার দাবিও পরিষ্কার। সেটা হলো মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া। এজন্য একদিকে যেমন আমরা দাবি জানাচ্ছি, অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়াও চলছে। আমাদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এর আগেও প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেছেন। এখনো মামলা প্রত্যাহার ও নেতাদের মুক্তির ব্যাপারে চেষ্টা চলছে। ২০২১ সালে কারাবন্দী হওয়ার পর সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া এই হেফাজত নেতা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, হেফাজতের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কর্মসূচি পরিষ্কার। হেফাজত সব সময় নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। আমরা আশা করছি, সামনে রবিউল আউয়াল মাস। শানে রেসালাত সম্মেলন, সেমিনারসহ আমাদের নিয়মিত যেসব কার্যক্রম রয়েছে সেগুলোর দিকে যাবো। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অতীতে অনেক কাজের দায় আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে, অনেক কিছুর জন্য দোষারোপ করা হয়েছে। অথচ আমাদের সব কার্যক্রমই শান্তিপূর্ণ।

হেফাজতের সাংগঠনিক কার্যক্রমের ব্যাপারে নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আমাদের মুক্ত নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন কমিটি পেয়েছি। আরো কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন। তারাও আমাদের অনুমোদিত কমিটিতে রয়েছেন। মুক্ত হওয়ার পর তাদের পদায়ন হবে। শিগগিরই নতুন কমিটির সভা হবে। তাতে আলোচনা করে পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক সংগঠনেরই নিজস্ব কর্মসূচি থাকে। হেফাজতেরও আছে। সেই কর্মসূচি পালন স্বাভাবিক কাজ। সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা সেই কর্মসূচি পালন করে থাকেন। সেই ধারাবাহিকতায় হেফাজতের কার্যক্রম চলমান থাকবে। কী কারণে কার্যক্রম এই সময়ে নেয়া হবে সেটা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবেন।

হেফাজতের বর্তমান কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, আমরা এখন মামলায় বিপর্যস্ত, মামলায় হাজিরা দিতে দিতেই আমাদের দিন কাটছে। নিজে ২১ মাস কারাভোগের কথা জাানিয়ে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা চলছে। আজ ঢাকায় তো কাল চট্টগ্রাম- এভাবেই চলছে। আমাদের এখনো বেশ কয়েকজন কারাগারে রয়েছেন। তাদের মুক্তির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন আমাদের নেতৃবৃন্দ। হেফাজদের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার এবং মামলা থেকে মুক্তি চায়। একই সাথে স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে চায়।

প্রসঙ্গত, গত ৩১ আগস্ট হেফাজতের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ২১১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও ৫৩ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন করেন। তবে কমিটিতে ২০২ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটিতে প্রধান উপদেষ্টা করা হয়েছে চট্টগ্রামের সুলতান জওক নদভীকে। সিনিয়র নায়েবে আমির করা হয় খলিল আহমদ কাসেমী ও আতাউল্লাহ ইবনে হাফেজ্জী হুজুর। এছাড়া নায়েবে আমির করা হয়েছে ৪৫ জনকে। সাজিদুর রহমান মহাসচিব পদে বহাল রয়েছেন।

হাটহাজারী মাদরাসার তৎকালীন মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ২০১০ সালে হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ২০১৩ সালে ঢাকার শাপলা চত্বরে কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। তখন সংগঠনটির মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ অনেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। মামলা হয় অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এরপর হেফাজত বেশ কয়েক বছর বড় কোনো কর্মসূচি পালন করেনি। ২০২০ সালে আল্লামা শাহ আহম্দ শফীর ইন্তেকালের পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসায় প্রতিনিধি সম্মেলনের মাধ্যমে ১৫১ সদস্যের হেফাজতের নতুন কমিটি হয়। এতে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির ও আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব করা হয়। কিছুদিন পরে করোনাকালীন সময়ে আল্লামা কাসেমীর মৃত্যু হলে সিনিয়র নায়েবে আমির নুরুল ইসলাম জেহাদীকে মহাসচিব করা হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান উপলক্ষে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজত কর্মসূচি দিলে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে হতাহাতের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এক পর্যায়ে ওই বছরের ২৫ এপ্রিল এক ভিডিওবার্তার মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেন আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। অবশ্য এরপর ৭ জুন আল্লামা বাবুনগরীকে আমির করে আবারো ৩৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। চার মাস পর ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট আল্লামা বাবুনগরীও মারা যান। এরপর হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা কমিটি ও শূরা কমিটির এক নম্বর সদস্য মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে আমির করা হয়। সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট ঢাকায় হেফাজতের এক সভায় মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানকে আহবায়ক করে ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাবকমিটি গঠন করা হয় বিলুপ্ত কমিটির সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। সেই কমিটির সুপারিশের আলোকেই এখন ২১১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে চলছে হেফাজত।

 


আরো সংবাদ



premium cement