১৬ জুন ২০২৪
`

রোজা শুরু না হতেই জনজীবনে নাভিশ্বাস

টিসিবির হিসাবেই নিত্য পণ্যমূল্যের ভয়ঙ্কর চিত্র
রাজধানীর টিকাটুলীতে টিসিবির পণ্য কিনতে জড়ো হয়ে আছেন নিম্নআয়ের মানুষ : নয়া দিগন্ত -

আমদানি করা আদা এক বছর আগে দেশের বাজারে বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। গতকাল রাজধানীর বাজারগুলোতে এই আদা বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা। বছরের ব্যবধানে ১২২ শতাংশ বেড়েছে এই নিত্যপণ্যের দাম। শুকনা মরিচের দামও বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১২১ শতাংশ। এ ছাড়াও বেশির ভাগ পণ্যের দাম এমন বৃদ্ধির ফলে বাজারে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে ক্রেতাদের। দ্রব্যমূল্যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার বিভিন্ন উদ্যেগের কথা বললেও সেটি কোনো কাজেই আসছে না। ডলার সঙ্কটের অজুহাতে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির মধ্য দিয়ে কোনো চক্র বাজার অস্থির করছে কি না তা সরকারকে খতিয়ে দেখার দাবি জানাচ্ছে ক্রেতারা।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ- টিসিবির পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরের ব্যবধানে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে পাঁচটি ভোগ্যপণ্যের দাম। এর মধ্যে আটা (খোলা) ৫০ শতাংশ, আটা (প্যাকেট) ৫৬ শতাংশ, শুকনা মরিচ ১২১ শতাংশ, আদা ১২২ শতাংশ, জিরা ৬২ শতাংশ বেড়েছে।


যদিও টিসিবির এই হিসাবের চেয়ে প্রকৃত বাজারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ক্রেতারা বলছেন, টিসিবির এই তথ্যের তুলনায় আরো বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এসব নিত্যপণ্য।
গতকাল বুধবার রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা লিটার। এক বছর আগে এই তেল বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকায়। প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়। গত বছর এই সময়ে একই ছোলা বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা কেজি দরে। বাজারে এখন প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। একই ডিম এক বছর আগে বাজারে বিক্রি হয়েছে ১১০ টাকা ডজন। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি গতকাল বিক্রি হয়েছে ২৮০ টাকায়। গত বছর একই সময়ে এই মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা কেজি। একইভাবে বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি গরুর গোশতের দাম বেড়েছে ১৫০ টাকা কেজিতে। ৮০ টাকা কেজির চিনি গতকাল বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকায়। রোজায় ইফতারির প্রধান উপকরণ খেজুর গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ১৫০-৩০০ টাকায়। একই খেজুর এবার বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে।

গত রোববার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, দেশের বাজারে প্রতিটি পণ্য চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি মজুদ রয়েছে। সরকার চিনির আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের কারণে পাঁচ টাকার মতো কমবে চিনির মূল্য। শুল্ক প্রত্যাহারের সুবিধাপ্রাপ্ত চিনি অল্প কয়েক দিনের মধ্যে বাজারে আসবে। তার এই ঘোষণার পরও রোজা শুরুর আগেই ইফতারি আর কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মুড়ি, চিনি, লেবু, মাছ, মাংস, লেবু, খেজুর ও ফলের দাম উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে।

গতকাল রাজধানীর বাসাবো বাজারে গিয়ে দেখা যায় প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। অথচ এক সপ্তাহ আগেও একই লেবু প্রতি ডজন ৮০ টাকায় পাওয়া গেছে। এক থেকে দেড় মাস আগে প্রতি কেজি আখের গুড় বিক্রি হতো ১০০ টাকা কেজিতে, গতকাল তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়। খেজুরের গুড় বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। প্রতি কেজি মুড়ি বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা। প্যাকেট মুড়ির দাম আরো বেশি। চিঁড়ার দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি। ক্রেতাদের অভিযোগ, রোজায় চাহিদা বাড়ায় সুযোগ নিচ্ছে বিক্রেতারা।
ফলের বাজার ঘুরে দেখা যায়, দোকানে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফল। রোজাকে সামনে রেখে প্রতিটি ফলের দাম কেজিতে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। খুচরায় আপেল বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি ধরে। মাল্টার প্রতি কেজি ছুয়েছে ২০০ টাকার ঘর। নাশপতি ৩০০ টাকা, আনার ৪৫০ টাকা, পেঁপের কেজি ছুঁয়েছে ১০০ টাকা।

গতকাল বাসাবো বাজারে আসা ক্রেতা আফজাল হোসেন বলেন, প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়লেও আমাদের আয় বাড়েনি। মুসলিম বিশ্বে রোজার সময়ে পণ্যের দাম কমলেও আমাদের দেশে বেড়েছে। অতীতেও সিন্ডিকেটের কারণে এভাবে দাম বাড়লেও সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সরকারের লোকের বিভিন্ন সময় বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা বললেও তার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না। সারাদিন রোজা থেকে সন্তানদের সাথে নিয়ে কি দিয়ে ইফতার করব সেটাই ভাবছি।

সবজির বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে। সব থেকে কম দামের সবিজ পেঁপে। এটি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪০ টাকা দরে। এর নিচে আর কোনো সবজিই মিলছে না। আকারভেদে ফুলকপি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, শসা প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, টমেটো ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শিম প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ৯০ টাকা, চাল কুমড়া প্রতিটি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউ প্রতিটি আকারভেদে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতি কেজি ৪০ টাকা, চিচিঙ্গা ৭০ টাকা, পটোল ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ১০০ টাকা, কচুর লতি ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।

এদিকে বাজারভেদে ব্রয়লার মুরগি গত সপ্তাহের মতো ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাকিস্তানি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৮০ টাকা ও বড় কর্ক মুরগি ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে দেশী মুরগির দাম এখন প্রতি পিস (৮০০-৯০০ গ্রাম) ৫০০-৫৫০ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকায়, ছাগলের মাংস ৯০০ টাকা এবং খাসির মাংস এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে আলুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। বাজারে খোলা চিনি প্রতি কেজি ১১৫ থেকে ১২০ টাকা। খোলা আটার কেজি ৬০ টাকা। প্যাকেট আটার কেজি ৬৫ টাকা। দুই কেজির প্যাকেট আটা বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়।
দেশী মসুরের ডালের কেজি ১৪০ টাকা। ইন্ডিয়ান মসুরের ডালের কেজি ১২০ থেকে ১২৫ টাকা। সয়াবিন তেলের লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৮৭ টাকায়। লবণের কেজি ৩৮ থেকে ৪০ টাকা।

রমজানে চাহিদার শীর্ষে থাকা খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে প্রতি কেজি ছোলার দাম মানভেদে ৯০-৯৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এঙ্কর ডাল কেজিতে ৫ টাকা কমে ৬৫ টাকা, মোটা মসুর ডাল ১০০ টাকা, মোটা হাইব্রিড মসুর ডাল ১১০ টাকা, দেশী মসুর ডাল ১২০ টাকা ও মাসকালাইয়ের ডাল ২০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০ টাকা কমে মুগ ডাল ১১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া খেসারি ডাল ৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি পাঙ্গাস ১৭০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া মাছের কেজি হয়েছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা। প্রতি কেজি চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ১০০০ টাকায়। তাজা রুই, কাতলা, মৃগেল বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকা কেজি দরে। দেশী প্রজাতির টেংরা, শিং, গচি ও বোয়াল মাছের কেজি ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

 


আরো সংবাদ



premium cement