২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯ ফাল্গুন ১৪৩০, ১১ শাবান ১৪৪৫
`
সমীক্ষা ছাড়া সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ প্রকল্প

রাষ্ট্রীয় অর্থের এ কেমন অপচয়

-

আমাদের দেশে সরকারি এমন সব প্রকল্প নেয়া হয়, যা সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই গৃহীত হয়ে থাকে। এমন নজির রয়েছে বহু। ফলে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হচ্ছে দেদার। এমন একটি প্রকল্পের নাম সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ প্রকল্প। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৩৫ শতাংশ। এতে অর্থ ব্যয় হয়েছে পৌনে চার বছরে সাড়ে ১৭ শতাংশ বা ৬৯ কোটি টাকা যেখানে প্রকল্পের প্রাক্কলন ৪০৭ কোটি টাকা। পৌনে চার বছরে ১৮০টি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে আরো ১২০টি সাইটে পাম্প স্থাপনের কাজ চলমান। পরিকল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ শাখার তথ্য মতে, শুরুতে উপকারভোগী তথা কৃষক আগ্রহ দেখালেও বর্তমানে তারা আর আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কৃষকের অনাগ্রহে প্রতীয়মান হয়, প্রারম্ভে সঠিকভাবে সমীক্ষা করা হয়নি। এ ছাড়া প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধনীতে নতুনভাবে কোনো সমীক্ষাও করা হয়নি।
এ নিয়ে নয়া দিগন্তে গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পৌনে চার বছর আগে নেয়া সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পে কৃষকদের আগ্রহী করতে পারছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। আড়াই বছরের প্রকল্পটি দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও কৃষকদের টানতে পারছে না। এতে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছে এডিবির অর্থায়নের ৪০৭ কোটি টাকার প্রকল্পটি। এখন প্রকল্পের মেয়াদ সাড়ে ছয় বছরে উন্নীত ও ব্যয় ১৮৭ কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাবে পরিকল্পনা কমিশন আগ্রহী নয়। কমিশন প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখে শেষ করার সুপারিশ করেছে। মেয়াদ বৃদ্ধি ও প্রকল্প চলমান রাখায় আপত্তি জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, প্রকল্পটি ১ জুলাই, ২০১৮ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০ মেয়াদে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল। পরে প্রথম সংশোধনের সময় প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়। এ দীর্ঘ সময়ে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। এতে সহজে বোঝা যায়, এটি সঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছে না। এর এখন আর কোনো উপযোগিতা নেই। অথচ কৃষি সেচে সোলার ফটোভোল্টিক পাম্পিং সিস্টেমের বিস্তার, সেচ মৌসুমে গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ হ্রাস করা ও ডিজেলচালিত পাম্প পরিহারের মাধ্যমে দূষিত পদার্থের নির্গমন হ্রাসে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প ব্যবহারে উদ্যোগ নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (পবিবো)।
প্রকল্পটির আওতায় দুই হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প স্থাপনে আগ্রহী গ্রাহকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন করার লক্ষ্য ছিল। এ কাজের সফলতার ওপর প্রকল্পের সামগ্রিক সাফল্য নির্ভরশীল। এ জন্য আগ্রহী কৃষক সংগ্রহে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রকল্প এলাকার জনসাধারণের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প স্থাপনের সুফল তুলে ধরে গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি, মাঠপর্যায়ে উদ্বুদ্ধকরণ ও মোটিভেশন, উদ্বুদ্ধকরণে জাতীয় এবং স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, প্রকল্প বিষয়ে ভিডিও প্রচার, মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রকল্পের তথ্য প্রচার করা হয়। ফলে দুই হাজার ৮৪৯ গ্রাহক সেচ কমিটির ছাড়পত্রের আবেদন করেছেন। ছাড়পত্র পান এক হাজার ১৯৬ গ্রাহক বা কৃষক। এ পর্যন্ত ৬৩৩ গ্রাহক বা কৃষক প্রকল্পের আওতায় পাম্প গ্রহণে চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। তবে দুই হাজার পাম্প স্থাপনে পর্যাপ্ত আগ্রহী কৃষক না পাওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ বাধার সম্মুখীন।
উল্লিখিত প্রকল্পের সার্বিক চিত্র এমন হওয়ায় খোদ পরিকল্পনা কমিশন এর কাজ আর এগিয়ে নিতে আগ্রহী নয়। তা হলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, প্রকল্পটি হাতে নেয়ার আগে কেন সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলো না? ইতোমধ্যে প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। এর দায় তো কারো না কারো ওপর বর্তায়। কিন্তু দেশে বর্তমানে জবাবদিহিহীন সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় সাধারণত কাউকে কোনো ব্যর্থতার জবাব দিতে হয় না। ফলে সহজে দায় এড়ানো সম্ভব যাচ্ছে।
সবার জানা, দেশে সরকারি অনেক প্রকল্প নেয়া হয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার মতলবে, ওই প্রকল্পের কোনো সুফল না থাকলেও। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। এই লুটপাট বন্ধ না করতে পারলে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কোনো দিনও সম্ভব নয়। আমরা চাই, সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ প্রকল্প কেন ব্যর্থ হতে চলেছে, এর জন্য কারা দায়ী, তাদের শনাক্ত করে জবাবদিহি করা হোক।


আরো সংবাদ



premium cement