২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩০, ১৩ জিলহজ ১৪৪৫
`
মানবাধিকার কমিশনের সেমিনার

আন্তরিকতা নিয়ে সংশয়

-

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন তা কারো অজানা নয়। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এটি। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এলিট ফোর্স র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তার বাংলাদেশ সফর ও সুপারিশমালা নজির সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতিসঙ্ঘের কাছে অভিযোগ পেশের ঘটনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এ ছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন কিংবা ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরফে উদ্বেগ প্রকাশ বাংলাদেশে মানবাধিকারের নাজুক পরিস্থিতির প্রতিফলন।
উল্লিখিত কোনো একটি ঘটনায়ও সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উন্নয়নে তেমন কিছু করা হয়নি। শুধু আরো নিষেধাজ্ঞার শঙ্কায় র‌্যাব-পুলিশের বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো কর্মকাণ্ড আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিনের হত্যা ঘটেছে। চাপাও পড়ে গেছে। কিন্তু এ স্থিতাবস্থা কত দিন থাকবে কেউ জানেন না।
সামনে নির্বাচনের সময় আসছে। আর নির্বাচনের সময় যেসব অধিকার হরণের ঘটনা ঘটে তা কারো অজানা নয়। সেই শঙ্কার কথা উঠে এসেছে অর্থনীতিবিদ ও পল্লøীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের কথায়। রাজধানীর পাঁচতারা হোটেলে মানবাধিকার-বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি বলেন, নির্বাচনের এ বছরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা ঘটতে পারে। রাজনীতিবিদরা মানুষের জন্য রাজনীতি করেন দাবি করলেও দেখা যায়, তারা এমন কাজ করেন- যেটি মানুষের অধিকারের বিরুদ্ধে। তিনি আরো বলেছেন, নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবানরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেন। যে কাউকে মেরে নিজে এগিয়ে যেতে চান। যাদের যত ক্ষমতা তারা তত বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন করেন।
কথাগুলো তিনি বলেছেন সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সেমিনারে। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে সরকার-সমর্থক সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের বাইরে আর কেউ ছিলেন না। কোনো মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি, এমনকি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সোচ্চার যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদেরও কোনো অংশগ্রহণ দেখা যায়নি।
কমিশন হঠাৎ কী বার্তা দিতে এ সেমিনারের আয়োজন করল তা ধোঁয়াশাপূর্ণ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মূল প্রবন্ধে কমিশনের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, তারা এক মাসের বেশি সময়ে প্রায় দুই শ’ অভিযোগ আমলে নিয়েছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা করেছেন। একটি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের খরচ তাদের সুপারিশে কমানো হয়েছে। বলতেই হবে, কমিশন মস্ত বড় কাজ করে ফেলেছে! কিন্তু শুধু এই তথ্য জানাতে জনগণের অর্থ ব্যয় করে পাঁচতারা হোটেলে সেমিনার করার যৌক্তিকতা আমাদের বোধের অগম্য।
সেমিনারে যারা বক্তব্য দিয়েছেন তারা কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা খর্ব হওয়ার প্রসঙ্গ কিছুই তোলেননি। গুম-খুন না হয় বাদই দিলাম, ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকার, রাস্তায় মিছিল-মিটিং করার অধিকার খর্ব করার মতো বিষয়ও আলোচনার বাইরে ছিল। এগুলো হয়তো ওই সেমিনারের বক্তদের কাছে মানবাধিকার বলে বিবেচিত হয়নি। এমনকি একটি দল সমাবেশ করতে গেলে ক্ষমতাসীনরা যেভাবে পায়ে পাড়া দিয়ে সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে পেটোয়া বাহিনী লেলিয়ে দেন, সেই প্রসঙ্গও তুলতে বেমালুম ভুলে গেছেন।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা যে তলানিতে পৌঁছেছে তার পুনরুদ্ধারে সরকার অথবা কমিশন কী করতে পারে তারও কোনো দিক-নির্দেশনা দূরের কথা, আলোচনায় জায়গা পায়নি। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না, মানবাধিকার রক্ষার অ্যাজেন্ডা নিয়ে নয়; বরং এ সেমিনারের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। সরকার বা কমিশনের ওপর জনগণের যে আস্থাহীনতা বিদ্যমান তা মতলবি একপেশে সেমিনার করে কাটবে বলে মনে হয় না।
আমরা মনে করি, জাতিসঙ্ঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ ও দেশের সংবিধানস্বীকৃত নাগরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সুরক্ষায় কমিশনকে সব ধরনের পক্ষপাতিত্ব ও ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের অধীনে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সেটি সম্ভব কিনা তা নিয়ে আমাদের ঘোরতর সংশয়।


আরো সংবাদ



premium cement