২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩০, ১৩ জিলহজ ১৪৪৫
`

বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল নিয়ে দিশেহারা মানুষ

বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল নিয়ে দিশেহারা মানুষ। - ছবি : সংগৃহীত

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বাংলাদেশের মানুষ যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন গ্যাস ও বিদ্যুতের অতিরিক্ত দাম নিয়ে সংসারের হিসাব সমন্বয় করতে তারা দিশেহারা হচ্ছেন।

গত এক বছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, বহু পরিবারে শুধু বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল বাবদ খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে সীমিত আয়ের মানুষ।

শহর ও গ্রামের বাসিন্দারা বলছে, জিনিসপত্রের এ রকম মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবনযাপন কঠিন করে তুলেছে।

নতুন চাপ বিদ্যুতের দাম
জানুয়ারি মাসে এক দফা বাড়ানোর পর ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকেই আরেক দফা বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। ফলে শুধু আবাসিক বিদ্যুৎ বাবদ মাসিক খরচ ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এর আগে সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০২০ সালের শুরুতে।

এখন সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রতি মাসেই বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হতে পারে।

ঢাকার বাসিন্দা শাহনাজ চৌধুরীর বলছেন, ‘হিসাব করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, তাও মাসে বিল আসে দেড় হাজার, দুই হাজার টাকা। টিভি, ফ্রিজ তো বন্ধ করেও রাখতে পারি না। এখন সরকার বিল আরো বাড়িয়েছি, কারেন্টের বিল তো আমার বাজেট ছাড়িয়ে যাবে।’

ঢাকার কলাবাগানের এই বাসিন্দা বলছেন, ’নানারকম কাটছাঁট করার পরও গত এক বছরে তার সাংসারিক খরচ দেড়গুণ বেড়েছে। কারণ বাজারের প্রতিটা জিনিসের দাম বেড়েছে। এক বছর আগেও যে দামে আটা-চিনি কিনতাম, এখন তার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। চাল, ডাল, তেলসহ প্রতিটা জিনিসের দাম বেড়েছে। আমাদের আয় তো ওই হিসাবে বাড়েনি। সংসারে আর কোন খরচটা বাদ দেবো? ছেলেমেয়ের স্কুলের পড়ার খরচ বেড়েছে, যাতায়াত খরচ বেড়েছে, বাড়িভাড়া বেড়েছে।’

বাংলাদেশের সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, ভর্তুকি কমাতে এখন থেকে প্রতি মাসেই বিদ্যুৎ খরচ সমন্বয় করা হতে পারে।

শাহনাজ চৌধুরীর মতো অনেকের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ খরচ বাড়ার কারণে হয়তো এখন পানিসহ অন্যান্য খরচও বেড়ে যাবে।

শাহনাজ চৌধুরীর মতো বরগুনার বাসিন্দা লায়লা আঞ্জুমানের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে গ্যাসের সিলিন্ডার।

রাতারাতি বেড়ে গেছে গ্যাসের দাম

লায়লা আঞ্জুমান জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও ১২ কেজির যে লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডার তিনি এক হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন, দু’দিন আগে সেটাই তাকে কিনতে হয়েছে এক হাজার ৭০০ টাকা দরে।

তিনি বলেন, ‘কোনো কারণ বুঝতে পারছি না। সরকারের নির্ধারিত দাম এক হাজার ৩০০ টাকার নিচে, তাও সেটা দিতাম। এখন দোকানদাররা বলছে যে এক হাজার ৭০০ টাকার নিচে সিলিন্ডার নেই।

এমনকি এলপি গ্যাসের দাম সরকার নির্ধারণ করে দিলেও বরাবরই অভিযোগ ওঠে যে বাজারে এর চেয়ে অনেক বেশি দাম নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এখন এলপি গ্যাসের দাম যেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে।

রসিকতা করে তিনি বলেন, সব জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। গ্যাসেরও দাম এমন বেড়েছে যে, এখন চাইলেই যে আলু সিদ্ধ করে খাবো, তারও উপায় নেই।

এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার আবু জাফর বলছেন, ‘মার্কেটে সিলিন্ডারের সাপ্লাই কম। কোম্পানি থেকে নাকি মাল আসছে না। আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে বিক্রিও করতে হয় বেশি।’

শাহনাজ চৌধুরী বলেন, ‘মাত্র কয়েক দিনে সিলিন্ডারের দাম চার/পাঁচ শ’ টাকা বেড়ে গেছে। দেখার কেউ নাই। এখন আমাদের তো না কিনেও উপায় নেই, তাহলে রান্না-বান্না বন্ধ হয়ে যাবে। এখন সংসারের আরেক খরচের কাটছাঁট করতে হবে।’

শাহনাজ চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েক মাসে শখের কোনো জিনিসপত্র কিনিনি, তাহলেই বোঝেন কিভাবে সংসার চালাচ্ছি!’

তবে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, বাজারে এলপি গ্যাসের কোনো সঙ্কট নেই।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সচিব ব্যারিস্টার মো: খলিলুর রহমান খান একটি পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমাদের কাছে গ্যাসের সঙ্কটের কোনো তথ্য নেই। বরং দেশে যথেষ্ট পরিমাণে এলপিজি মজুত আছে।’

যদিও এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সঙ্কটের কারণে আরো অনেক খাতের মতো ঋণপত্র খোলা নিয়ে জটিলতায় পড়েছেন এলপিজি অপারেটরগুলো। বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি সঙ্কটে পড়েছে। এই কারণে সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই কারণে আগেভাগেই দাম বাড়াতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা।

মানুষের কষ্ট বাড়ে
বাংলাদেশে গত বছর রেকর্ড পরিমাণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর খাদ্যদ্রব্য, পরিবহন থেকে শুরু করে সব জিনিসপত্রের দাম এক দফা বেড়েছে।

তার ওপর ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে প্রায় সব জিনিসের দাম বেড়েছে, যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সীমিত বা নিম্ন আয়ের আয়ের সাধারণ মানুষ।

মনোয়ারা বেগম তিনটা বাসায় কাজ করেন। এক বছর আগেও সেই আয়ে তার চলে যেতো। কিন্তু এখন আর তার পক্ষে কোনোমতেই সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন জিনিসের দাম বাড়ে, আমাদের বেতন তো বাড়ে না। মাছ, মাংস বাদ দিলাম, সবজি খাওয়াও তো কঠিন এখন। এই যে গ্যাসের দাম বাড়াইছে, বিদ্যুতের দাম বাড়াইছে, এখন তো আমাগো বাড়িওয়ালা ভাড়াও বাড়াবে। কত দিন শহরে থাকতে পারবো জানি না।’

তিন বাসায় কাজের ফাঁকে এখন তিনি টিসিবির গাড়ি থেকে পণ্য কেনার জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ রাখেন। বিকল্প হিসেবে তিনি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান বলছেন, ‘এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বেশি। তার সাথে সাথে যদি বিদ্যুতের, গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে মানুষের কষ্ট বাড়বে। তাদের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সাথে অনেক কিছুর সম্পর্ক আছে। ফলে এসব জিনিসের যখন দাম বাড়ে, তখন অন্য পণ্যের দামও বেড়ে যায়।’

তিনি আরো বলেন, গত বছরের মূল্যস্ফীতির যে রিপোর্ট, তাতে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়েছে যে গত বছর যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হল, তখন থেকেই দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করেছে। জিনিসপত্রের দাম এমনভাবে বাড়ছে যে, মানুষ পাল্লা দিয়েও খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না।

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ



premium cement