১৪ জুলাই ২০২০

১০ লাখ নতুন করদাতা শনাক্তের টার্গেট

বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপের চাপ সত্ত্বেও আগামী অর্থবছরে বিদ্যমান করপোরেট কর হারের কোনো পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে না সরকার। কারণ এ কর কমানো হলে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতায় যে বিশাল টার্গেট দেয়া হচ্ছে তা অর্জন দূরে থাক, এর ধারে-কাছেও যাওয়া সম্ভব হবে না। অন্য দিকে, একই কারণে ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর মওকুফের সীমাও বাড়ানো হচ্ছে না বলে জানা গেছে। উপরন্তু আগামী অর্থবছরে অন্ততপক্ষে ১০ লাখ নতুন করদাতা খুঁজে বের করার জন্য একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেয়া হচ্ছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার আয়কর কর্মকর্তাদের টার্গেট দিয়ে দেয়া হবে। তারা নতুন আয়করদাতা খুুঁজে বের করার বিষয়টি সার্বিকভাবে তত্ত্বাবধান করবেন।

নতুন আয়ের উৎস হিসেবে অনলাইনে ব্যবসায় ওপর ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে। বাড়বে কিছু বিলাসবহুল পণ্যের ওপর কর। তবে করোনা সম্পর্কিত যাবতীয় চিকিৎসাসামগ্রীর আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। একই সাথে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর আমদানিতে থাকবে কর রেয়াত। অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ব্যবসায়ীরা অনেক দিন ধরেই করপোরেট কর কমানোর দাবি করে আসছেন। কিন্তু করপোরেট হারে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। করোনার কারণে বড় বড় করপোরেট হাউজের এ দাবি এখন আরো জোরালো হচ্ছে। কিন্তু তাতে আপাতত কোনো ‘চিঁড়ে ভিজছে’ না। প্রথম দিকে করপোরেট কর কমানোর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও এনবিআরের বিরোধিতার কারণে সেটির পরিবর্তন হয়েছে বলে জানা গেছে। এনবিআরের মন্তব্য হচ্ছে, করোনার কারণে এমনিতেই রাজস্ব আদায়ের অবস্থা আগামী বছরের প্রথম তিন মাস ভালো হবে না। এখন যদি আবার করপোরেট কর কমিয়ে দেয়া হয় তখন বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে বিশাল টার্গেট দেয়া হয়েছে তা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

উল্লেখ্য, আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে রাজস্ব আয়ের টার্গেট দেয়া হচ্ছে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে করপোরেট করের কয়েকটি স্তর আছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার ২৫ শতাংশ। আর তালিকাবহির্ভূত বা সাধারণ কোম্পানির কর হার ৩৫ শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর হার ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর ৪০ শতাংশ। আর মার্চেন্ট ব্যাংকের কর হার ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। সিগারেট কোম্পানির কর হার ৪৫ শতাংশ। মোবাইল অপারেটরে ৪৫ শতাংশ করপোরেট কর বিদ্যমান রয়েছে। এ ছাড়া পোশাক খাতে করপোরেট কর ১০-১২ শতাংশ। বস্ত্র খাতে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ, পাটকলে ১০ শতাংশ। এগুলোর কোনোটার পরিবর্তন করা হবে না বলে জানা গেছে।

বাড়ছে না ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর মওকুফের সীমা : বেশ কয়েক বছর ধরে ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর মওকুফের সীমা আড়াই লাখ টাকায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। অর্থাৎ কারো বার্ষিক আয় আড়াই লাখ টাকা হলে তাকে আয়কর দিতে হয় না। বিভিন্ন সময় এ সীমা বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি জানানো হয়েছে। করোনার কারণে এখন সাধারণ মানুষের অবস্থা খুবই খারাপ। ফলে এবার মনে করা হয়েছিল আগামী অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর মওকুফের সীমা বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হবে। কিন্তু সেটি আর হচ্ছে না বলে জানা গেছে। ফলে আগামী অর্থবছরেও ব্যক্তিশ্রেণীর আয়কর মওকুফের সীমা আড়াই লাখ টাকার ঘরেই থাকছে। তবে শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে এ বিষয়ে পরিবর্তন এলেও আসতে পারে বলে এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

অনলাইনে ব্যবসার ওপর ভ্যাট বসছে : করোনার কারণে বর্তমানে অনলাইনে ব্যবসায় জমজমাট অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে দুই মাসব্যাপী লকডাউনের সময় শহরে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ক্রয়ের অন্যতম মাধ্যম ছিল অনলাইন। সে সময় চাল-ডাল, ইভ্যালি, দারাজ, পাঠাও ফুডসহ বিভিন্ন অনলাইন-নির্ভর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ছিল রমরমা। জানা গেছে, দেশের অন্যতম বৃহত্তম অনলাইন গ্রোসারি শপ ‘চাল-ডাল’ এর বিক্রি ১০ থেকে ১৫ গুণ বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এসব মাধ্যম থেকে পণ্য কিনলে কোনো ভ্যাট দিতে হয় না। কিন্তু আগামী অর্থবছরে অনলাইনে ব্যবসায়ের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হতে পারে।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগের আওতা বাড়তে পারে : বর্তমানে শিল্প ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। বিদ্যমান করের সাথে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যায়। আবাসন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে এ সুযোগ নেয়া যায়। আসন্ন বাজেটে ক্ষেত্রবিশেষে জরিমানা উঠিয়ে দেয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে এনবিআর কোনো প্রশ্ন করবে না। আগামী দুই বছরের জন্য এ সুযোগ দেয়া হতে পারে। পুঁজিবাজারসহ কয়েকটি খাতে এ সুযোগ দেয়া হতে পারে। মূলত বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যই এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তবে স্পর্শকাতর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি রাষ্ট্রের শীর্ষপর্যায়ের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

করোনা সম্পর্কিত চিকিৎসাসামগ্রী আমদানি করমুক্ত থাকবে : আগামী বাজেটে করোনা সম্পর্কিত যাবতীয় চিকিৎসাসামগ্রী আমদানি করমুক্ত ঘোষণা করা হবে। একই সাথে আইসিইউ, ভেন্টিলেটর আমদানি শুল্কমুক্ত থাকবে। শুধু তা-ই নয়, এসব সামগ্রী উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দেয়া হবে বলে জানা গেছে।


আরো সংবাদ