১৮ মে ২০২৪, ০৪ জৈষ্ঠ ১৪৩১, ০৯ জিলকদ ১৪৪৫
`


একটি নিস্তব্ধ রাতের গল্প

-

রাত খুব গভীর হয়নি তখনো। ১২টা কউ ১টা। কয়েকদিন পরেই প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা শুরু হবে। তাই একটু রাত করেই পড়ছিলাম। পড়ার ফাঁকেই হঠাৎ আনমনা হয়ে গেলাম। বাইরে একটানা ঝিঁঝিপোকারা ডেকে যাচ্ছে। ভ্যাপসা গরম। উত্তরের বাতাসেও গরম একটুও কমছে না। পড়ার টেবিলের উপর ঘড়িটা ক্লান্তহীনভাবে টিকটিক করে যাচ্ছে। পড়ার টেবিলের পাশেই ব্যালকনি। উত্তরের বাতাসে দরজার চৌকাঠে লাগানো ডোরবেলটা টুন টুন করে মৃদু শব্দে বেজে যাচ্ছে। কী মোহনীয়! ব্যালকনির সার্লি বেয়ে নেমে যাওয়া অপরাজিতা আর পুঁইশাকের নরম কচি পাতাগুলো মাতালের মতো দুলছে। রাতের আকাশ দেখার লোভে ছুটে গেলাম ব্যালকনিতে। গভীর রাত। কয়েকটা ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়াম বাতি ছাড়া কোনো আলোর অস্তিত্ব নেই। কী ঘোর অন্ধকার! আকাশে কত শত তারা। কয়েকটা তারা অন্যগুলোর চেয়ে একটু বেশি ঝলমলে। হয়তো এই মাহেন্দ্রক্ষণেও এ শহরে কিছু জীবনে কত পাওয়া না পাওয়া আর উত্থান পতনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, কতটাই বা জানি তার। এলোমেলো ভাবতে ভাবতে খুব অন্যমনষ্ক হয়ে গেলাম।

আচমকা অনেক মানুষের চিৎকার শুনতে পেলাম। ভয়তো পেলামই, একটু অবাকও হলাম বটে। আশপাশে চেয়ে দেখলাম কোথাও কোনো মানুষ নেই। চিৎকারটা এলো কোথা থেকে ভাবতেই মনে পড়ে গেল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ চলছে। হয়তো গোল হয়েছে। প্রায় ভুলতেই বসেছি ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের কথা। অবশ্য মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক। আগের মতো উন্মাদনা কাজ করে না এখন আর। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় এলেই এই মধ্যবিত্ত পরিবারে আগে আনন্দের বন্যা বয়ে যেত। বাবার সাথে বসে খেলা দেখার মধ্যে যে কী আনন্দ ছিল। খেলা বুঝতাম বা না বুঝতাম টিভির সামনে বসে যখন বাইরে অনেক মানুষের উল্লøাস ধ্বনি শুনতাম, বুঝতাম গোল হয়েছে, তাতেই আমারও চিৎকার শুরু হয়ে যেত। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা নামে কোনো দল বুঝতাম না। বাবা যতই বোঝাতেন ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা দুটো দেশ, দুটো দল আমি মানতে নারাজ। বিশ্বকাপ মানেই আমি ভাবতাম একটা দল, ব্রাজেলটিনা!
আর আমার দেখাদেখি ছোটুও তখন ব্রাজেলটিনার সমর্থক। রাত জেগে থাকলে যদিও বাবা খুব বকতেন, আমাদের উন্মাদনা দেখে মাঝে মধ্যে শাসনের ছলে প্রশয়ও দিয়ে যেতেন। শাসনের আদলের প্রশ্রয়গুলো আমাদের উন্মাদনা আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিত। আজকাল বাবাকে ছাড়া আর রাত জেগে খেলা দেখতে ইছে করে না। বাবা এসে বকা দেবেন না বলে রাত জাগার মধ্যে কোনো আনন্দ খুঁজে পাই না।

আমাদের মফস্বলে তখন জনবসতি খুবই কম। হাতেগোনা কয়েকটা টিনের ঘর ছিল। আমাদের বাড়িটা গ্রামের ঠিক মধ্যে। বাড়ির জায়গাটা খুব উঁচু ছিল বলে অনেকেই টিলা বলত বাড়িটাকে। জায়গাটা উঁচু ছিল বলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যেত বাড়ি থেকে। আশপাশে যতদূরে চোখ যায় ধানক্ষেতই দেখা যেত বেশি। বিস্তৃত সে ধান ক্ষেতগুলোর মধ্যে কয়েক শত বছর ধরে বিশাল এক বট বৃক্ষ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ময়ে কত দোল খেতাম দাদীর কাছে সে গাছের গল্প শুনে। চাকরির কারণে বাবা বাড়ি থাকতেন না। দাদাভাইও থাকতেন নিজের ব্যবসায় ব্যস্ত। আমাদের ছয়জনের পরিবারটার নির্ঝঞ্ঝাটে সময় চলে যেত। দিনে মা থাকতেন সংসারের কাজ নিয়ে আর দাদু মেতে থাকতেন গ্রামের অন্য মুরব্বিদের সাথে গল্পের আসরে। আমি, বড় দিদি আর ছোটু মিলে মাঝে মধ্যে দাদুর গল্পের আসরে হামলা করে আসতাম। আর তাই মা আমাদের ব্যস্ত রাখতে তিনজনকেই উঠোনে শীতল পাটি বিছিয়ে পড়তে বসিয়ে দিতেন। সেই তিনটি শিশুপ্রাণে লেখাপড়া মানেই একটা যন্ত্রণা। আর শাস্তি হিসেবে এ যন্ত্রণা পাওয়ার ভয়ে আমাদের দুষ্টুমির মাত্রাও কমে আসত।
একদিন সকালের রোদে বসে আমরা যখন লেখাপড়ায় মগ্ন তখন হঠাৎ করে দাদু মাকে ডাক দিলো, ‘বউ! খোকন আসছে!খোকন আসছে!’
চাকরির কারণে মাস দেড় দুয়েক পরপর বাড়ি আসতেন বাবা। বাবার এই আগমন সবসময়ই আমাদের জন্য যেন বিজয়ের! আমাদের তিনজনের ছোট্ট দলটা দৌড়ে যেয়ে আঁকড়ে ধরলাম বাবাকে। বাবার দু’হাতে তখন বড় বড় বাজারের ব্যাগ। চাঁদপুর থাকেন বাবা। তাই প্রতিবার বাড়িতে ফেরার সময় নিয়ম করে নদীর বড় বড় তাজা মাছ নিয়ে আসেন। বড় বড় মাছে আমাদের আনন্দ বা বিস্ময় না থাকলেও এই মাছের কারণেই যেন আমাদের ঈদের আনন্দ হয়। বাবা বাড়িয়ে এলেই আমাদের ছোট করে চড়াইভাতি হয়ে যায়। কারণ বাড়ি ফিরে গ্রামের মুরব্বিদের সাথে নিয়ে প্রথমবেলা খেতে বসেন বাবা। তাজা ইলিশ মাছ ভাজা আর ধোঁয়া উঠা গরম ভাত সেদিন সবার সাথে বসে অমৃতের মতো গিলি।
শুধু আমরা নই, গ্রামের অনেক মানুষের কাছেই বাবা বাড়ি আসা মানেই বিশাল কিছু। বাবা এলে আমাদের পড়ালেখায় নতুন এক মাত্রা যোগ হতো। কারণ তার মুখনিঃসৃত কথায় যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতাম। কত গল্প শোনাতেন বাবা। আমরা তিন ভাইবোন তখন হারিয়ে যেতাম বাবার মুখের বুলিতে গড়ে তোলা রূপকথার জগতে। কিন্তু বেশি দিন বাবার সান্নিধ্য পেতাম না আমরা।

সপ্তাহখানেক বাড়ি থেকেই বাবা আবার চলে যেতেন তার গন্তব্যে।
আমাদের পরিবারটাও এ নিয়মে এক, দুই করে বছর পার করতে লাগল। আমরাও বড় হলাম। ভালো মানের শিক্ষার জন্য শহরমুখী হলাম। বাবারও চাকরির স্থান বদল হলো। তাই সমাপ্তি হলো বাবার জন্য মাসখানেক ধরে অপেক্ষার, সাথে বাবাকে প্রতিদিন দেখতে পাওয়ার বিরাট এক সৌভাগ্য হলো। শহরে নতুন বাড়ি হলো। বাসায় নতুন টিভি এলো। রঙিন পর্দায় তখন সংবাদের বিস্তার ছিল বেশি। তখন থেকেই ক্রিকেট বা ফুটবল কোনো খেলাই দেখতে ভুল করতাম না। সাথে থাকত বাবা, আমাদের তিনজনের দল, আর আমার বৃদ্ধ ছেলেমানুষ দাদাভাই। গরম চা বা মুড়িভাজা খেতে খেতে আমাদের খেলা দেখার আসর বেশ মুখরিত হয়ে উঠত।
স্কুল ছুটির দিনগুলোতে আমরা তিনজন মিলে বাবার সাথে হাঁটতে বের হতাম। বাসার পাশের স্টেশনে রেললাইন ধরে অনেকটা হাঁটতাম। তারপর অনেক বেলা করে বাবার সাথে বাজারে ঘুরে তাজা শাকসবজি কিনে বাসায় ফিরে আসতাম।
সেবার শীতের তীব্রতা ছিল খুব বেশি। শহরেও তখন শীত নেমে এসেছে। কুয়াশাও শীতের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল। যত যাই হোক বাবা তীব্র শীতেও ভোরে নামাজ পরেই হাঁটতে বের হতেন। প্রচণ্ড শীতে আমাদের যাওয়া বারণ। আমরা গেলাম না।
কিন্তু কুয়াশা না সরলেও বেলা তখন অনেক হয়েছে, ১০টারও বেশি। মা ফাঁকে ফাঁকে বাবাকে কয়েক চোট বকে নিচ্ছেন তখনো বাজার করে ফেরেনি বলে।
আমরা সবাই তখন চায়ের আসরে ব্যস্ত। হঠাৎ দরজায় কড়া নড়তেই মা বাবাকে বকতে বকতে দরজা খুলে দিলেন। তবে বাবা আসেননি। বাবার নিথর দেহের খবর নিয়ে যেন বিরাট দানবাকার এক দূত এলো। আমরা ছুটে গেলাম রেললাইনে।

প্রচণ্ড শীতে কানটুপি আর মাফলার পরে থাকায় বাবা আমার শুনতে পাননি ট্রেন আসার শব্দ। কুয়াশার কারণে খেয়াল করেননি দূরে জ্বলতে থাকা রেডলাইট।
লোকের হাহাকারে চার পাশ বিষিয়ে উঠেছিল। আমরা বাক্যহারা হয়ে গেলাম। তাকাতে পারছিলাম না বাবার নিথর দেহটার দিকে। বুঝে উঠতে পারছিলাম না সেই মুহূর্তে আমাদের কী করা উচিত। সব কেমন নিভে যাচ্ছিলো যেন। চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। সে শুধু খেয়াল করলাম পানির অভাবে কয়েকটা তাজা মাছ বাবার নিথর দেহের পাশে ছটফট করে যাচ্ছিল।...
কোথায় ভীষণ শূন্য শূন্য বোধ হতে লাগল। এই শূন্যতা ভাবটাকে পুষে রেখেই তো আমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। আমি তো সামনে এগিয়েই যাচ্ছি, পেছনে থেকে যাচ্ছে এক করুণ গল্প। আজ এই পরিস্থিতিতে এসেও আমরা ভালো আছি; কারণ এর পেছনে আমার বাবার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের গল্প আছে। আমাদের মাথার উপর ঠাঁই দিতে যেয়ে নিজের গড়ে তোলা এই ঘরে তারই সবচেয়ে কম সময় থাকা হয়েছে।
রাত অনেক হয়েছে। ঘরে যাবো ভাবতেই পেছনে ফিরে দেখি মা দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝতেই পারিনি কখন এসে দাঁড়িয়েছেন। চোখে ঘুম, তবুও কী ভাবলেশহীনভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। হয়তো বুঝতে পেরেছেন আমার ভাবনাগুলো। আমার মতো হয়তো তিনিও অতীতে চলে গেছেন। আমি ডাকলাম না তাকে। একটু ঘুরে আসুক সে অতীত থেকে যেখানে আমার বাবাকে খানিক ছুঁয়ে দেয়া যায়।


আরো সংবাদ



premium cement