বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) মাস জুড়ে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত এক মাসেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে রয়েছে ছাত্রদল-শিবির, গণিত-সাংবাদিকতা ও ইংরেজি-অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংঘর্ষ। বারবার সংঘর্ষের পেছনে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’কেই দায়ী করছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনোটিরই সুনির্দিষ্ট বিচারের পদক্ষেপ নেইনি প্রশাসন।
গত ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলে ডেকে নিয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো: ইনামুল হকের ওপর ইতিহাস বিভাগের কিছু শিক্ষার্থী হামলা করে। হলের দ্বিতীয় তলার করিডোরে এই ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ইনামুল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো: মোশাররফ হোসেন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অংকন ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবসহ ২০-২৫ জনকে অভিযুক্ত করেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সাকিবও ইনামুল হকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দেয় প্রক্টর অফিসে। ঘটনা তদন্তের জন্য চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও কমিটি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
তার ঠিক পাঁচদিন পর ২০ জুলাই গণিত এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহে জন্য সাংবাদিকরা উপস্থিত হলে তারাও হামলার স্বীকার হন। সংঘর্ষটির তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
এ ঘটনার ঠিক কয়েকদিন পরে আইন-সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায়ও কোনো বিচার করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গত ৫ আগস্ট অদম্য জুলাই মিছিলে বহিরাগত অভিযোগে শিবির-ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মনিরুল ইসলামের পায়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীও ঘটনাস্থলে আহত হন। এ সংঘর্ষের উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শিবির ও ছাত্রদলের সাথে বসলেও দৃশ্যমান কোনো বিচার বা পদক্ষেপ নেয়নি।
গত শনিবার অর্থনীতি বিভাগের জুনিয়র মেয়েকে সিনিয়র ছেলের প্রেমের প্রস্তাব ও উত্ত্যক্তের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইংরেজি ও অর্থনীতি বিভাগের মধ্যে গভীর রাত পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হন অন্তত ১০ জন। হাসপাতালে নেয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে আহতদের ও অ্যাম্বুলেন্স চালককে মারধরের মতো ঘটনাও ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস জুড়ে সংঘর্ষের দায়ভার আমি প্রশাসনকেই দিব। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি জন্য বার বার সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে একটি মহল ও শিক্ষার্থীরা। যদি প্রশাসন অতীতের ঘটনাগুলোর সুস্থ তদন্তের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করত তাহলে বার বার সংঘর্ষ ঘটতো না। আমি এটাই মনে করি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মুস্তাফিজুর রহমান সৌরভ বলেন, ‘অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে এ সকল সংঘর্ষের ঘটনা এড়ানো যেত। শাস্তি নিশ্চিতে হলে সবার কাছে একটি মেসেজ যেত, যাতে করে এ সকল সংঘর্ষ আর ঘটত না। ঘটলেও সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়ত না। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রশাসনের উচিত সুস্থ তদন্তে অপরাধীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ভঙ্গের আইনে নিয়ে এসে শাস্তি নিশ্চিত করা।’
ববি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন শান্ত বলেন, ‘যখন ইতিহাসের সাথে বাংলা বিভাগের জুনিয়র-সিনিয়র সংঘর্ষ হলো তখন ওইটার বিচারহীনতায় পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে আইন বিভাগ, গণিত সাথে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং অর্থনীতির সাথে ইংরেজী বিভাগের সংঘর্ষ ধারাবাহিকভাবে ডিপার্টমেন্ট বাই ডিপার্টমেন্ট চলতেই থাকে। যদি অতীতের ঘটনার সুস্থ ভাবে বিচার হতো তাহলে এতো দূর পর্যন্ত গড়াতো না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো: মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, ‘সংঘাতে জড়িত বিভাগগুলোর চেয়ারম্যানদের নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এসব অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে মাদকের বিস্তার থাকতে পারে বলে আমাদের সন্দেহ। এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন শৃঙ্খলা কমিটি ও পরে সিন্ডিকেটে যাবে। সিন্ডিকেটই চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: মামুন অর রশিদ বলেন, ‘ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিচার হবে।’



