গ্যাস সঙ্কটে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে অবস্থিত ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। গত ১০ জুলাই থেকে টানা ২৭ দিন ধরে কেন্দ্রটি অচল থাকায় ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ সঙ্কট। কোথাও দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, আবার গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) আওতাধীন এ কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস সঙ্কটে ভুগছে। বর্তমানে গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে, ২১০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রটি স্বাভাবিক সময়ে যেখানে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারত, সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ গত ২৬ দিন ধরে উৎপাদন নেমে এসেছে শূন্যে।
দেড় হাজার কোটি টাকার কেন্দ্র, উৎপাদন শূন্য
ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং শিল্পায়নের সম্ভাব্য বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনায় ১৯৯৭ সালে শম্ভুগঞ্জে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তিন ধাপে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে আরপিসিএল। কেন্দ্রটিতে গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নির্মাণ করে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)।
কিন্তু নির্মাণের পর থেকেই নানা সময়ে গ্যাস সঙ্কটে কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের পর দেশে গ্যাসের সঙ্কট তীব্র হলে এ কেন্দ্রেও সরবরাহ কমতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে সীমিত গ্যাসে কোনোরকমে উৎপাদন চালু রাখা হলেও বর্তমানে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
আরপিসিএলের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোনো কোনো মাসে কেন্দ্রটির উৎপাদন ৪০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৪৫ শতাংশ। এর আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে।
অন্য কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কম
শুধু শম্ভুগঞ্জের কেন্দ্রটিই নয়, একই সময়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলের আরো দু’টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দৈনিক তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। তবে নগরবাসীর দাবি, বাস্তবে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে গ্যাসও নেই
নগরীর কাঁচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা ও নারী উদ্যোক্তা শেফালী আক্তার বলেন, ‘আগে দিনে এক-দুবার লোডশেডিং হলেও এখন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। রাতেও একই অবস্থা।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিবারই প্রায় এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। এর সাথে বাসায় গ্যাস সঙ্কট লেগেই আছে। একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে গ্যাস নেই—কীভাবে রান্নাবান্না করব? কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এই সঙ্কট কবে শেষ হবে, কেউ কিছু বলছে না।’
গ্রামে ১২-১৫ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ
বিদ্যুৎ সঙ্কটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে গ্রামাঞ্চলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে সেচ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, খামার ও গৃহস্থালি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ মানুষ। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে তাদের দুর্ভোগ বাড়ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎনির্ভর খামারগুলোতেও বাড়ছে ক্ষতির আশঙ্কা।
গ্যাস পেলেই উৎপাদন শুরু হবে
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ বলেন, গ্যাস সঙ্কটের কারণে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২৬ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের বিদ্যুৎ সরবরাহে।
তিনি বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বর্তমানে কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলে দ্রুতই কেন্দ্রটিতে আবার উৎপাদন শুরু করা যাবে।’
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সঙ্কটে পড়ে বিপুল অর্থে নির্মিত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কাজে না লাগায় প্রশ্ন উঠেছে বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়েও। একই সাথে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ময়মনসিংহ বিভাগের বিদ্যুৎ সঙ্কট কবে কাটবে—তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।



