২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০, ১৮ শাবান ১৪৪৫
`

পুরান ঢাকা থেকে শিগগিরই সরছে না রাসায়নিক গুদাম

-

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পরও পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানো হয়নি। যে দু’টি জায়গায় রাসায়নিক গুদাম সরানোর কথা, সবে তার একটিতে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। অন্যটিতে বাস করছে তিন শতাধিক বস্তিবাসী। ফলে শিগগিরই রাসায়নিক ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছে না পুরান ঢাকা।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পরপরই পুরান ঢাকা থেকে দ্রুত রাসায়নিক গুদাম সরাতে উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তখন অস্থায়ীভাবে শ্যামপুরে উজালা ম্যাচ কারখানা ও গাজীপুরের টঙ্গীর কাঁঠালদিয়া মৌজায় রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্প পাস হতে বেশি সময় লেগে যায়। এখন তড়িঘড়ি করে এ দু’টি প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হবে।
২০১৯ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ৭১ জনের মৃত্যু হয়। কয়েক শ’ মানুষ আহত হয়। তখন পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা স্থানান্তরের বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে গত বছরের ২৭ ফেব্র“য়ারি এক সভায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাসায়নিক গুদাম অপসারণের ঘোষণা দিয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়।
চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের আগে ২০১০ সালে নিমতলীতে আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যুর পরও পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের ব্যবসা মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে সরিয়ে নিতে রাসায়নিক শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু এ প্রকল্প চূড়ান্ত করতেই লেগে যায় ৯ বছর। এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন শ্যামপুর ও টঙ্গীতে রাসায়নিকের যে অস্থায়ী গুদাম নির্মাণের কথা, সেগুলো যথাসময়ে শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডের পর সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি যে ১৭টি কাজের সুপারিশ করেছিল, সেগুলোর একটিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। রাসায়নিক গুদাম অপসারণে গড়িমসি করছে সরকার। এখন রাসায়নিক অগ্নিকাণ্ডে আরেকটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কে নেবে?
গাজীপুরের টঙ্গীর কাঁঠালদিয়া মৌজায় পৃথক প্রকল্পের মাধ্যমে আরেকটি গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি)। অথচ বিএসইসি মালিকানাধীন এই জমিতে তিন শতাধিক পরিবার বাস করছে। এখন তাদের কবে অপসারণ করা হবে বা রাসায়নিক গুদাম নির্মাণের কাজ কবে শুরু হবে, তা স্পষ্ট নয়।
গত বুধবার দুপুরে সরেজমিন বিএসইসির এ জায়গায় বস্তির পাশাপাশি দোকানপাট, গ্যারেজ, হরেক রকমের ছোট ছোট কারখানা দেখা গেছে। বস্তির বাসিন্দারা জানান, এ জায়গায় রাসায়নিক গুদাম হবে, তারা সেটি জানেন। এরই মধ্যে কিছু বাসিন্দা চলে গেছেন। বাকিরা ক্ষতিপূরণের আশায় রয়েছেন।
বিএসইসি সূত্র জানায়, টঙ্গীতে ছয় একর জমিতে অস্থায়ী রাসায়নিক গুদাম নির্মাণে পৃথক আরেকটি প্রকল্প পাস হয়েছে। এখানে ৫৩টি রাসায়নিক গুদাম নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে বস্তি অপসারণসহ কিছু কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে।
এই রাসায়নিক গুদাম নির্মাণে প্রকল্প পরিচালক ও বিএসইসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টিল ওয়ার্ক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ৪ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের সাথে তাদের চুক্তি সই হয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে রাসায়নিক গুদাম নির্মাণে কাজ শুরু হবে। চলতি বছরেই নির্মাণকাজ শেষ হবে। এর আগেই নিজের মালামাল নিয়ে বস্তির লোকজন হয়তো সরে যাবেন।

রাসায়নিকের গুদাম সরানোর নির্দেশনা মানা হচ্ছে না
পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কেন মানা হচ্ছে না, তা জানতে চেয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় আটটি বেসরকারি সংস্থা। সংস্থাগুলো হলো ব্র্যাক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), নিজেরা করি ও বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট।
মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, ‘প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে কেন নির্দেশ দিতে হচ্ছে? তার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। তিনি নির্দেশ দেয়ার পরও সেগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন?’ তিনি আরো বলেন, প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরছে না। কারণ সেখানে যোগসাজশে অনিয়ম, দুর্নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে গেছে। সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হচ্ছে। তিনি বলার পরও রাসায়নিকের গুদাম সরেনি। গুদাম না সরিয়ে যদি সুবিধা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরানোর উদ্যোগ নেবে কেন।’

 


আরো সংবাদ



premium cement