১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

দেশের মানুষ উপকৃত হলে আমার শ্রম স্বার্থক : কোলিন্দা গ্রাবার কিটারোভিচ

ভিন দেশ
-


কোলিন্দা গ্রাবার কিটারোভিচ। তিনি ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। তার বয়স এখন প্রায় ৫০ বছর হলেও ৪৬ বছর বয়সে সবচেয়ে কম বয়সী রাষ্ট্রপতি। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেও বেশ বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময় ছিল তার পেশাগত জীবন। কোলিন্দা ক্রোশিয়ায় রাজনীতিক, কূটনীতিকসহ আরো দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে সাফল্যের সাথে কাজ করে যান। এ সময়ে তিনি কাজের ক্ষেত্রে বহু শুভাকাক্সক্ষীকে পাশে পেয়েছেন।
তার ব্যাপক পরিচিতি ঘটতে থাকে ২০১৫ সাল থেকে। কেননা, ওই সময় থেকেই রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি প্রথম নারী যিনি বহুদলীয় নির্বাচনে ১৯৯০ সালে নির্বাচিত হন। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপিয়ান অ্যাফেয়ার্সবিষয়কমন্ত্রী, ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ইভোসানাডারের প্রথম ও দ্বিতীয় কেবিনেটের বিদেশবিষয়কমন্ত্রী ছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রোশিয়ান রাষ্ট্রদূত ছিলেন ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবের অধীনে ন্যাটোর পাবলিক ডিপ্লোম্যাসির সহকারী মহাসচিবও ছিলেন তিনি। ডিসেম্বর ১৪ ও জানুয়ারি ২০১৫ সালে একমাত্র নারী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেন। সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট জোসিপোভিককে হারিয়ে তিনি দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠেন। প্রথম রাউন্ডে তার সফলতা ছিল একেবারেই যেন কাক্সিক্ষত। এর ধারা আছে। বেশির ভাগ ভোটারই মতো দিয়েছিলেন, ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হবেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে ১.৪ শতাংশ ভোট অর্থাৎ ১.১১৪ মিলিয়ন ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন যা ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসে এটাই প্রথম।
১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি ক্রোয়েশিয়ায় ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন দলের একজন রক্ষণশীল সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি দেশটির ত্রিপক্ষীয় কমিশনের তিনজনের মধ্যে একজন সদস্য ছিলেন। তবে তিনি তার সব পদ থেকে সরে দাঁড়ান। কারণ দেশটির প্রচলিত আইন মোতাবেক রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় এসব পদ ধরে রাখা যায় না।
দেশটির গণমাধ্যমে ২০১৭ সালে একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে কিটারোভিচকে বিশ্বের ৩৯তম ও সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী নারী হিসেবে প্রকাশ করা হয়। তিনি তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার একটি অংশ, যা ক্রোয়েশিয়ার বিজেকা এলাকায় বাবা-মায়ের লালনপালনে বড় হন। লস এলামোসে পড়ালেখা করার পর ১৯৮৬ সালে লস এলামোস হাইস্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন। যুগোস্লাভিয়ায় ফিরে এসে মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদে নাম লেখান। ইংরেজি বিষয়ে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৯৩ সালে। ইংরেজি বিষয়ের সঙ্গে আরো ছিল স্পেনের ভাষা ও সাহিত্য। ভিয়েনায় ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমিতে ডিপ্লোমা কোর্সে প্রবেশ করেন ১৯২৫-৯৬ পর্যন্ত। ২০০০ সালে জাগরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুষদ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০২-০৩ এ জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ‘ফুলব্রাইট স্কলার (পদবি) হিসেবে যোগ দেন। এ দিকে ‘লোকসিক ফেলোশিপ’ অর্জন করেন হার্বার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পাশাপাশি তিনি ভিজিটিং স্কলার ছিলেন জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কোলিন্দা গ্রাবার ক্রোয়েশিয়ান, স্প্যানিশ, ইংরেজি ও পর্তুগিজ ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। জার্মান, ফ্রান্স ও ইটালিয়ান ভাষায়ও কথা বলতে পারেন। তার এ ভাষানৈপুণ্য দেখে সবাই অবাক হন এবং বলেন, এত ভাষা তিনি শিখলেন কী করে?
অনেকের কাছে এখনো তিনি অপরূপ সুন্দর। এ কারণেও অনেকের মন জয় করতে পেরেছেন ক্রোয়েশিয়ার এ গুণী প্রেসিডেন্ট। তার পোশাক-আশাক দেখেও মুগ্ধ হয় অনেকে। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি তার ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করেন। এটিও অনেকের কাছে বেশ পছন্দের। অনেকে বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলেও মনটা সরলসোজা। যে কারণে অনেক সময় ‘ইনফরমাল’ হয়ে যান।
ক্রোয়েশিয়ায় যখন মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল, সেই সময়েই কোলিন্দা দেশটির প্রেসিডেন্ট হন। তার তা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন ছিল। তার পরও বুদ্ধির সাথে নানা পদক্ষেপ নিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক মন্দা থেকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হন। একসময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের টানাপড়েন চলছিল ইরান চুক্তিকে কেন্দ্র করে। এ সমস্যা সমাধানেও তিনি গুরুদায়িত্ব পালন করেন এবং সফল হন।
কোলিন্দা ক্রোয়েশিয়া ফুটবল দলের অন্যতম ভক্ত বা সমর্থকও। তিনি দলকে সাহস জুগিয়েছেন মাঠের বাইরে, গ্যালারিতে, এমনকি খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুমে গিয়েও। সম্প্রতি শেষ হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালের আগের দিন তিনি বলেছেন, ‘ফাইনালের আগের সময় বা মুহূর্তগুলো আমার যে কিভাবে কাটছে তা বলে বুঝাতে পারব না। আমার বিশ্বাস, ক্রোয়েশিয়াই জিতবে। এমনকি ক্রোয়েশিয়া দলের জার্সি পরেও তিনি এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়িয়েছেন দলের সমর্থক বাড়ানোর জন্য।
কোলিন্দার যে জনপ্রিয়তা দেশে এবং বিদেশে, তার মূলে দেখা যায় তার দৃঢ়ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৬৮ সালের ২৯ এপ্রিল ক্রোয়েশিয়ার রিজেকা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, দেশের মানুষ উপকৃত হলে আমার শ্রম স্বার্থক।’


আরো সংবাদ