২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

যাকাত আদায়ের উত্তম সময় কোনটি

যাকাত আদায়ের উত্তম সময় এখনই - ছবি : সংগ্রহ

রোজা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। জাকাত বিত্তশালীদের সম্পদকে পরিশুদ্ধ করে। জাকাত দেয়ার ফলে জাকাত দাতার সম্পদের পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জাকাত আদায় করতে হয়। রমজান মাস আল্লাহর মাস। রমজান মাসে যেকোনো ফরজ, ওয়াজিব সুন্নত ও নফল কাজ আদায় করলে আল্লাহ এর সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করে বান্দাকে নিজ হাতে প্রতিদান প্রদান করবেন। জাকাত বছরের যেকোনো সময় দেয়া যায়। তবে রমজান মাসে জাকাত আদায় করতে পারলে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে।

ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তোমরা যে জাকাত দাও, প্রকৃতপক্ষে সেই জাকাত তোমাদের সম্পদ বৃদ্ধি করে’। (সূরা রোম :৩৯)। রমজান যেমন জাহান্নামের ঢালস্বরূপ তেমনি জাকাত সম্পদের বালা মুসিবতের ঢালস্বরূপ। জাকাত প্রদানের মধ্যে দিয়ে এক মুসলমানের প্রতি অন্য মুসলমানের হক আদায় হয়। জাকাত ধনী-গরিবের মধ্যে সম্পদের বৈষম্য দূর করে। জাকাত সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে শক্তিশালী করে। ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহ পাক জনপদের মানুষদের কাছ থেকে নিয়ে তাঁর রাসূলকে দিয়েছেন, তা হচ্ছে আল্লাহর জন্যে, রাসূলের জন্যে, আত্মীয়স্বজন, এতিম-মিসকিন ও পথচারীদের জন্যে, সম্পদ যেন বিত্তশালী লোকদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।’ (সূরা হাশর: ৯)।

দান করা বাধ্যতামূলক নয় কিন্তু জাকাত আদায় করা বাধ্যতামূলক। ইরশাদ হয়েছে- ‘ আর তোমরা নামাজ কায়েম কর এবং জাকাত প্রদান কর’। (সূরা বাকারা: ১১০)। সম্পদ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নেয়ামতস্বরূপ। আল্লাহ যাদের সম্পদ দান করেছেন তাদের সম্পদের মধ্যে গরিব-দুখী মানুষের হক রয়েছে। জাকাত কোনো করুণার বিষয় নয়, ইহা দুখী-দুস্থ মানুষের অধিকার। ইরশাদ হয়েছে- ‘তাদের ধন-মালে ভিক্ষুক, প্রার্র্থী ও বঞ্চিতদের সুস্পষ্ট ও সুপরিজ্ঞাত অধিকার রয়েছে’। (সূরা যারিয়াত: ১৯)।

জাকাত কোনো করুণার বিষয়বস্তু নয়। জাকাত আদায় না করলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয় এবং সম্পদের পরিমাণ কমে যায়। ইরশাদ হয়েছে- ‘সেসব মুশরিকদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য, যারা জাকাত দেয় না’। (সূরা হামিম আস সাজাদা:৭-৮)। বুখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘যারা আল্লাহর দেয়া ধন-মালে কার্পণ্য করে, তারা যেন মনে না করে যে, তাদের জন্য তা মঙ্গলময় বরং তা তাদের জন্য খুবই খারাপ। তারা যে মাল নিয়ে কার্পণ্য করেছে, তাই কিয়ামতের দিন তাদের গলার বেড়ি দেয়া হবে’। নামাজ ও জাকাত একটি অপরটির পরিপূরক। হজরত আবু বকর রা: তার খেলাফতের সময়কালে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি অবশ্যই সেসব লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, যারা নামাজ ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে। আল্লাহর কসম, তারা যদি একট উটের রশিও দিতে অস্বীকার করে, যা রাসূল সা:-এর জমানায় তারা দিত।

জাকাত আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অভাবগ্রস্ত কিংবা দরিদ্র লোকের মধ্যে এক’দুটি লুঙ্গি শাড়ি অথবা দু’তিন কেজি চাল গম দিলে জাকাত আদায় হয় না। জাকাত আদায়ের সুনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি রয়েছে। যে সব লোকের নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, কেবল তাদের জাকাত আদায় করতে হবে। নিসাব হলো- শরিয়তের নির্ধারিত সম্পদের নি¤œতম সীমা বা পরিমাণ। সাধারণত, ৫২.৫ তোলা রূপা বা ৭.৫ তোলা সোনার সমমূল্যের সম্পদকে নিসাব বলে। ওই পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত আদায় করতে হবে। যে ব্যক্তির ঋণ বা দেনার পরিমাণ নিসাব পরিমাণ সম্পদের চাইতে বেশি, তার ওপর জাকাত ফরজ নয়।
লেখক : প্রবন্ধকার

আরো পড়ুন : বাংলাদেশী নাজমা খানের আহ্বানে হিজাব পরছেন অন্য ধর্মাবলম্বীরাও
আল জাজিরা
সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী গ্রেস লয়েড যখন হিজাব পরে রমজানের প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকল, সব সহপাঠীরা তাকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানালো। সহপাঠিদের এমন আচরণে মুগ্ধ গ্রেস। আর তার সহপাঠীর চমকিত গ্রেসের মাথায় হিজাব দেখে। কাতারের রাজধানী দোহার গালফ ইংলিশ স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী গ্রেস লয়েড একজন ব্রিটিশ খ্রিস্টান। তবে খ্রিস্টান হয়েও এই রমজানে সে পুরো মাস হিজাব পরে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মা ইলি লয়েডের সাথে কাতারে বসবাস করে ১১ বছর বয়সী গ্রেস লয়েড। তার মা ‘ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে’ নামক দাতব্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ও একই সাথে সংস্থাটির কাতার প্রতিনিধি। ইলি লয়েড বলেন, হিজাব শুধু একটি কাপড়ই নয়, এটি মুসলিম নারীদের বিশ্বাসের সাথে যুক্ত।

শুধু গ্রেস নয়, তার মতো আরো অনেকে বিশ্ব হিজাব দিবসের উদ্যোক্তা নাজমা খানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হিজাব পরতে শুরু করেছেন এই রমজানে। ‘হিজাব চ্যালেঞ্জ’ নামের ওই কর্মসূচির আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সব ধর্মাবলম্বী নারীরা হিজাব পরছেন রমজানে। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য মুসলিম নারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ ও যারা হিজাবের কারণে বিভিন্ন সময় বৈষম্যের শিকার হন তার প্রতিবাদ।
হিজাব পরার বিষয়ে গ্রেস বলেন, ‘আমি বিষয়টিতে শক্ত অবস্থান নিয়েছি। আমার ক্লাসের সবাই হিজাব পরে, তাই আমার জন্য আরামদায়ক হচ্ছে বিষয়টি।’ অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করার কারণে যে সুবিধা গ্রেস পাচ্ছেন তার বিপরীত চিত্র আছে অন্যত্র। হিজাব চ্যালেঞ্জে সাড়া দিয়ে অনেকেই মুখোমুখী হয়েছেন বিব্রতকর পরিস্থিতির। তবুও তারা দমে যাচ্ছে না।

ব্রাজিলের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পামেলা জাফরেদও তাদের একজন যারা এই রমজানে পুরো মাস হিজাব পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পামেলার মতে হিজাব তার চোখ খুলে দিয়েছে। ব্রাজিলের মধ্যাঞ্চলীয় গইয়ানিয়া শহরের বাসিন্দা পামেলার জন্ম ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবারে। মুসলিমদের প্রতি সংহতি জানিয়ে হিজাব পরে প্রথম দিন তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বলেন, সেটি ছিলো সবচেয়ে বাজে দিন আমার জন্য। আমি হিজাব পরে জিমে গেলাম, অনেকেই কটুক্তি করতে লাগলো। গ্রুপ ভিত্তিক ক্লাস হয় সেখানে, কিন্তু আমার সাথে কেউ আসতে চায়নি যতক্ষণ না ইনস্ট্রাটক্টর তাদের ভাগ করে দেয়।’
পামেলা বলেন, এর মাধ্যমে আমি বুঝতে পারছি হিজাব পরার কারণে মুসলিম নারীদের কতটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাদের সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হয়।


বিশ্ব হিজাব দিবসের উদ্যোক্ত নাজমা খান বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তার উদ্যোগেই প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় বিশ্ব হিজাব দিবস। তিনি বলেন, ‘হিজাব পরার কারণে পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম নারীরা কতটা নিগৃহীত হয় সেটি বুঝতে পারবেন যারা এই কর্মসুচিতে সাড়া দিয়ে একমাস হিজাব পড়বেন।’ নাজমা খান জানিয়েছেন, মুসলিম নারীদের সাথে সংহতি জানিয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের হিজাব পরার কর্মসুচির ব্যাপক প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে।

মরমন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোক কেয়লা হাজ্জি জানিয়েছন, শুধু হিজাব নয় তিনি এ বছর রোজাও রাখতে শুরু করেছেন মুসলিমদের মতো। যুক্তরাষ্ট্রর ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ফ্রেসনোতে বসবাসকারী ৩৫ বছর বয়সী এই নারী বলেন, ‘মুসলিমদের কাছাকাছি না আসলে আমি বুঝতে পারতাম না তাদের সাথে মেশা কতটা আনন্দের’। তিনি চান হিজাব চ্যালেঞ্জের সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়–ক, যা মুসলিম নারীদের অধিকার আদায়ে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, মুসলিম নারীরা তাদের পোশাক নিয়ে কতটা সংগ্রাম করেন সেটিও বুঝতে পারতাম না হিজাব না পরলে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম নারীদের হিজাব পরার কারণে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর দেশটিতে মুসলিমদের ওপর হেট ক্রাইম অনেক বেড়ে গেছে। মুসলিম বিদ্বেষী গ্রুপগুলো প্রায়ই মুসলিমদের দেশ থেকে বের করে দিতে প্রচারণা চালায়। ইউরোপীয়ান আদালতও গত বছর কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় চিহ্ন সম্বলিত পোশাক পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা নাজমা খান আশা করছেন, এই কর্মসুচির মাধ্যমে সারা বিশ্বে হিজাবের বিষয়ে সচেতনা তৈরি হবে। মুসলিম নারীদের পোশাকের স্বাধীনতার একটি অংশ যে হিজাব সে বিষয়টি সবাই বুঝতে পারবে। এবং সারা বিশ্বে মুসলিম নারীরা কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই হিজাব পরতে পারবেন।


আরো সংবাদ