১৪ নভেম্বর ২০১৮
আস্থা ফেরানোর দায়িত্ব সরকারের : বিশ্লেষকদের মন্তব্য

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন - ছবি : সংগৃহীত

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী আগামী অক্টোবর মাস থেকে মধ্য জানুয়ারির মধ্যে ভোট হওয়ার কথা। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বুধবার সচিবালয়ে ২৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানিয়েছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও অর্থমন্ত্রী কোন হিসাবে আগাম এ তারিখ জানিয়ে দিলেন তার কোনো ব্যাখ্যা নির্বাচন কমিশন অবশ্য দেয়নি। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে বিষয়, তা হলো নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি না। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে আগামী নির্বাচন বানচালের ক্ষমতা কারো নেই এবং তা নির্ধারিত সময়েই হবে। আর নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দল বিএনপির সাথে আলোচনার বিষয়টিও নাকচ করে দেয়া হয়েছে। 

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা ছিল একতরফা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তাদের জোট শরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচন বয়কট করেছিল এবং ওই সময় বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বন্ধে সবধরনের চেষ্টা করেছিল। একটানা আন্দোলনে নির্বাচনকালীন দেশ অচল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিদেশী হস্তক্ষেপে বিএনপি ও শরিক দলগুলো আন্দোলনের কর্মসূচি স্থগিত করে। সে সময় বলা হয়েছিল সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এ নির্বাচন হয়েছে এবং স্বল্প সময়ে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সে ‘স্বল্প সময়’ আর আসেনি। সরকার তার নির্ধারিত মেয়াদ প্রায় পূর্ণ করেছে। ইতোমধ্যে সংবিধান পরিবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের রাজনীতি প্রধানত দুইটি ধারায় বিভক্ত। একটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অপরটি জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির। ভোট রাজনীতিতে এর বাইরে যে ধারা আছে তা জয়-পরাজয়ের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। কিন্তু আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে হলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়কেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন হলে তা দেশ-বিদেশে কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে বৈধতা পেলেও আগামী নির্বাচনে সে বৈধতার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিএনপির রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের বাইরে রেখে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। নির্বাচন হলে তা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবেই হতে হবে। অন্য দিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির সাথে কোনো আলোচনা কিংবা সমঝোতার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে। তারা আওয়ামী লীগের অধীনেই নির্বাচন হবে এবং তাতে বিএনপি অংশ নেবে বলেই মনে করছে। প্রধান দুই দলের এই মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে দুই পক্ষই নির্বাচনের পাশাপাশি মাঠ দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেপ্টেম্বরেই আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপিও বসে নেই। তারাও সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই দলের এ পাল্টাপাল্টিতে আগামী দিনের রাজনীতি সঙ্ঘাতময় হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হওয়ার সংস্কৃতিতেই আজকের এ দুরবস্থা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপির জন্য কাল হয়ে আছে। কিন্তু তা আওয়ামী লীগের জন্যও কি ভালো কোনো ফল বয়ে এনেছে? আগামীতে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হবে। সবকিছুই বেসামাল হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা নির্বাচন কমিশনের কাজ। অর্থমন্ত্রীর কাজ এটি নয়। কিন্তু কেন তিনি এ কথা বললেন- তা আমি জানি না। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, একটি ধারণা এখন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে ক্ষমতায় যেতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দরকার নেই। এ ধারণায় কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। দেশের সার্বিক অবস্থা এসবেরই প্রতিফলন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট লেখক ও বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী আগামী অক্টোবর থেকে মধ্য জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে এ নির্বাচন কবে হবে তা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেই বলার কথা। কিন্তু সরকারের একজন দায়িত্বশীল সিনিয়র মন্ত্রী যেভাবে বলে দিলেন তাতে সন্দেহ সৃষ্টির সুযোগ আছে। এমনিতেই এই নির্বাচন কমিশন নিয়ে কথা রয়েছে যে তারা সরকারের অঙ্গুলি হেলনে চলে। অর্থমন্ত্রীর আগাম বক্তব্যে সেই সন্দেহ জোরালো হলো। এই বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনের স্বাতন্ত্র্য ও সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তিনি বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা, সবাইকে নিয়ে আসা এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরির একটা দায়িত্ব সরকারের আছে। আস্থা ও বিশ্বাস ফেরানোর দায়িত্বও সরকারের।


আরো সংবাদ