১৮ মার্চ ২০১৯

সঙ্কটের জালে চামড়া শিল্প

-

চামড়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি শিল্প। নির্দিষ্ট কিছু কারণে রফতানিমুখী এ শিল্প পিছিয়ে পড়ছে। উদ্বেগের বিষয়, এ শিল্প থেকে গত দুই বছরে অব্যাহতভাবে বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমছে।

এর অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে- চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ, নতুন শিল্পনগরীতে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরে অবকাঠামোগত সমস্যা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সঙ্কট ও সড়ক যোগাযোগে অব্যবস্থা। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমলান্ত্রিক জটিলতা ও ব্যাংক ঋণের অভাব। যার ফলে বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা বেড়েছে। আর এ সব কিছুর সমন্বয়ের অভাবে চামড়া শিল্প পিছিয়ে পড়েছে।

গত দুই বছর থেকে সাভারে চামড়া কারখানা সরানোর বিষয়ে এই যে চলমান গুচ্ছ জটিলতা- তাতেই ক্রেতা কমেছে, সেই সাথে কমছে বিদেশী বিনিয়োগও। আর এসব কারণে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় বাজার হারাচ্ছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। শিল্পসংশ্লিষ্টদের অনেকের ধারণা, এ অবস্থায় ২০২১ সালের মধ্যে পাঁচ হাজার কোটি টাকা রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কল্পনাতেই থেকে যাবে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৫৩ কোটি ২৩ লাখ ডলারের রফতানি আয় হয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতের রফতানি আয় ছিল ৬২ কোটি ডলার। এ তথ্য বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ‘ইপিবি’র। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে এ শিল্পের সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় কী?

চীন-আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য-ক্ষতির এ বাস্তবতা মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু শিল্প স্থানান্তর বিষয়ে আনুষঙ্গিক যে সমস্যা, তা নিত্যন্তই অভ্যন্তরীণ। একটা বৃহত্তর রফতানি শিল্পের ক্ষেত্রে এতগুলো অসঙ্গতি ওই শিল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যে শিল্প জাতির অর্থনৈতিক শক্তি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে, সে শিল্পকে অবহেলা করা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে কি?

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দেশী রফতানিকারকদের আন্তর্জাতিক সচেতনতা এ শিল্পকে বিশ^বাজারে শক্ত প্রতিযোগিতার আসনে নিয়ে গেছে। সেই বন্ধুর পথ বেয়ে চামড়া শিল্প উপার্জন করছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা; যা আমাদের জাতীয় রফতানি আয়ের দ্বিতীয় প্রাণশক্তি। এখনো বিশ^বাজারে বিপুল চাহিদা ও দেশে কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও পণ্যের জোগান দিতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এক তথ্য মতে, বিশ্বে চামড়া শিল্পের বাণিজ্যের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলার। এর মাত্র ১ শতাংশ জোগান দেয় বাংলাদেশ। এর মানে এ শিল্পের রয়েছে বিশাল অঙ্কের বিদেশী বাণিজ্য। একদিকে বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য অন্য দিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় পশ্চাৎপদতা দেশের চামড়া শিল্পকে নানা আঙ্গিকে সঙ্কটের জালে ঘিরে রেখেছে। এ থেকে বের হওয়ার পথ এখনো সুগম হয়নি।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্যমতে, সাভারে পরিকল্পিত ট্যানারি শিল্পের অবকাঠামো গড়ে না ওঠার আগেই ভুল তথ্য দিয়ে ট্যানারি মালিকদের শিল্প সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এখানে যেসব ট্যানারি মালিক বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

যদি মালিক পক্ষের ভাষ্য সঠিক হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক- দুটি বছর কম সময় নয়। এই দুই বছরে কেন চামড়া শিল্প নগরীর কাঠামোগত সমস্যা, রাস্তাঘাটের সমস্যা সমাধান করা যায়নি। এর দায় কার ওপর বর্তায়?

ইপিবির আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছিল ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার; যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ শতাংশ কম। এ অর্থবছরে ১৩৮ কোটি ডলার রফতানি লক্ষ্য ধরা হলেও তা অর্জন হয়নি। এ ছাড়া চামড়া রফতানিতে ২৪ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও রফতানি হয়েছে ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারের; যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ২৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। চামড়াজাত পণ্য থেকে ৫৪ কোটি ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার; যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর জুতা ও অন্যান্য পণ্যে গত অর্থবছরে ৬০ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় ৫৩ কোটি ডলার।
বিগত সময়ে চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে এই যে অবনমন- এটা স্পষ্টতই পরিকল্পনাহীন লক্ষ্যে যাত্রার প্রতিফল। তার দায়দায়িত্ব অনেকটাই পড়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর।

এত সব সঙ্কটের মাঝেও পাদুকা শিল্পের অগ্রসরমানতা লক্ষ করার মতো বিষয়। পাদুকা উৎপাদনে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ একধাপ এগিয়ে সপ্তম হয়েছে। সুযোগ রয়েছে আরো এগিয়ে যাওয়ার। সমগ্র চামড়াশিল্পে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও এককভাবে পাদুকা রফতানিতে আয় বাড়ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে চামড়ার জুতা রফতানিতে আয় হয়েছে ৩০ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার ডলার; যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭.৫২ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই খাতের রফতানি আয় ৮.৫২ শতাংশ বেড়েছে। সম্ভাবনার বিচারে পাদুকা শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ শিল্পের সমস্যাগুলোর কারণে হচ্ছে না।

ট্যানারি শিল্প তড়িঘড়ি করে স্থানান্তর নিয়ে নানা কথাই উঠে আসতে পারে। বিশে^র ১০টি শীর্ষ দূষিত জায়গার মধ্যে তালিকায় উঠে আসে হাজারীবাগ ট্যানারির নাম। বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ট্যানারির বর্জ্য মিশে ক্রমাগত দূষিত হচ্ছিল। রাজধানী শহর ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গাকে দূষণ থেকে বাঁচাতে সরকার কঠোর উদ্যোগ নেয় ট্যানারি শিল্প সরানোর। সরকারের তাগিদে ব্যবসায়ীরাও বারবার সময় নেন। তারপর একসময় জোর করেই সাভারের হরিণধরায় চামড়া শিল্পনগরীতে এ শিল্পকে স্থানান্তর করা হয়। যা হোক, শিল্পমালিকদের বারবার সময় নেয়ার মাঝে সরকারও যথেষ্ট সময় পেয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নের। তার পরও কেন তা সম্পন্ন হয়নি- সেটা আজো প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেছে। এখন দেশের এত বড় বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী একটা শিল্পের মন্থরতার দায়ভাগ কে নেবে?

সংবাদ সূত্র মতে, হাজারীবাগ থেকে সাভারের হরিণধরায় ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরিত হয়েছে বছরখানেক আগে। নতুন স্থানে প্লট পাওয়া ১৫৫টি ট্যানারি কারখানার মধ্যে মাত্র ৪০টির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাকি কারখানাগুলোর অবকাঠামো নির্মাণেরকাজ এখনো শেষ হয়নি। রফতানি আদেশ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে ট্যানারি মালিকরা বলছেন, সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় এমন অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।

আরেকটি বড় কারণ সাম্প্রতিক চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব। কারণ বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত পণ্যের কাঁচামাল আমদানি করত চীন। সেই চামড়া দিয়ে নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নতমানের পণ্য তৈরি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করত তারা। এ ক্ষেত্রে চীনের জন্য একটি বড় বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু চীনের চামড়াজাত পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে চীনের চাহিদা কমার পাশাপাশি কমে গেছে বাংলাদেশের রফতানি। এটা না হয় মানতে হবে- বিশ্বের দুই বৃহৎ বাণিজ্যশক্তির দ্বন্দ্বে আমাদের স্বার্থক্ষুণœ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ যে সমস্যাগুলো তার সমাধান তো আমাদেরই করতে হবে।

রাস্তাঘাট নির্মাণ জটিল কোনো বিষয় নয়। শিল্পের জন্য, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের স্বার্থে অগ্রাধিকারভিত্তিতে তা করা যেতেই পারে। সরকারের জোর তাগিদ থাকার পরও কেন তা সম্পন্ন হয়নি- এটাই ভাবিয়ে তুলেছে সচেতন শিল্পমালিকদের। দুই বছরেও কি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সমস্যাগুলো সমাধানের সুযোগ পায়নি? তাহলে এটা শিল্পকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে তড়িঘড়ি করে কেন স্থানান্তর করা হলো? সরকার একদিকে সোৎসাহে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করবে, অন্যদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কাজ অসম্পন্ন রেখে বছরের পর বছর পার করবে- তাহলে এ শিল্প উন্নয়নের ধারায় অব্যাহত গতি ধরে রাখবে কী করে?

শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে অবকাঠামোগত এখনো যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। বিশেষ করে সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সঙ্কট ও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অসঙ্গতিগুলো সুসম্পন্ন করতে হবে। ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে সহজ শর্ত নিশ্চিত করতে হবে; সেই সাথে নিরসন করতে হবে যাবতীয় আমলান্ত্রিক জটিলতা। তাহলেই কেবল এ শিল্পে অগ্রযাত্রা ধরে রাখা সম্ভব। আবারো বলতে হচ্ছে, চামড়া সাধারণ কোনো শিল্প নয়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী শিল্প। তাই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে সরকারের দায়িত্ব যত দ্রুত সম্ভব এ শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধান করা।
লেখক : সাংবাদিক
[email protected]


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al