২১ আগস্ট ২০১৯

সস্তায় সুস্বাদু খাবার সমাচার!

-

সুস্বাদু খাবারের প্রতি কার লোভ নেই? লোভনীয় খাবার দেখে যে কারো জিভে পানি আসে। আমরা বাঙালিরা খাবারের দিকে ছুটি নিরন্তর। না ছুটে উপায় কী! কথায় আছে- ‘হা-ভাতে বাঙালি ভাতের কাঙাল।’ পছন্দের খাবার পেতে তাই তীর্থের কাক হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনি। গরিব বাবা-মা অর্থের অভাবে ছোটবেলায় হয়তো স্বাদের খাবার খাওয়াতে পারেননি। সব সাধ-আহ্লাদ মনের গহিনে ধামাচাপা পড়ে থাকে। বাবা-মায়ের অভাবী সংসারে সুষম খাবার ছিল কল্পনাতীত।

তাই জন্ম থেকেই ভুগছি অপুষ্টিতে। বেড়ে উঠি হাড় জিরজিরে বেঁটে হয়ে। অথচ খর্বকায় জাপানিরা পুষ্টিকর খাবার খেয়ে বেড়ে উঠছে তরতরিয়ে। তাদের বর্তমান প্রজন্ম পূর্বতনদের চেয়ে লম্বাটে। গায়ের রঙ দুধে-আলতা। দেশে দেশে তাদের নিয়ে কাড়াকাড়ি। পশ্চিমা তরুণ-তরুণীরা তো জীবনসঙ্গী করতে রীতিমতো থাকে মুখিয়ে।

আর আমরা? কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এ দেশে গরিব কৃষকের ঘরে আমাদের জন্ম। খাবারের প্রতি তাই দুর্নিবার আকর্ষণ। না খেয়ে খেয়ে মনের অজান্তে হয়ে উঠি ভোজনরসিক! বাসনা জাগে রসনাবিলাসের। মুখরোচক হলে তো কথাই নেই। গিলি গোগ্রাসে। থালার সবটুকু খাই চেটেপুটে।

সেই আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের দেয়া হয়েছে লোভনীয় খাবারের অফার- স্বাদের চা, সমুচা, সিঙ্গারা আর চপ। দাম মাত্র ১০ টাকা। দুনিয়ার কোথাও নাকি এত সস্তায় এমন খাবার মেলা ভার। প্রাপ্তিস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি। এমন ‘দাওয়াত’ উপেক্ষা করে, সাধ্যি কার? এ আমন্ত্রণ কোনো চুনোপুঁটির নয়। এসেছে খোদ ভিসি মহোদয়ের পক্ষ থেকে। এই খোশখবর দিলেন ফুরফুরে মেজাজে। তা-ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের এক অনুষ্ঠানে; সগৌরবে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন তার জনপ্রিয় ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায় বন্ধুকে নিজের গাঁয়ের বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন নাড়ার আগুনে পুড়িয়ে মটরশুঁটি খেতে। আর ভিসি মহোদয় দিয়েছেন উৎকৃষ্ট সব খাবারের অফার। এটি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। এমন মনলোভা তথ্য আড়াল করলে গিনেস বুকে ঠাঁই মিলবে কিভাবে?

পড়ালেখা আর গবেষণায় না হোক; অন্তত চা, সমুচা, সিঙ্গারা আর চপ দিয়ে রেকর্ড গড়লে ক্ষতি কী! না হয় পড়াশোনা আর গবেষণায় বেশ কিছু দিন ধরে বৈশ্বিক সূচকে দুনিয়ার অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের অবস্থান তলানিতে। এই আর কী!

এ দিকে সুস্বাদু খাবারের এই খবরে নেটিজানদের মধ্যে পড়েছে ঢিঢি রব। তারা বেহুদা কথায় মত্ত। অনুষ্ঠানের আংশিক ভিডিও ফুটেজ দিয়ে বিকৃত আনন্দে লিপ্ত। অথচ তাদের ভেবে দেখার সময় নেই, খাবার মানুষের অতি প্রয়োজনীয়। মানবীয় মৌলিক চাহিদাগুলোর একটি। যথাসময়ে না খেলে জীবন হয়ে পড়ে বিপন্ন। সেই খাবারের কথা বলে এমন কী অপরাধ করা হলো যে, রসিকতা করতে হবে?

অন্য দিকে, কথিত অনেক জ্ঞানীগুণী মহাজন সমালোচনায় মুখর। তাদের বচন, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খাবারের চর্চা’ কেন? এটি কিসের আলামত? বিশ্ববিদ্যালয় কি খাদকদের আড্ডাখানা? এদের মাথায় ঘিলু বলে কিছু নেই। উর্বর মস্তিষ্ক। তাদের বোধহয় জানা নেই, প্রাচীন ভারতের নামী অর্থনীতিবিদ চাণক্যের কথা- ‘মাত্রাতিরিক্ত জ্ঞানচর্চায় গ্রাস করে দারিদ্র্য।’ জীবন হয়ে পড়ে অভাবগ্রস্ত। জ্ঞানচর্চা করতে হয় রয়ে-সয়ে। আর আঁতেল বুদ্ধিজীবীরা, তারা চাইছেন আমাদের তরুণদের পথে বসাতে। চাইছেন পূর্বপুরুষের মতো গরিবি হালতে জীবন কাটাতে। দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে। তারা যতই চিৎকার-চেঁচামেচি করুন না কেন; তা পাত্তা দেয়ারই বা কী আছে! তারা সবাই পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত। এ রোগ বড়ই ভয়ঙ্কর।

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে- নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা। অবশ্য নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার প্রেক্ষাপটটি না জানলে মনে পূর্ণ শান্তি মিলবে না। তাই গল্পটি বলা দরকার।

ঘটনাটি এমন- অনেক দিন আগের কথা। ভূ-ভারতে এক উদ্যমী তরুণ বণিক বাণিজ্যে যেত বহর নিয়ে। আর ফিরত প্রচুর ধনসম্পদ কামিয়ে। এটি কুঁড়ে প্রতিবেশীর মনে ধরিয়ে দেয় জ্বালা। সেই জ্বালা মেটাতে সে অন্য প্রতিবেশীর মনে প্রতিহিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বালায়। যুবকের বাণিজ্য অভিযানের প্রাক্কালে অভিযাত্রীদের সামনে নাক কেটে দাঁড়াতে তাদের উত্তেজিত করত। তাতে সফলতাও আসে। অনেকে উসকানির ফাঁদে পা দিয়ে নাক কেটে রক্তমাখা মুখে ওই যুবকের বাণিজ্যবহরের সামনে গিয়ে দাঁড়াত। সংস্কার ছিল, যাত্রাপথে রক্ত অকল্যাণের প্রতীক। তাই বাণিজ্য অভিযান যেত কিছু দিনের জন্য থেমে। এভাবে বেশ কয়েকবার বাণিজ্যযাত্রা থামিয়ে দেয় ওই হিংসুটে।

কিন্তু অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কত দিন। একসময় তার বদমতলব ধরা পড়ে যায়। ফাঁস হয়ে যায় সবার সামনে। আর কেউ নাক কেটে রক্তমাখা মুখে দাঁড়াতে অস্বীকার করে। কী আর করা! পরবর্তী বাণিজ্য সফরের প্রক্কালে লোকটি নিজের নাক কেটে রক্তাক্ত মুখে দাঁড়ায় বাণিজ্যবহরের সামনে। আর হাসতে থাকে, হি হি করে। যন্ত্রণাকাতর মুখে বলে, নিজের নাককাটা গেছে তো কী হয়েছে। বাণিজ্যযাত্রা তো দিলাম থামিয়ে।

এমন মানসিকতার সমালোচনাকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গিনেস বুকে ওঠার একটি সম্ভাবনায় যেন হয়ে পড়েছেন বিকারগ্রস্ত। এই সম্ভাবনা অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। তাই নিজেদের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গে লিপ্ত।

এ জন্য তারা তো বলবেনই, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হতে হলে ‘বিশেষ যোগাযোগ’ থাকতে হয়। না হলে ভিসি পদের শিকে ছিঁড়ে না। কপাল ফাটে না। থাকতে হয় ‘কার্যকর যোগাযোগ’। এতেই কেল্লাফতে। আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিখ্যাত ‘তৈল’ প্রবন্ধের কলাকৌশল রপ্ত করতে পারলে তো কথাই নেই। একেবারে সোনায় সোহাগা। তারা আহমদ ছফার বহুল পঠিত ‘গাভী বৃত্তান্ত’ উপন্যাসের একটি চরিত্র দেখিয়ে হাসেন। অথচ তারা বুঝতেই চান না, ছফা ওই উপন্যাস যখন লিখেছিলেন, সেই সময় আর এই সময়ে অনেক তফাত। সাদা চোখে তা যে কারো কাছে স্পষ্ট।

বয়স বাড়লে সব ধরনের খাবার হজম করা কষ্টসাধ্য। বেছে বেছে না খেলে বদহজম হয়। বয়সীদের খাবারের বেলায় হতে হয় হিসেবি আর সংযমী। তাই বলে অন্যকে খাওয়ানো মানা! ভালো খাবারের হদিস দেয়াও কি নিষেধ? কেউ খেয়ে মজা পান। অনেকে অন্যকে খাইয়ে পান পরমানন্দ। অবশ্য, ‘পরমানন্দ’ শব্দটি দেখে কেউ যেন ভুল করে ভারতের প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতীর লেখা সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত উপন্যাস ‘মিনিস্ট্রি অব অ্যাটমোস্ট প্লেজার’ বা পরমানন্দ মন্ত্রণালয়-এর ‘পরমানন্দ’ কথাটি যেন মনে না করে বসেন।

‘দেখার সুখ’ বলে তো একটি কথা আছে। বয়সী অনেকে অপরকে খাবার খাইয়ে পান পরম তৃপ্তি। আর ভিসি মহোদয় তো বাইরের কাউকে খাবারের লোভ দেখাননি। আকৃষ্ট করেছেন তারই সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের। এতে দোষের কী হলো? একসময় আমাদের দেশে অজপাড়াগাঁয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী টানতে খাবার দিয়ে প্রলুব্ধ করা হতো। সেই দৃষ্টিতে দেখলে যথার্থ অভিভাবকের কাজই করেছেন ভিসি। এমন কাজে নিন্দা করা উচিত নয়। হাজার হোক, তিনি একজন শিক্ষাবিদ। ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে থাকুন। আমরা যারা শুভাকাক্সক্ষী, তারা কায়মনোবাক্যে এই কামনাই করি।


আরো সংবাদ




bedava internet